ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমরা পছন্দ করি বা নাই করি, কিছুদিন আগেই ঘাড় ধরে আমাদের নামিয়ে আনা হয়েছিল পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো দেশের কাতারে। হ্যাঁ, বায়োমেট্রিক সিম রেজিস্ট্রেশনের কথা বলছি। ক্ষমতাসীন ছাড়াও দেশে জ্ঞানী-গুণী মানুষ আছে – সেটা ক্ষমতাসীনরা কোনোদিন বুঝতে চায় না, মনে হয় যাবতীয় জ্ঞানের আধার তাঁরাই। তাই দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইটি বিশেষজ্ঞ যখন এই বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের নানা ভয়ঙ্কর সমস্যার কথা বলছিলেন, বলা বাহুল্য, সরকার বাহাদুর সেটায় কর্নপাত করেননি। সেই সময় প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমকে সকাল-বিকাল দেখা যেতো মানুষকে নানা রকম নসিহত থেকে শুরু করে হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছেন। আর সেই ধামকির পর কারো আর উপায় ছিল না; সবাই হয়ে গিয়েছিলেন ‘বায়োমেট্রিক পাশ’।

গত দুই তিন দিন থেকে সংবাদ শিরোনামে আছে দেশের বিভিন্ন স্থানে বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন করা ‘ভুয়া’ সিম উদ্ধার – উদ্ধারকৃত সিম কার্ডের সংখ্যা কোথাও লক্ষ, আর কোথাও হাজার হাজার। ধরা পড়েছে এয়ারটেল কোম্পানির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাও। পুলিশকে ধন্যবাদ। বেশ কিছুদিন আগেও একবার পুলিশ চট্টগ্রামে এরকম সিমকার্ড উদ্ধার করার দাবী করলে আমাদের অপারেটররা এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এর কর্তাব্যক্তিরা সেটাকে অস্বীকার করে নানা ধানাইপানাই কথা বলেছিলেন। এবার পর পর দুই দিন এই ভয়ঙ্কর আবিষ্কারের পর সবাই একরকম খামোশ হয়ে আছেন।

কাল এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, তারানা হালিম কথা বলেছেন; বলেছেন, জুলাই মাসের ৭ তারিখ থেকে এসএমএস এর মাধ্যমে প্রত্যেকে যাচাই করতে পারবেন কার নামে কয়টি সিম নিবন্ধিত হয়েছে। এই পদ্ধতি আদৌ কোন কাজে আসবে কিনা সেই আলোচনায় পরে আসছি। আবার কাল রাতে টিভির স্ক্রলে দেখলাম, তিনি এটাও বলেছেন, এই ভুয়া সিমের দায়িত্ব মোবাইল অপারেটরদের নিতে হবে।

যখন বার বার বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছিল, এটার সুযোগ নিয়ে মানুষের অতি ব্যক্তিগত তথ্য অপারেটরদের হাতে চলে যাবে, তখন বলা হয়েছিল, সেটা নাকি কোনোভাবেই সম্ভব না। আঙ্গুলের ছাপ নাকি স্রেফ ভেরিফাই করা হবে জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেইজের সাথে। কারো পক্ষেই, কোনভাবেই নাকি সেটা দিয়ে জাল সিম বানানো সম্ভব না। কিন্তু আজ তো স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো ক্ষমতার দাপটে যেসব বিশেষজ্ঞকে একরকম মূর্খ (বা স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী) ঠাওরেছিলেন তারানা হালিমরা, তাঁরাই সঠিক ছিলেন।

আজ ধরা পড়ছে হাজার হাজার ভুয়া সিম; কত লক্ষ লক্ষ সিম (বা কোটি) আরো পড়ে আছে ধরা না পড়ে সেটা সহজেই অনুমেয়। এখন প্রতিমন্ত্রী বলছেন, জুলাই মাসের সাত তারিখের পর থেকে যে কেউ এসএমএস এর মাধ্যমে জেনে নিতে পারবেন তাঁর এনআইডি নম্বরের বিপরীতে কয়টি সিম রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে।

