ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

“ওই আনু মুহাম্মদ, না মনু মুহাম্মদ এর কথায়….” এভাবেই বক্তব্য শুরু করে একদিন সংসদে শ্রদ্ধেয় আনু মুহাম্মদকে বিদ্রুপ করার চেষ্টা করেছিলেন অত্যন্ত নীচু সাংস্কৃতিক মানের আওয়ামী লীগ নেতা (তখন মন্ত্রী ছিলেন তিনি) ডঃ হাসান মাহমুদ। আর একই মানের অন্য সাংসদেরা সেই বক্তব্যে দারুণ হাততালি দিয়েছিলেন। ওইসব মানুষদের পিত্তি জ্বলার কারণ ছিল ওই সময় তাঁর সংগঠন উন্মুক্ত কয়লাখনি, কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট, অসম চুক্তিতে সমূদ্রের গ্যাস ব্লক ইজারা দেয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন। এই সরকার আনু মোহাম্মদকে কীভাবে দেখে, সেটা সেদিনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য শুধু এই সরকার কেন, এর আগের বিএনপি সরকারের সময়েও আমরা দেখেছি ফুলবাড়িকে কেন্দ্র করে আনু মোহাম্মদ চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন সেই সরকারেরও।

একজন মানুষ এই ‘রাজ্য’এর দুই ‘সম্রাজ্ঞী’র রাজত্বের সময় উভয়েরই চক্ষুশূল থাকেন – একজন মানুষের সততা-নৈতিকতার পক্ষে এর চাইতে বড় প্রমাণ সম্ভবত আর কিছুই হতে পারে না। আনু মুহাম্মদ আর প্রকৌশলী শহীদুল্লাহ এবং তাঁদের সংগঠনের সততা-সদিচ্ছা সম্পর্কে এই দেশবাসী জানে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পণা বাতিলের দাবীতে কাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও অভিমুখে মিছিল ছিল তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আয়োজনে। আনু মুহাম্মদ দের বক্তব্যের সাথে কারো দ্বিমত থাকতে পারে কিন্তু কেউ নিশ্চয়ই তাঁদেরকে অসৎ, ধান্দাবাজ, মতলববাজ বলে মনে করেন না; অবশ্য সামান্য কিছু বৈষয়িক লাভের বিনিময়ে মেরুদন্ড বিকিয়ে দেয়া দলকানা মানুষদের কথা আলাদা। এই পোস্টের উদ্দেশ্য অবশ্য আনু মুহাম্মদের এবং তাঁর সংগঠনের ‘সহিত্ব’ নিয়ে কোন কিছু বলা নয়, এটা প্রমাণিত হয় গেছে বহুকাল আগেই। এই পোস্টের আলোচনার বিষয় এই সরকারের প্রচন্ড অসহনশীল, অগণতান্ত্রিক আচরণ নিয়ে।

পরবর্তী আলোচনার আগে সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদটি দেখা যাক – “জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে”। হ্যাঁ, সমাবেশ আর মিছিল করার অধিকার আছে, তবে তাতে শর্তও আছে। এখন এই শর্তের অজুহাত দেখিয়ে তো সরকার চাইলে দেশে একটা মিছিলও হতে নাও দিতে পারে। ঠিক এটাই করছে সরকার এখন।

কাল মুহুর্মুহু টিয়ার গ্যাস আর লাঠি চার্জ করে তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির মিছিল ছত্রভঙ্গ করার পর সেখানে কর্মরত রমনা এলাকার পুলিশের ডিসি জানিয়েছেন মিছিলের কারণে রাস্তায় যান চলাচলের সমস্যা হয়েছিল বলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করা ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না। আপাতদৃষ্টিতে কারণটা যৌক্তিক মনে হতে পারে, কিন্তু আসলেই কি?

সংবিধান যখন মানুষকে মিছিল করার অধিকার দেয় তখন রাষ্ট্র এটাও মেনেই নেয় এর কারণে রাস্তায় চলাচলকারী মানুষের কিছু সমস্যা হতেই পারে মিছিলের কারণে – রাস্তা ছাড়া মিছিল হতে পারে না। সংবিধানে শর্ত হিসাবে বলা হয়েছে জনশৃঙ্খলা আর জনস্বাস্থ্যের সমস্যা হবার কথা। এটা ঠিক, কখনো কখনো মিছিল জনশৃঙ্খলার সমস্যা করে থাকে – মিছিল থেকে যানবাহনে হামলা করে ভাংচুর এর ইতিহাস আমাদের দেশে অনেক আছে। এখন প্রশ্ন হলো তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে কি এমন কোন ঝুঁকি আছে?

নানা ইস্যুতে দীর্ঘদিন থেকে তেল-গ্যাস কমিটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজপথে আন্দোলন করছে। এর আগে রাস্তার আন্দোলনে পুলিশের বেধড়ক পিটুনিতে আনু মুহাম্মদ, রেহনুমা আহমেদদেরকে মারাত্মকভাবে আহত হতে দেখেছি আমরা। পুলিশের ‘ইট’ এর পাল্টা ‘পাটকেল’ ছোঁড়া পৃথিবীব্যাপী চৰ্চা, কিন্তু এঁদেরকে তো এটা করতে দেখা যায়নি, এমনকি মাথা গরম করে নিরীহ মানুষ, গাড়ি বা দোকানপাটের ওপর চড়াও হতেও দেখা যায়নি কোন কম বয়স্ক সদস্যকেও। তো জনশৃঙ্খলা নষ্ট হবার ঝুঁকি এই সংগঠনের আন্দোলনের ক্ষেত্রে আদৌ কি ধোপে টেকে?

