ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
black-planet-surface-1920

“এগুলো সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা”, “দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে”, “উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতেই এসব হামলা”, “এসব ঘটনার পেছনে বিএনপি-জামাতের হাত আছে” – কথাগুলো কি খুব পরিচিত লাগছে না? ন্যূনতম চোখ-কান খোলা রাখা মানুষের কাছে এই কথাগুলো খুব পরিচিত। প্রতিবার যখন একজন করে ধর্মীয় বা অন্য কোন ভীন্ন মতাবলম্বী মানুষকে কুপিয়ে খুন করা হচ্ছিল তখনই তোতাপাখির মতো এসব কথা আমাদের সামনে আওড়ে গেছেন পুলিশ কর্তা থেকে হোমড়া চোমড়া মন্ত্রী পর্যন্ত, সাথে সুদূর আমেরিকা থেকে অতি আলোচিত সব ফেইসবুক স্ট্যাটাস তো ছিলোই নিয়মিত বিরতিতে।

এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে হত্যা করা হল, প্রাথমিকভাবে জঙ্গি সন্দেহ করাই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আসনে থাকা মানুষ সরাসরি বিএনপি-জামাত জোটকে দায়ী করে বলেছিলেন, তিনি দেশের সরকার প্রধান, তাঁর কাছে নিশ্চিত তথ্য আছে; তথ্য ছাড়া তিনি কথা বলেন না। এরপর বাবুল আক্তারের ঘটনায় কোথাকার জল কোথায় গড়ালো সেটা কি আমরা দেখেছি না? তো কোন তথ্যের ভিত্তিতে সেদিন এতোসব কথা বলা হয়েছিল? ওদিকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও কি কম যান? তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন যাবতীয় সব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে আওয়ামী লীগ!

সেই পুরনো ব্লেইম গেইম, যেটা দেখে আসছি তথাকথিত গণতান্ত্রিক যুগ শুরু হবার পর থেকেই। জামাতের প্রসঙ্গ তো আলোচনার যোগ্যই না, বিএনপি-আওয়ামী লীগ এই দুই দল পালাক্রমে ক্ষমতায় এসে এই দেশটাকে নানা দিক থেকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গেছে। আর যে তথাকথিত অর্থনৈতিক উন্নতির কথা বলা হয়, সেটা আরো অনেক বেশি হতে পারতো তাদের জায়গায় সত্যিকার কল্যাণমুখী একটা রাজনৈতিক দল থাকলে। যাক, সে অন্য আলোচনা।

এই মুহূর্তে যে কোন সন্ত্রাসী আক্রমণ, সেটা যেই করুক বিএনপি বা অন্য কেউ, ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় যদি বিএনপি’র ব্যাপারে এতোই নিশ্চিত থাকে তাহলে তো শত্রু চিহ্নিত ই – তাহলে কেন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না? কিন্তু না, কথা যত বলা হয়, কাজ তার এক শতাংশও করা হয় না। তাই এসব কথা যে ফালতু পলিটিক্যাল রেটোরিক সেটা আজ আমরা বুঝি। এই ফাজলামো করতে করতে দেশটাকে যে এদিকেই নিয়ে যাওয়া হবে, সেটা অনুমান করার জন্য সামান্য কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট ছিল; সেটা আমার আছে।

দেশে জঙ্গি হুমকি ছিল বহুদিন থেকেই। বিএনপি’র সময় শায়খ রহমান, বাংলা ভাই এর কাণ্ডকীর্তি, সরকারের পক্ষ থেকে অস্বীকার সব আমাদের মনে আছে। কিন্তু এই সরকারও কি কিছুটা চেষ্টা করেনি জঙ্গি সমস্যাকে একটু হাইলাইট করতে? আজ একের পর এক কুপিয়ে হত্যার পর যখন আইএস দায় স্বীকার করে, বা পশ্চিমা দেশগুলো যখন এই দেশে আইএস এর অস্তিত্বের কথা বলে, তখন সরকার এসব অস্বীকার করে, অথচ আমরা তো ভুলে যাইনি এসব ঘটনার কিছুদিন আগেও আমাদের র‍্যাব/পুলিশ মাঝে মাঝেই কিছু মানুষকে গ্রেফতার করে বলতো তারা আইএস জঙ্গি বা কমান্ডার। এখন যখন সরকারের বক্তব্যই অন্যরা দিচ্ছে সেটা সরকার অস্বীকার করছে, কারণ তারা এতোক্ষনে টের পেয়েছে এর পেছনে অনেক বড় ‘খেলা’ আছে।

