ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

এই সমাজে দুর্মুখের অভাব নাই, নিজে ন্যূনতম ভালো কিছু করিবার মুরোদ না থাকিলেও অন্যের ভালো কাজের ফালতু সমালোচনা করিয়া উঁহাদের পথ কণ্টকাকীর্ণ করিতে তাহাদের জুড়ি নাই। দীর্ঘকাল হইতেই দেখিতেছি ‘সোনার ছেলে’ ছাত্রলীগের পেছনে এই দুর্মুখেরা লাগিয়া উহাদের একেবারেই উল্টো ভাবমূর্তি বিনির্মাণ করিয়াছে। উহাদের এহেন গোয়েবলসীয় প্রচারণায় আমার মতো অতি জ্ঞানী মানুষও দীর্ঘদিন বিভ্রান্ত ছিলাম, দুর্মুখের মতো লিখিয়াছিলাম একের পর এক ফেইসবুক স্ট্যাটাস আর ব্লগ। লজ্জাবনত চিত্তে এই মুহূর্তেই মনে পড়িতেছে একখানা ব্লগের কথা – জরায়ুও কি বাসযোগ্য রাখবে না ছাত্রলীগ?

অদ্য এই ব্লগখানা লিখিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছি গত কিছুদিন ছাত্রলীগ লইয়া গভীর চিন্তার পর। বলা বাহুল্য, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাইয়া দিয়া ছাত্রলীগের কর্মকান্ডের অন্ধ নিন্দা জনিত আমার অপরাধের আত্মস্বীকৃতিমূলক পোস্ট ইহা। দেরিতে হইলেও আমি ভিন্নদিকে হইতে চিন্তা করিয়াছি, আর উহাতেই ছাত্রলীগ লইয়া আমার এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হইয়াছে। আমি অত্যধিক জ্ঞানী মানুষ হওয়ায় বিষয়টা তবুও অনুধাবন করিতে পরিয়াছি, কিন্তু এই ব্লগের কম জ্ঞানী ব্লগার এবং পাঠকগণ পূর্বের বিভ্রান্তির মধ্যে পড়িয়া থাকিবেন ভাবিয়া আমার চিন্তা সকলের সাথে শেয়ার করিতেছি। আশা করি এই ব্লগখানা সকলের মুদিত চক্ষু খুলিয়া দিবে, আর ইহাতেই ছাত্রলীগ লইয়া আমার পূর্বে কৃত পাপের কিঞ্চিৎ প্রায়শ্চিত্ত হইবে।

এই সরকার ক্ষমতায় আসিবার পর হইতেই নানা কারণে ছাত্রলীগ পত্রিকার খবরে আসিয়াছে। অতোগুলোর উল্লেখ এই সংক্ষিপ্ত ব্লগে সম্ভব নয়, ইহা এনসাইক্লোপিডিয়া নহে। তাই আমি শেষ একটি ঘটনার উল্লেখ করিয়া আমার নতুন চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করিবার প্রয়াস পাইবো – কয়েকদিন পূর্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন কমিটিতে পদ না পাইয়া ছাত্রলীগের একাংশ ক্যাম্পাসে ভাংচুর সহ তুলকালাম ঘটাইয়াছে (বিস্তারিত পঠন)। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টেও ছাত্রলীগকে অহেতুক নিন্দা করার পূর্ববর্তী ধারা জারি আছে।

যেই দিক থেকে বিচার করিয়া ছাত্রলীগ সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পাল্টাইয়া গেল, সেইদিক থেকে বিষয়টাকে দেখা যাক। পদ না পাওয়া হেতু ছাত্রলীগের তাণ্ডবই কেবল আমরা দেখিলাম, এই তাণ্ডবের পিছনে পদপ্রাপ্তির জন্য তাহাদের আগ্রহের তীব্রতাটা আমরা দেখিলাম না!

এই লিঙ্কখানায় ছাত্রলীগ বিষয়ে এই সকল তথ্য পাওয়া যায় – ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি হইতে ২১ নভেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত ছয় বছরে ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে বা অন্য সংগঠনের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৫৪ জন নিহত হইয়াছিলেন। নিজ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হাতেই মারা গিয়েছিলেন সিংহভাগ – ৩৯ জন। এই সময়ে ছাত্রলীগের সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করিতে হইয়াছিলো। এইখানেও দেখা যায় নিজেদের মধ্যে ভীষণ মারামারি-খুনোখুনি করিয়াছে ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের কর্মকান্ডের কারণ ভীন্নভাবে বুঝিতে গেলে শিরোনামে উল্লেখ করা পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৪৮ নম্বর আয়াতের মর্মার্থ বুঝিতে হইবে আমাদের। এইখানে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যাইতে পারে, বাংলাদেশের বর্তমান গদিনসিন প্রধানমন্ত্রী কিছুকাল পূর্বে ঘোষণা করিয়াছিলেন বাংলাদেশ পরিচালিত হইবে মদীনা সনদ অনুযায়ী। আগে থেকেই ছাত্রলীগ সূরা বাকারার পূর্বোল্লিখিত আয়াত অনুযায়ী চলিতেছে, আর নেত্রীর ওই ঘোষণার পর উহা আরও বহুগুনে বাড়িয়াছে; বাড়িবারই কথা। তো কী আছে ওই আয়াতে? অসাধারণ উক্ত আয়াতের একটা অংশ হইলো –

