ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

একটা অনুমিত পুলিশি ‘বন্দুকযুদ্ধ’ এর খবর এলো আজ – রাঙ্গুনিয়ায় পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে (পড়ুন খুন করা হয়েছে) এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু হত্যার অভিযুক্ত রাশেদ ও নবী। ওদিকে পুলিশের ভাষ্য মতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আসামী ‘সোর্স মুসা’ কে, যদিও তার পরিবার দফায় দফায় বলেছে মুসাকে পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে গেছে মিতু হত্যার কিছু পরেই। রাশেদ আর নবীর পরিবারও বলেছে তাদেরকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল। সাধারণ কান্ডজ্ঞান বলে, মুসার নাম যুক্ত হবে এই সরকারের আমলে গুম হয়ে যাওয়া অসংখ্য মানুষের তালিকায় যারা আর কোনোদিনই ফিরে আসবে না, অথবা সহসাই কোন একদিন আরেকটা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে খুঁজে পাবো তাকে।

শুরুতেই লিখেছি ঘটনাগুলো অনুমিত, তাই এসবে বিস্মিত হবার কিছুই নেই। কিন্তু আমি অবাক হই এটা ভেবে পুলিশ বাহিনী নিজের ক্ষয়িষ্ণু ইমেইজ আর কতো ক্ষয় করতে চায়? এই আত্মবিনাশী প্রবণতা কেন পুলিশের?

মিতু হত্যাকাণ্ডের পর খুব স্বাভাবিক কিছু যৌক্তিক অনুমান আমাদের এটা বিশ্বাস করিয়েছে যে, জঙ্গিরাই এই কান্ড ঘটিয়েছে যাদের বহু ‘বাড়া ভাতে ছাই’ দিয়েছিলেন বাবুল আক্তার। কিন্তু ঘটনা ভিন্নদিকে ঘুরে যায়, যখন ঘটনার সময় বিদেশ সফরে থাকা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেই সরকার প্রধান হিসাবে তাঁর কাছে সব তথ্য থাকার দোহাই দিয়ে এই ঘটনার জন্য বিএনপি-জামাতকে দায়ী করেন। পুলিশও সেই প্রেসক্রিপশন মতো ত্বরিৎ একজন সাবেক শিবিরকর্মী ধরে আনে, যদিও পরে এই অভিযোগ ওঠে যে, একটা মাজারের ভাগবাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে একপক্ষ অপর পক্ষে থাকা ওই শিবির কর্মীকে অর্থের বিনিময়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।

এরপর তো ফাটলো বোমা – এবার দৃশ্যপটে বাবুল আক্তার এবং পুরো পুলিশ বাহিনী। কী কী ঘটনা ঘটেছে সেটা আমরা সবাই জানি, তাই বিস্তারিত আলোচনা করছি না। তবে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা এই পোস্টের স্বার্থেই বলা দরকার। মিতু হত্যা নিয়ে মোটাদাগে দুইটি ন্যারেটিভ আমাদের সামনে আসে –

১. স্ত্রীর ‘পরকীয়া’ সম্পর্কে ক্ষুব্দ বাবুল আক্তার তাঁর নিজের সোর্স মুসার নেতৃত্বে তাঁর স্ত্রীকে খুন করিয়েছেন।

২. জঙ্গি তো বটেই, চোরাচালান এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে বহু রাজনীতিক এবং পুলিশের উপরওয়ালাদের বিরাগভাজন হয়েছেন বাবুল। তাই এখন জঙ্গির হাতে খুন হওয়া মিতু হত্যার দায় কৌশলে বাবুল আক্তারের ওপর চাপিয়ে তাঁকে চাকরি থেকে সরানোর পাকা ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

মিতুর পরিবার অবশ্য বাবুলের ওপর দারুণ আস্থাশীল। মিতুর বাবা, যিনি নিজেও একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা, একাধিক সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন তিনিও মনে করেন তাঁর নির্দোষ জামাতাকে ‘ফাঁসানো’ হচ্ছে।