সীমিত আকারে জঙ্গি হুমকি বজায় থাকা সরকারের জন্য ভালোই ছিল। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলা যাবে দেশকে জঙ্গিমুক্ত রাখার জন্য তারাই মূল শক্তি, তাই তাদেরকে যেন ক্ষমতা চালিয়ে যেতে দেয়া হয়। দেশের মানুষও যদি জঙ্গি ভীতিতে আক্রান্ত হয়, তাহলে কারো মাথায় থাকবে না, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে আমাদের উপর এই সরকার সিন্দাবাদের ভুতের মতো চেপে বসে আছে। এই সুযোগে লুটপাট (লুটপাটের ধরণ, আর পরিমাণ নিয়ে লিখতে গেলে মহাকাব্য হবে) করে যাও যেভাবে ইচ্ছে । দেশে জঙ্গি হামলা থাকার আরেকটা দারুণ লাভ হলো, এর যাবতীয় দায়ভার বিএনপি’র ওপর দিয়ে তাদেরকে দেশে-বিদেশে দৌড়ের ওপর রাখা।

এই হাইপোথিসিস কি খুব অযৌক্তিক লাগছে? তাহলে আরেকটু মিলিয়ে নিন, কেন সরকার একের পর এক কুপিয়ে খুনের বিচারের ব্যাপারে আদৌ সিরিয়াস ছিল না? সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য অনুযায়ী ব্লগার হত্যার ব্যাপারে সিরিয়াস হলে ‘সূক্ষ্ম সুতার ওপর দিয়ে হাঁটা’ সরকারের গায়ে নাস্তিকতার তকমা লাগবে, তাই সেটা হবে না। কিন্তু আর সব হত্যারও কোন সিরিয়াস তদন্ত-বিচার হয়নি তো। একের পর এক হতে হতে কুপিয়ে খুনের সংখ্যা গত দেড় বছরে পঞ্চাশ। এমনকি বাবুল আক্তারের স্ত্রী খুন হবার পর রীতিমত ‘আজান দিয়ে’ শুরু হওয়া সাঁড়াশি অভিযান পরিণত হয়েছিল পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্যে – নিন্দুকেরা বলে ঈদের আগে এই অভিযানের উদ্দেশ্যই ছিল পুলিশ পরিবারগুলোর আমোদপূর্ন ঈদের ব্যবস্থা করা। জঙ্গি সমস্যার মতো একটা সিরিয়াস বিষয়কে কি দিনের পর দিন ছেলেখেলা করা হয়নি?

মূল কাজ নিয়ে ছেলেখেলা করা হলেও একটা ব্যাপারে অবশ্য সরকার শতভাগ সিরিয়াস ছিল, সেটা হলো তথ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে কয়েকজন মন্ত্রীর সকাল বিকেল খালেদা জিয়াকে জঙ্গি হামলার দায় দেয়া। খালেদা জিয়া জঙ্গি নেত্রী, ভালো কথা, খালেদা জিয়াসহ জড়িত সব নেতাকে গ্রেফতার করে বিচার করুন, ক্রসফায়ারে দিন, দেশটায় শান্তি আসুক। সেটা করবেন না তারা।

ওদিকে দেশে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে এই দেশ হয়ে আছে উগ্রবাদের দারুণ উর্বরভূমি। তাই এতে জঙ্গি তো গজাবেই। দেশে অতি ছোট রাজনৈতিক দলও এবার ইফতার পার্টির মতো ‘নির্দোষ’ ইনডোর কর্মসূচি পালন করার অনুমতি পায়নি পুলিশের কাছে। এই একটা উদাহরণই মনে হয় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ সেটা বোঝানোর জন্য যথেষ্ট; বিস্তারিত লিখতে গেলে তো সেটা হবে মহাকাব্য।

দেশে কিছুটা জঙ্গিবাদ থাকা সরকারের জন্য ভালো, এতে সরকারের অনেক হিসেব মিলে যায় সহজেই।

কিন্তু জঙ্গি নিয়ে এই খেলার একটা ভয়ঙ্কর ঝুঁকি আছে। পাকিস্তানের ঘটনা থেকে সেটা বোঝা যাবে। দীর্ঘদিন তালেবানকে একরকম ইচ্ছে করেই বাড়তে দিয়েছিল পাক সেনাবাহিনী – এতে সরকার সামরিক বা বেসামরিক হোক, তাদের প্রাসঙ্গিকতা, ক্ষমতা থাকে অনেক ভালো। কিন্তু খেলতে খেলতে এক সময় তালেবান চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এটাই বিখ্যাত ‘স্নো বল এফেক্ট’ যেখানে একটা তুষারের বল যত গড়ায়, আরো তুষার গায়ে মেখে ক্রমাগত বড় হতে থাকে।

কাল ঢাকার গুলশানে যা হলো, সেটা ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে আমাকে, সাথে শংকিতও – এই দেশের তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নোংরা স্বার্থসিদ্ধির খেলায় কী ভয়ঙ্কর বিপদের মুখোমুখি করেছে এই দেশকে। কিন্তু এই ঘটনায় আমি অবাক হইনি – কারণ বাংলাদেশে ছোট একটা তুষারের বলকে কয়েক বছর থেকেই গড়ানো হচ্ছিলো আর গড়ানো তুষারের বল তার আকার বাড়াবেই; ‘স্নো বল এফেক্ট’ আমাদেরকে সেটাই বলে।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77