ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কোন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তার জীবন উৎসর্গ করতে হবে এটা নিশ্চিত জেনেও কোন মানুষ যখন সেই কাজে যায়, তখন সেই মানুষটিকে নিয়ে আর যাই করি আমরা বিদ্রুপ করাটা ভয়ঙ্কর অন্যায়। দেশের জঙ্গিরা যখন গুলশানে হামলা করে নিরীহ মানুষ হত্যা করে, তখন আমি-আপনি আমাদের নৈতিকতার বোধ দিয়ে এক নিমিষেই বুঝে নেই ওখানে যারা এই কাণ্ড ঘটিয়েছে, তারা নিশ্চিতভাবেই ভয়ঙ্কর অন্যায় করেছে। তারা ভয়ঙ্কর অন্যায় করেছে সত্যি, কিন্তু সেটা করতে গেছে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও। তাদের আদর্শের একশ একটা সমালোচনা করতে পারি আমি, কিন্তু তাদের আত্মনিবেদনের, তাদের নিষ্ঠা দেখে শুধু মুগ্ধই হওয়া যায়।

আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের বেশ খানিকটা পরে। কিশোর বয়স থেকেই নিজেকে প্রশ্ন করেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাপ্তবয়স্ক থাকলে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে আমি কি মুক্তিযুদ্ধে যেতাম? দ্রুতই উত্তর পেয়েছি – হ্যাঁ যেতাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কিছু সুইসাইড বম্বার এর কথা জানা যায় যারা সামরিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিশ্চিতভাবে জেনেই জীবন উৎসর্গ করেছে। আমি সেটা জেনে নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, যুদ্ধে গিয়ে কি আমি সুইসাইড বম্বার হতে পারতাম? আমি ভীষণ কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম। আজও যদি প্রশ্ন করি নিজেকে, অবস্থানটা আজও একই, কনফিউজড, কিন্তু সুইসাইড বম্বার না হতে চাওয়ার সম্ভাবনাই অনেক বেশী। জানি না, এতে আমার দেশপ্রেমের দারুণ ঘাটতি আছে, এটা প্রমাণিত হলো কিনা। কিন্তু একজন মানুষ তার কাজ সম্পাদনের বিনিময়ে জীবন দিয়ে দিতে পারে কতোটা মোটিভেইটেড হলে সেটা বোঝার জন্য ব্যক্তিগত কথাটা বলা।

অবশ্য জঙ্গিদের আত্মনিবেদনকে খাটো করে দেখানোর জন্য নানা রকম নতুন তত্ত্ব আমাদের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে যার নবতমটি – ‘ক্যাপ্টাগন তত্ত্ব’। মধ্যপ্রাচ্যের আইএস এই উত্তেজক এম্ফিটামিন পিল গ্রহণ করে বলে ব্যাপক প্রচারণা আছে। আমাদের জঙ্গিরাও নাকি এটা খেয়ে হাসতে হাসতে জীবন দিয়ে দিয়েছে। এটা যে আমাদেরকে কী দারুণভাবে বোকা বানাবার চেষ্টা সেটা আমরা অনেকেই বুঝি না। এম্ফিটামিন মানুষের নানা ক্ষেত্রে উদ্দীপক হিসাবে কাজ করে – এটা আনন্দের অনুভূতি দারুণভাবে বাড়ায়, ঘুম দূর করে, স্ট্যামিনা বাড়ায়। ফলে এটা খেয়ে কেউ ক্লান্তিহীনভাবে কোন কাজ করে যেতে পারে। কিন্তু এই ওষুধ মোটিভেশন দেয়? স্টুপিড যুক্তি।

মজার ব্যাপার হলো ‘ক্যাপ্টাগন তত্ত্ব’ তত্ত্ব যদি সত্যি হয়, তাহলে তো এই দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষকে সুইসাইড বম্বার বানিয়ে ফেলা সম্ভব এক নিমিষেই। ক্যাপ্টাগন এর খুব কাছাকাছি প্রভাবসম্পন্ন এক মাদক তো এই দেশের সব বয়সের, সব শ্রেণীর অসংখ্য মানুষের কাছে ডালভাতে পরিণত হয়েছে। হ্যাঁ, আমি ইয়াবার কথা বলছি যেটা মেথাম্ফিটামিন এবং ক্যাফেইন এর মিশ্রণ। তো এই দেশের লাখ লাখ ‘ইয়াবাখোর’ কে ধরে দুই কথা বলে ‘ব্রেইনওয়াশ’ করে জীবন দিয়ে যে কোন কাজ করতে পাঠিয়ে দেয়া যাবে? এতো সোজা?