অনেক সংবাদ সংস্থাকে (বিশেষত অনলাইন) আমরা দায়িত্বশীল বলে মনে করি না, কিন্তু অনেক অভিযোগ থাকলেও প্রথম আলোকে আমরা নিশ্চয়ই দায়িত্বজ্ঞানহীন পত্রিকা মনে করি না। শুধু পুলিশ কেন, দেশের সব মানুষের আবেগ জড়িয়ে গিয়েছিল এই হত্যাকাণ্ডের সাথে, তাই খুব শক্ত কোন সূত্র না থাকলে স্রোতের বিপরীতে এই রকম খবর তারা প্রকাশ করতো না, এটা বোঝা কঠিন না। সুতরাং বাবুল আক্তার স্ত্রীকে খুন করিয়েছেন কিনা, সেটা স্পষ্ট না হলেও, এটা কিন্তু স্পষ্ট স্ত্রীর খুনের দায় (সত্যি হোক বা মিথ্যা) বাবুল আক্তারের ওপর যাক এটা পুলিশ প্রশাসন এবং সরকারের অতি উঁচু পর্যায় থেকে চাওয়া হচ্ছে।

ওদিকে বাবুল আক্তারকে ফাঁসানো হচ্ছে এই ন্যারেটিভও এসেছে পুলিশের সূত্র থেকেই, যেটা দায়িত্বশীল পত্রিকাতেই এসেছে। যদি এই ন্যারেটিভ সত্যি হয়, তার মানে বাবুলের মতো একজন ‘নিরপরাধ’ মানুষকে এভাবে ফাঁসানো হচ্ছে, এটা মেনে নিতে না পেরে পুলিশ এবং সরকারের একাংশ এটা মিডিয়ায় ফাঁস করে দিয়েছে যাতে মানুষের চাপে এমন ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র সফল না হয়।

বাবুল আক্তারের মতো একজন স্বনামধন্য এসপি কে যেভাবে মধ্যরাতের পর বাসা থেকে তুলে নিয়ে, সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে, ১৫ ঘন্টা ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করা হয়েছে তাতে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মিডিয়ার কল্যাণে মানুষের মুখে মুখে ফেরা দুইটি ন্যারেটিভ এর যে কোন একটি অবশ্যই সত্যি। সমস্যা হলো, সরকার বা পুলিশের পক্ষে সম্ভবতঃ কোন ন্যারেটিভই গ্রহণ করা সম্ভব না – তাঁদের বিচারে এটা ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’ অবস্থা।

এজন্যই প্রথম আলো ইঙ্গিত দিয়েছিল, এই মামলার তদন্ত প্রাথমিক হত্যাকারী পর্যন্ত গিয়েই শেষ হয়ে যাবে। সেদিন থেকেই এই অনুমান করতে থাকে সবাই, ধরা পড়া বা না পড়াদের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে – এরা বেঁচে থাকলে তো কোর্টের ট্রায়ালের সময় থলের সব বিড়াল বেরিয়ে যাবে। তাই হলো। এখন দেখার ব্যাপার যারা ধরা পড়েছে বলে পুলিশ স্বীকার করেছে তাদের পরিনতি কী হয়। আজকের ‘বন্দুকযুদ্ধ’ এর সময় বেছে নিতে দারুণ ধূর্ততার আশ্রয় নেয়া হয়েছে – মানুষ ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছাড়ছে, আর সারা দেশের মানুষ তো এখন ঈদের আমেজেই ঢুকে গেছে – তাই এই ঘটনায় আলোচনা হবে খুব কম। মানলাম, এই দুইজনকে খুন করে আর মুসাকে গুম করে মিতু হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হলো। পুলিশ নিজে চোখ বন্ধ করলো, আমাদেরকেও বললো চোখ বন্ধ করতে, তাতে কি প্রলয় বন্ধ হবে?