“সুতরাং তোমরা কল্যাণকর্মে প্রতিযোগিতা কর”।

এইবার একটু মিলাইয়া লই ছাত্রলীগের সহিত। ১৯৭১ সালে যে চেতনা লইয়া আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ হইয়াছিলো, সেই চেতনায় দেশ গড়িবার নিমিত্ত ছাত্রলীগ কি নিরলস পরিশ্রম করিয়া যাইতেছে না? মানুষের কল্যাণের কোন কাজটিতে ছাত্রলীগ নেই? যৎকিঞ্চিৎ মাসোহারার বিনিময়ে (দুর্মুখেরা ইহাকে চাঁদাবাজি বলে) ব্যবসায়ীদের নির্বিঘ্নে ব্যবসায় করিতে দেয়া, সামান্য কমিশনের বিনিময়ে (নিন্দুকেরা ইহাকে টেন্ডারবাজি বলে) ভালো ঠিকাদারগণকে ঠিকাদারি পাইতে সাহায্য করিয়া দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পথে বিরাট অবদান রাখিতেছে। অপরপক্ষে স্বাধীনতাবিরোধী বলিয়া ন্যূনতম সন্দেহ হওয়া মাত্র কোন ব্যক্তিকে (এমনকি হিন্দু হইলেও) প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে কোপাইয়া মারিয়া ফেলিয়া দেশ স্বাধীনতাবিরোধীদের দোসরমুক্ত রাখিবার যাবতীয় প্রচেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে। এমনকি হালের জঙ্গীবাদ দমনে জঙ্গিবাদের সূতিকাগার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ছাত্রলীগ নামিতেছে ‘সরবে’। ইহা আশা করাই যায়, ছাত্রলীগ অতিসত্বর দেশকে জঙ্গিবাদ মুক্ত করিবেই। ইহা স্বীকার করিতে আমার কোন দ্বিধা নাই, অদ্যাবধি দেশ এবং দেশের যাবতীয় সব কল্যাণকর কাজে ছাত্রলীগ ছিল, আছে, থাকবে।

উপরোক্ত সকল কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত হইতে ছাত্রলীগের প্রতিটি নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর মনোবাঞ্ছা থাকাটা কি অতি স্বাভাবিক নহে? এখন কমিটিতে না যাইতে পরিলে এই সকল কল্যাণকর কাজে তাহারা নিয়োজিত হইতে পারিবে কীভাবে? কিন্তু সীমিত পদের কমিটি স্বাভাবিকভাবেই পারে না সকল নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীর স্থান সংকুলান করিতে। তাই প্রতিযোগিতা হেতু উহাদের মধ্যে রেষারেষি এবং মারামারি তো হইবারই কথা।

সামান্য এক ফুটবল খেলায় বল দখলের নিমিত্ত এক খেলোয়াড় আরেকজনের উপর কি বিশ্রীভাবে চড়াও হয় না? ফাউল করিয়া একজন অপরজনকে শারিরীকভাবে আহত-রক্তাক্ত করে না? আর ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে ইহা দেশ ও দশের কল্যাণ সাধনের মতো অতি সিরিয়াস বিষয় – রক্তপাত এবং হতাহতের ঘটনা এইখানে তো নিত্যনৈমিত্যিক বিষয় হইবারই কথা। অপরপক্ষে আমরা ভুলিয়া যাই কেন, যুবাদের রক্ত এমনিতেই উত্তপ্ত থাকে, আর ছাত্রলীগের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় স্বাধীনতার চেতনা প্রবাহমান, তাই উহাদের রক্তের উত্তাপ সাধারণ যুবাদের চাইতে অনেক বেশিই হইবার কথা।

ছাত্রলীগকে আমিই যে শুধুমাত্র ভুল বুঝিয়াছি, তাহা নহে। মনে পড়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসিবার পর ছাত্রলীগের কর্মকান্ডের বিভ্রান্ত হইয়াছিলেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। আমাদের ভুলিয়া যাইবার কথা না, ক্ষিপ্ত হইয়া তিনি জননী হইয়াও সকল সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছিলেন ছাত্রলীগের সাথে। বলা বাহুল্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো সর্বোচ্চ খাস মানুষের এহেন সিদ্ধান্ত আমাদের মতো আমদিগকে বিভ্রান্ত করিয়াছিল; আমরাও যার পর নাই ক্ষিপ্ত হইয়াছিলাম ছাত্রলীগের উপর। প্রাজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী তাঁহার ভুল বুঝিতে পরিয়াছিলেন কিছুকাল পরেই। এরপর হইতে আমরা দেখিতে পাই গণভবনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়মিত দাওয়াত, আর সেখানে হাস্যোজ্জ্বল মুখে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে দেখা যায় সোনার ছেলেদের সাথে নানা বিষয়ে মতবিনিময় করিতে। এরপর থেকেই আমার মনের পরিবর্তন ঘটিতে শুরু করে, আমি আমার অবস্থা পুনর্বিবেচনা করিতে শুরু করি। পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি নেহায়েত অত্যধিক জ্ঞানী বলিয়া আমি এই ভুল হইতে মুক্ত হইতে পরিয়াছি।

এই রচনাখানা আমার কৃত অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে ‘নাকে খৎ’, যদিও আমি মানি, ইহা কোনোভাবেই যথেষ্ঠ নহে। খুব ভালো হইতো আমি আক্ষরিক অর্থেই নাকে খৎ দিতেছি এইরূপ একখানা ছবি যদি এই রচনার সহিত সংযুক্ত করিতে পারিতাম। নানা কূল ভাবিয়া আমার অহম কাজখানা করিতে দিলো না আমাকে। আমার এই অক্ষমতা ছাত্রলীগ মার্জনা করিবে বলিয়াই আমার বিশ্বাস।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77