ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বিষয়টা অস্বস্তিকর, সন্দেহ নেই। তাই মুখে কুলুপ এঁটে ছিল আমাদের দেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো। যদিও কয়েকদিন আগে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটা বিবৃতি দিয়েছিল। কিন্তু সেটা হতে না হতেই টিভি’র টক শো’তে সরকার পক্ষের কথার লাঠিয়ালরা একেবারে তেড়ে উঠেছেন – গুলশানের নারকীয় হত্যাকান্ড নিয়ে কিছু বলে না এমনেস্টি, আর বিবৃতি দেয় জঙ্গিদের পক্ষ হয়ে! সরকারের সামান্য হালুয়া-রুটির ভাগ পাওয়া ওইসব মানুষের কথা শুনলে এখন আর অবাক হই না মোটেও। কিন্তু সত্যিই ভীষণ অবাক হয়েছি আমাদের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নির্লিপ্ততায়। আর আমরা যারা গুলশান-কাণ্ড নিয়ে নানা রকম কথা লিখে ভরিয়ে ফেলেছি ব্লগ-ফেইসবুক, তারাও এই ব্যাপারে ছিলাম একেবারেই নিশ্চুপ।

স্বীকার করি, নর্থ সাউথ ভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত এর জঙ্গি সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাই খুব বেশি। যেসব ছবি আর ভিডিও আমাদের সামনে এসেছে আর সাথে কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড তথ্য মিলিয়ে নিলে বিষয়টা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়। আরেকজন, তাহমিদ এর ও হয়তো সেই সম্ভাবনাই বেশী। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাদের সামান্যতম সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের শাস্তি চাই আমি, চাইবেন রাষ্ট্র আর আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল যে কোন মানুষও।

গুলশানের রেস্তোরাঁয় সামরিক অভিযানের পর থেকেই পুলিশ আমাদের জানিয়েছিল, হাসনাত আর তাহমিদকে তারা কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের হেফাজতে নিয়েছেন, কিন্তু সেটা ‘গ্রেফতার না’। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে তাদের, যদিও পরিবার দাবি করেছিলো তারা কেউ বাড়ি ফিরে যায়নি। (বিস্তারিত পড়ুন)।

এখন আবার সেই পুলিশ বলছে, উল্লেখিত দুই জন এখন তাদের হেফাজতেই আছে ‘জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে’ (বিস্তারিত দেখুন)। অনুমান করি বাইরের কোন শক্ত চাপে পড়েই এটা আবার স্বীকার করলো সরকার। পত্রিকায় এসেছিল তাহমিদের কানাডার নাগরিকত্বও আছে এবং তার পরিবার তাহমিদের ব্যাপারে রীতিমত কানাডার প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কানাডার সরকারও সেটাকে আমলে নিয়ে তৎপরতা শুরু করেছিল।

সর্বসাম্প্রতিক গল্পের আগে পুলিশের যে গল্প ছিল তাতে তেমন কোন নতুনত্ব ছিল না; এই সরকারের সময় এমন গল্প আমরা আকছারই শুনেছি। তাই কে সত্যি কথা বলেছিল, ওই দু’জনের পরিবার, নাকি সরকার সেটা আমরা বুঝি। তবে সরকারের ধূর্ততায় আমি এবার রীতিমত মুগ্ধ – আগের অনেকগুলো গুমের ঘটনায় সরকার নানামুখী সমালোচনার মধ্যে পড়লেও এটায় তারা কোন সমালোচনার মধ্যে পড়বে না, এটা সম্ভবত নিশ্চিতই ছিলো। ‘প্রায় নিশ্চিত’ জঙ্গিদের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলে গায়ে মৌলবাদী বা স্বাধীনতা বিরোধীদের দোসর এর তকমা লাগাতে চাইবে কে?

হাসনাত আর তাহমিদ ভয়ঙ্করতম জঙ্গি হতেই পারে, বিভিন্ন মহলের দাবি মত এটাও হতে পারে হাসনাতের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় পুরো তাণ্ডবটি পরিচালিত হয়েছে, কিন্তু আমরা কেন এটা ভুলে যাবো, তারা এই দেশের নাগরিক। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার পাওয়া তাদের সাংবিধানিক অধিকার। সেই বিচারে তাদের মৃত্যুদন্ডও হতে পারে। কিন্তু বিনা বিচারে মানুষকে হত্যা করা বা গুম করে ফেলা (যদিও এবার সরকার ওদের দুইজন কে শেষ পর্যন্ত ‘হজম’ করতে পারেনি) জনগণের সাথে রাষ্ট্রের চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই দেশের আর সব সরকারের মতো এই সরকারও এই লংঘন করে চলেছে প্রতিনিয়ত, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন নামের প্রহসনটির পর থেকে এটা মহামারীর রূপ নিয়েছে।

সমস্যা হচ্ছে অনিয়মের মধ্যে দীর্ঘকাল বাস করতে করতে এক সময় সেটা আমাদের গা সওয়া হয়ে যায়। যেমন আমরা মেনেই নিয়েছি দেশের তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার পর থানা পর্যায়ের একজন পাতি নেতাও কয়েক কোটি টাকা কামাবে (বড় নেতাদের কথা বাদই দেই)। তাই আজ এসব অনিয়ম আমাদের গায়ে লাগে না। একই ঘটনা ঘটেছে হাসনাত-তাহমিদের ক্ষেত্রেও – রাষ্ট্রের এতো উঁচু পর্যায়ে বসে ওই দুইজনকে নিয়ে একেকবার তারা একেক কথা বলছেন। আমাদেরও গায়ে লাগে না আর ওসব – এসব তো কতোই বলে তারা, আমাদেরও গা সওয়া হয়ে গেছে এসব ফাজলামো।

হোক জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া (বা বিনা ভোটের) কোন মন্ত্রী কিংবা জনগণের করের টাকায় পোষা কোন সরকারী কর্মকর্তা, কোন নাগরিকের ন্যূনতম নাগরিক অধিকার নিয়ে, জনগণের সাথে রাষ্ট্রের চুক্তি নিয়ে কেউ ফাজলামো করার অধিকার রাখে না, এমনকি সে যদি ‘প্রায় নিশ্চিত’ বা ‘পুরো নিশ্চিত’ ভয়ঙ্কর জঙ্গিও হয়। তাদের ন্যায়বিচার পাবার অধিকারের পক্ষে আমি দৃঢ়ভাবেই আছি, তাতে আমাকে কেউ জঙ্গিদের বা যুদ্ধাপরাধীদের দোসর বলুক, আমি কেয়ার করি না।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77