সহকর্মীর স্ত্রী খুন হবার পর পুলিশের যে করিৎকর্মা ভাব আমরা দেখেছি, সেটাকে পেশাগতভাবে দেখলে কোনোক্রমেই প্রশংসা করা যায় না, কারণ মিতুর আগে আরো প্রায় পঞ্চাশ খুন পুলিশকে তেমনভাবে জাগাতে পারেনি। তবুও পুলিশের আবেগগত দিক দেখে যদি কিছুটা নমনীয় হই, তাতেও কি পুলিশের আচরণকে প্রশংসা করা যায়? বার/চৌদ্দ হাজার মানুষ গ্রেফতার করে অভিযুক্ত জঙ্গি পাওয়া গেছে দুই শ এর কম। জঙ্গি দমনের নামে শেষ পর্যন্ত একটা ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’ করেছে, এই অভিযোগ শক্তভাবে উঠেছে মিডিয়ায় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বক্তব্যে (এর মধ্যে সরকার সমর্থক মিডিয়া এবং মানবাধিকার সংস্থাও রয়েছে)। সাথে মিলিয়ে নিন শুরুতে ‘টাকা খেয়ে’ প্রাক্তন শিবিরকর্মীকে এই হত্যার অভিযুক্ত হিসাবে গ্রেফতার করার ঘটনা। সাথে যোগ করুন একজন মৃত নারীর চরিত্রের ওপর কালিমা লেপন, তদন্তের নামে ছেলেখেলা। নিজেদের পরিবারের ওপর আক্রমণ হবার পরেও পুলিশের ওপর এমন সব অভিযোগ আসছে, যেগুলো আসতো ‘আম’ মানুষদের ক্ষেত্রেও।

মিতু হত্যাকে কেন্দ্র করে যাবতীয় ঘটনাপ্রবাহে একটা কথ্য প্রবাদ মনে পড়ে যায়, যেটা এই যুগে অচল হয়ে পড়ছে প্রতিদিন, তাই আদি প্রবাদ ‘কাক কাকের মাংস খায় না’ কে পাল্টে দিয়ে বলতে ইচ্ছে হয় – কে বলেছে কাক কাকের মাংস খায় না?

পুলিশকে নিয়ে একাধিক পোস্টে আমি লিখেছি, পুলিশ যেহেতু এই সমাজের অংশ, এই সমাজের দোষ-গুণ সব তার থাকবে। কিন্তু পুলিশের এটাও মনে রাখা উচিৎ যাঁরা জরুরি সেবা দেন মানুষকে, অযৌক্তিক হলেও তাঁদের কাছে মানুষের বেশি প্রত্যাশা থাকবেই। যে কারণে ডাক্তারের সমালোচনাও চারদিকে অন্য অনেক পেশার চাইতে বেশি। এই বিবেচনায় পুলিশেরও উচিৎ মানুষের প্রত্যাশার চাপকে মূল্যায়ন করা, ধীরে ধীরে তাঁদের ওপর মানুষের আস্থা বাড়ানোর জন্য কাজ করা।

মিতু হত্যাকে কেন্দ্র করে একের পর এক যেসব ঘটনা ঘটছে, যার লেইটেস্টটি ঘটলো আজ, তাতে কোন সন্দেহ নেই পুলিশ বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা অনেকখানি কমে যাবে। নিজ বাহিনীর একজন প্রশংসিত সদস্যকে ঘিরে যা করেছে পুলিশ, সেটা একজন ‘আম’ মানুষ হিসেবে আমাকেও হতাশ করেছে। পুলিশ রাতারাতি অনেক দক্ষ-দুর্নীতিমুক্ত হয়ে যাবে, এটা প্রত্যাশা করার মতো বোকা আমি নই, কিন্তু পুলিশ ধীরে ধীরে উন্নতি করবে এটা চেয়েছি। সেটা যদি নাও হয়, কোনোভাবেই মানতে পারি না পুলিশের মূল্যবোধের অন্তত অধঃপতন হবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সেটাই হচ্ছে।

পুলিশকে উদ্দেশ্য করে পোস্টটি লিখা। কিন্তু ভালোভাবেই জানি, পুলিশ তো সরকারেরই একটা অংশ; অত্যন্ত ক্ষমতাশালী অংশ। তাই পুলিশকে যখন আমাদের ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলটি তার আইনগতভাবে সিদ্ধ, কিন্তু নৈতিকভাবে অসিদ্ধ সরকারটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য যাচ্ছেতাইভাবে অনৈতিক কাজে ব্যবহার করে তখন তার মূল্যবোধগত অবনমন ভবিতব্যই হয়ে ওঠে।

স্বপ্ন (অথবা দিবাস্বপ্ন) দেখি বর্তমান বাংলাদেশে পাল্টাপাল্টি করে ক্ষমতায় থাকা দুই ‘বড় দল’ এর বাইরে কোন সত্যিকার কল্যাণমুখী রাজনৈতিক দল আসবে যারা ক্ষমতায় গিয়ে আর সব সংস্থার মতোই পুলিশকেও রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে পেশাগতভাবে কাজ করতে দেবে।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77