এখন সাত তারিখের পরে কেউ এসএমএস করে দেখলো, তার নামে কয়েকটি ভুয়া সিম রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেগুলো নিষ্ক্রিয় করা হলো। প্রশ্ন হল, স্থানীয় পর্যায়ে যারা রেজিস্ট্রেশন করেছে তারা, বা অপারেটররা যদি আঙ্গুলের চাপ সংরক্ষণ করে থাকে তবে সেই ব্যক্তির আঙ্গুলের ছাপ ব্যবহার করে আবারো নতুন সিম ছাড়া হবে না, সেই গ্যারান্টি কোথায়? একবার চেক করে এরপর নিশ্চিন্তে থাকা মানুষটি যে বিপদে পড়বে সে হয়তো সেটা কল্পনাও করবে না। অবশ্য মোবাইল অপারেটররা ছাপ সংরক্ষণ করার অভিযোগ অস্বীকার করছে, তারা বলছে এটা যখন দেশের আনাচে-কানাচে, রাস্তাঘাটে ছাপ নেয়া হয়েছে তখন কারো অজান্তে বারবার ছাপ নিয়ে করা হয়েছে। এদের কথা বিশ্বাস করার কোন কারণ আমি দেখি না – বছরের পর বছর ভিওআইপি’র মাধ্যমে এই দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে পাচার করেছে ওরা (দেশীয় হোমরা-চোমরা রা ও এতে জড়িত থাকায় এদেরকে বিচারের আওতায় না যায়নি)। এই অভিযোগ করলে স্বীকার করবে তারা? কিন্তু তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম সিম জালিয়াতির ঘটনা প্রান্তিক পর্যায়েই ঘটেছে।

আমাদের মতো শিক্ষিত, সচেতন মানুষ এসএমএস করে যাচাই করে নিজের নামে থাকা ভূয়া সিম না হয় নিষ্ক্রিয় করালো, কিন্তু দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের পক্ষে কি আদৌ সম্ভব, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নামে থাকা ভূয়া সিম নিষ্ক্রিয় করা? আর যদি প্রান্তিক পর্যায়েই সিম জালিয়াতি হয়ে থাকে, তাহলে মূল টার্গেট হবেন দরিদ্র, নিরক্ষর মানুষরাই। তো ভবিষ্যতে যে অসংখ্য অপরাধের সাথে এমন মানুষদের নাম জড়িয়ে যাবে, তার দায় দায়-দায়িত্ব কে নেবে?

আমাদেরকে ঘাড় ধরে ‘বায়োমেট্রিক পাশ’ করিয়ে সরকার যখন ডাহা ‘বায়োমেট্রিক ফেল’ হয়, তখন এই দেশের অতি ক্ষুদ্রাংশের মালিক হিসাবে অনেক কিছুই চাইতে পারতাম – বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন এর নামে যা যা করা হয়েছে তার সব কিছু বাতিল করা হোক। জানি, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তেই এই কাজ করা হয়েছিল, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাবে তারানা হালিমকে নিতে হবে এর মূল দায়িত্ব (যদিও তিনি দায়িত্ব অপারেটরদের ঘাড়ে দিয়েই বেঁচে যেতে চাইছেন), তাই আমরা তাঁর পদত্যাগও আমারা চাইতে পারতাম।

অবশ্য তারানা হালিমের পদত্যাগ চাইতেই বা হতো কেন? সভ্য দেশ হলে তিনি পদত্যাগ করতেন কেউ কিছু চাইবার আগেই। তবে এই দেশ আলাদা – এখানে ব্যাংকে সাগর চুরি হলে, প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে, হাজার কোটি টাকার পোকায় কাটা গম কেলেঙ্কারিতে ধরা পড়লে, আদালত অবমাননায় দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্ত্রিত্ব খারিজ হয়ে গেলে, টাকার বস্তা সহ ধরা পড়লে, একের পর এক কুপিয়ে খুন চলতে থাকলেও কোন ক্ষেত্রেই তো সংশ্লিষ্ট কোন মন্ত্রীর ন্যূনতম লজ্জাবোধ দেখিনি, পদত্যাগ করা তো অনেক পরের ‘সভ্যতা’।চজ

বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের নামে সব লেজেগোবরে করে ফেলার পরও তারানা হালিমের পদত্যাগ চাইছি না আমি; আমি নিশ্চিত তিনি সেটা করবেন না কোনোভাবেই – কারণ অতীত অভিজ্ঞতা, আর শোনা যায়, তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টার খুবই প্রিয়ভাজন। তাই আমরা, সারা দেশবাসী চাই বা না চাই তিনি থাকবেন, এবং করে যাবেন যা ইচ্ছে তা।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77