একটা মিছিলের কারণে কিছুক্ষণের জন্য রাস্তার যানবাহনের ধীরগতি হতে পারে। মিছিলটাকে এগোতে না দিয়ে লংকাকান্ড বাঁধিয়ে বরং ওই রাস্তাকে ভয়ঙ্কর জ্যামের মধ্যে ফেলে দেয়া হয় দীর্ঘক্ষণ – সব মিডিয়ার খবরে এটা এসেছে। ওদিকে মাঝে মাঝেই নানা কারণে ক্ষমতাসীন দল আর তাদের অঙ্গসংগঠন নানা কর্মসূচিতে সারা ঢাকা জুড়ে রাস্তায় মিছিল করে জ্যামে শহরকে স্থবির করে রাখার খবর আমরা সবসময় পাই পত্রিকায়; আমি নিজেও এমন ঘটনার ভুক্তভোগী হয়েছি বহুবার। এই তো কয়েকদিন আগেই সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট জঙ্গিবাদ বিরোধী মিছিল নিয়ে শহরের একটা বড় অংশ প্রদক্ষিণ করে গুলশান গেলো; তাদের অনুমতি দেয়া হলো কেন? মানে হলো, সরকার আর তার তাঁবেদার সংগঠন ছাড়া এই দেশের ‘গণতন্ত্র’ আর কারো জন্য নয়।

এই মিছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত গেলে কী হতো? এরা প্রধানমন্ত্রীর গদি উল্টে দিতো? প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতো? সেখানে গিয়ে বড় জোর কয়েকটা কথা বলতো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করার জন্য; দিতে পারতেন প্রধানমন্ত্রীকে একটা স্মারকলিপিও। এটা নিয়ে এতো ভয় কীসের?

ভয়ের কারণ খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০১৪ সালে। ওই বছর হয়ে যাওয়া নির্বাচন নামের প্রহসনটির মাধ্যমে ক্ষমতায় থেকে যাবার পর থেকেই সরকারের মারমুখী আচরণ দিনে দিনে প্রকটতর হয়েছে। এর আগে ২০০৯ সালের আওয়ামী লীগ সরকারও মিটিং-মিছিল করার সাংবিধানিক অধিকার সহ অনেক গণতান্ত্রিক অধিকারই সংকুচিত করেছিলো, কিন্তু তুলণায় সেটা বর্তমান সরকারের চাইতে অনেকটা নমনীয় ছিল। অথচ এই সরকার বিএনপি’কে মিছিল করা দূরে থাকুক, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচিতেও বাধা সৃষ্টি করেছে। এবার রমজানে অনেক ছোট ছোট রাজনৈতিক দল সরকারি বাধার কারণে ইফতার পার্টির মতো নির্দোষ ঘরোয়া অনুষ্ঠান করতে না পারার অভিযোগ করেছে।

অবশ্য এটাই হবার কথা – এই জনসমর্থনহীন সরকার টিকে আছে স্রেফ পুলিশকে পেটোয়া বাহিনী হিসাবে ব্যবহার করে। সরকারের এই আক্রমণাত্মক হওয়াটা প্রমাণ করে সরকার এখন ছায়াকেও ভয় পাচ্ছে। ভারতের সমর্থনে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে পেরে দেশের স্বার্থকে বিকিয়ে দিয়ে ভারতের সকল চাহিদাকে পূরণ করছে বিনা বাক্যব্যায়ে। আর এই পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের স্বার্থের পক্ষে কোন দেশপ্রেমিক দাঁড়ালেই তার ওপর নেমে আসেছে নিপীড়ন।

বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সরকারের উচ্ছিষ্টভোগী কিছু সুশীল উন্নয়নের স্বার্থে এক ধরণের ‘অথরিটারিয়ান গণতন্ত্র’ হিসাবে মেনে নেবার কথা বলছেন। কিন্তু এই সরকার ‘অথরিটারিয়ান’ এর পর্যায়েও নেই বহুদিন, এই সরকার এখন টোটালিটারিয়ানিজম এর অনুসারী; কিছুটা ভীন্নতা থাকলেও, এর পরিচিত প্রতিশব্দটা হলো – ফ্যাসিজম।

পূনশ্চঃ সদ্য প্রয়াত মহিয়সী লেখক মহাশ্বেতা দেবী ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়ে এক ভাষণ দিয়ে সবাইকে আবেগাপ্লুত করেছিলেন, আক্ষরিক অর্থেই অনেককে কাঁদিয়েছিলেন। সে আলোচিত ভাষণ শুরু হয়েছিল এই বাক্যটি দিয়ে – “প্রতিবাদের অধিকার পৃথিবীর যে-কোন জায়গায় মানুষের প্রথম মৌলিক অধিকার”।

অফটপিকঃ মনে পড়ে মহাশ্বেতা দেবীর এক সাক্ষাৎকারে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী তাঁকে জানিয়েছিলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নাকি তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠক।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77