ইদানিং প্রধানমন্ত্রী বার বার পরিবারকে সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখার ব্যাপারে জোর দিচ্ছেন। রীতিমত টিভি বিজ্ঞাপণ তৈরি করে এখন দেখানো হচ্ছে চ্যানেলে চ্যানেলে। ওদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মন্ত্রীরা সম্মেলন করছেন, নানাভাবে তাদেরকে চাপ দিচ্ছেন। আর ‘সোনার ছেলে’দের সংগঠন ছাত্রলীগ তো সেখানে ‘সরব’ রাজনীতি চালু করে যাবতীয় জঙ্গিবাদ দমনের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে (বিস্তারিত দেখুন)।

আমাদের বাহিনীগুলোর উচ্চপদস্থ কর্তারা নানা রকম হুমকি-হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন জঙ্গিদের। এটা অবশ্য তাঁদের করারই কথা, শক্তি প্রয়োগে জঙ্গি নির্মূল করা যাবে, এটা যদি হয়, তাহলে পুলিশ-র‍্যাব আরও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হবে, গুরুত্বপূর্ণ হবে (দুর্জন এমনিতেই তাদের বলে ‘দেশের রাজা’; আরো ক্ষমতাশালী হলে কী নামে ডাকা হবে তাদের?)। এইসব হুমকি-ধামকি দেখে হাসি পায় – আমরা এমন মানুষকে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছি যে এর মধ্যেই জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এই খবরে আছে শোলাকিয়া হামলা থেকে গ্রেফতার করা গুলিবিদ্ধ এক জঙ্গি সম্পর্কে র‍্যাব এর জনৈক মেজর বলছেন,

“তার সাথে কথা বললাম, তার মধ্যে কোন ভয়ই নাই। সে বুলেটবিদ্ধ; তার মধ্যে কোন যন্ত্রণা নেই।”

আর কয়েকদিন আগে জঙ্গিবাদের কারণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার স্বভাবসুলভ বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলেছেন – উচ্চবিত্তের সন্তানরা বেহেস্তের হুরপরির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আচ্ছা একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিমের কাছে বেহেশত পাবার (প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় হুরপরী পাবার) লোভ কি খারাপ কিছু? জঙ্গিবাদী আক্রমণ করে সেটা পাবে কিনা সেটা অন্য আলোচনা। বেহেশতের লোভ কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেই? আমাদেরকে ক্রমাগত তাঁর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তো বটেই, তাহাজ্জুদ এর নামাজের খবর জানানো হয়, তাঁর নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াতের খবর পাই আমরা, হজ্জ্ব পালনের ছবি আসে; তো একজন প্র্যাকটিসিং মুসলিম হিসাবে তিনি কি পরকালে বেহেশতে যেতে চান না? হুরপরীর উপমাটা ব্যবহার করলাম না, কারণ ছেলেদের জন্য যেমন হুরের কথা আছে ইসলামের টেক্সটগুলোতে, নারীদের জন্য বেহেশতে তেমন কী আছে সেই নির্দেশনা নেই।

একটু গভীরভাবে ভাবলেই দেখবো, জঙ্গিবাদের কারণ আর প্রতিকার নিয়ে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক বালখিল্য কথা বলেই যাওয়া হচ্ছে, যেটা জঙ্গিবাদ নির্মূলে সরকারের অন্তরিকতাকেই ক্রমাগত প্রশ্ন করে যাচ্ছে। যাবতীয় দায় পরিবার, ভার্সিটি, ক্যাপ্টাগন আর হুরপরির লোভের ওপর দিয়ে দেয়া গেলে তো দারুণ মজা – দেখানো যায় দোষ বাঁকি সবার, সরকার একেবারে সহি পথেই আছে। এমন চেষ্টা আমাদের সংস্কৃতিতে আছে বলেই আমাদের ভাষায় প্রবচন আছে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’। এসব ফালতু প্রচারণার ভীড়ে আমরা ভুলেই যাবো, বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা জারি রেখে কোনদিন জঙ্গি নির্মূল হবে না, বরং এটা বাড়বেই ক্রমাগত কারণ এটাই জঙ্গিবাদের মূল কারণ।

অনিবার্য প্রশ্ন – আমাদের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পচিয়ে ফেলেছে কে? উত্তরটা আমাদের জানাই আছে – রাজনৈতিক দল নামের লুটেরা দলগুলো, ক্ষমতায় গিয়ে যাচ্ছেতাই লুটপাট করে নিজেদের আখের গোছানোই যাদের কাছে ‘রাজনীতি’।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77