ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

লিখাটা ঝুঁকিপূর্ণ, সমূহ সম্ভাবনা আছে অনেকের চোখে ‘ভারতের দালাল’ হয়ে যাবার, তবুও লিখছি। তবে পোস্টের শুরুতে একটা বিষয় স্পষ্ট করে নেয়া দরকার – দেশের অসংখ্য মানুষের মতো আমারও ন্যূনতম ভারতপ্রীতি নেই। ভারতকে একটা ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্যবাদী দেশ বলে আমি মনে করি, আর আমাদের মতো একটা দেশকে সবদিক থেকে শোষণ করে ছিবড়ে বানিয়ে দেবার চেষ্টার কারণে দেশের জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশের মতো আমিও এই দেশের সাম্রাজ্যবাদকে প্রচন্ড ঘৃণা করি। আশা করছি সহসাই এই বিষয় নিয়ে একটা বিস্তারিত পোস্ট লিখবো। আগেও লিখেছি এসব নিয়ে; এরকম পোস্ট –
রাজনীতিতে ‘ভারত বিরোধী কার্ড’ থাকবেই
ভারতকে ‘ধন্যবাদ’, শুধু চোরাকারবারির ওপর তাদের ‘শিকার-বিলাস’

আজকের পোস্টটি লিখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টদের হিন্দিতে সাক্ষাৎকার দেয়া নিয়ে ফেইসবুকে তাদের মুণ্ডুপাত চলতে থাকা দেখে। বিবিসি হিন্দি’র একটা অনুষ্ঠানে ওই ভার্সিটির স্টুডেন্টরা হিন্দিতে কথা বলে অনেকের চোখে এমন ‘ভয়ঙ্কর অপরাধ’ করে ফেলেছে যে, কেউ কেউ গালিগালাজ করে তাদের জন্মের ঠিকুজি বের করে ফেলেছে অত্যন্ত অমার্জিত ভাষায়। আবার কেউ কেউ এতোটা ভয়ঙ্কর আচরণ না করলেও এটাকে ‘ভুল’ বা ‘ঠিক হয়নি’ টাইপ কাজ বলে মনে করেছে। কেউ কেউ আর তাদের ‘অপরাধ/ভুল’ কে আরো লঘু করে তোলার চেষ্টা করেছে এটা বলে যে, ওদেরকে নাকি হিন্দিতে কথা বলার জন্য বলা হয়েছিল। এই আলোচনার জন্য আমরা ধরে নেবো কারো অনুরোধে নয়, ওরা এবেবারেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই হিন্দিতে কথা বলেছে।

পরবর্তী আলোচনায় যাবার আগে একটু ভীন্নভাবে ঘটনাটাকে দেখা যাক। ধরে নেই একটা ফ্রেঞ্চ টিভি/রেডিও চ্যানেল ওই ভার্সিটিতে গেল একটা অনুষ্ঠান করতে আর সেখানে স্টুডেন্টরা ফ্রেঞ্চ ভাষায় সাক্ষাৎকার দিলো, তাতে কি আমাদের বুক গর্বে ফুলে উঠতো না? আমাদের কি মনে হতো না, আমাদের তরুণ স্টুডেন্টরা কী দারুণ চৌকষ! কারো বুক গর্বে ফুলে না উঠলেও এখনকার মতো এমন ক্ষুব্ধ হতাম না আমরা, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তো এখন আমাদের স্টুডেন্টরা একটা বিদেশী ভাষায় কথা বলেছে দেখে আমরা কেন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছি এভাবে? এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা হতে পারে, নানা কারণে রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের প্রতি আমাদের ক্ষুব্ধতার একটা বহিঃপ্রকাশ এটা। কিন্তু এটা করে কি আমরা লাভবান হবো? নাকি এটা আমাদের বোকামী হিসাবেই সাব্যস্ত হবে?

প্রতিটি ভাষা শেখা, সেটা যেই ভাষাই হোক না কেন, একটা মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। নানাভাবে সেটা একজন মানুষকে সাহায্য করে। আর সেই ভাষাটা যদি হয় হিন্দি তাহলে সেটা তো দারুণ ব্যাপার। কারণ?

বর্তমান পৃথিবীর সবচাইতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর (G – 7) পরে যে দেশগুলো উন্নত হবে তাদের নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে বলা হয় BRICS (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দঃ আফ্রিকা)। হ্যাঁ, ভারত এই তালিকায় আছে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশের বাস ভারতে – মোটাদাগে পৃথিবীর প্রতি ৫ জন মানুষের একজন ভারতীয়। ১৩০ কোটি ভারতীয়র মধ্যে দক্ষিণের কয়েকটি রাজ্যের মানুষ ছাড়া (যাদের ভাষা দ্রাবিড়) প্রায় সব রাজ্যের মানুষ হিন্দি ভাষায় যোগাযোগ করতে পারে (এমনকি যেসব রাজ্যে অন্য কোন ভাষার অস্তিত্ব আছে সেসব রাজ্যেও)। আর সাম্প্রতিক ট্রেন্ড দেখে এটাও যৌক্তিকভাবেই অনুমান করা যায়, দ্রাবিড়ভাষী অঞ্চলও হিন্দিতে যোগাযোগে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। তার মানে হিন্দি জানা মানে অবিশ্বাস্য বিরাট সংখ্যার একটা মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারার নিশ্চয়তা!

শুধু অর্থনৈতিক দিক কেন, সামরিক দিক থেকেও ভারত পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় দেশ। তাই যতোই অর্ধেকের বেশি মানুষ উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ করুক, গরু বাঁচানোর নামে যতোই বর্বরতা হোক, জাত-পাতের নামে ভয়ঙ্কর অসভ্যতা থাকুক, আমাদের এটা মেনে নিতেই হবে ভারত একটা বিরাট পরাশক্তি। আর নানাদিক থেকে তুলণায় দুর্বল আমাদের ভারতবেষ্টিত দেশটিকে ভারতের সাথে নানা বিষয়ে মুখোমুখি হয়েই নিজের আত্মমর্যাদা অর্জন করতে হবে, আর আমাদের মনে রাখতে হবে – রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বন্ধু পাল্টানো যায়, কিন্তু প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না।

আমি এটা মানি, ভাষা সাম্রাজ্যবাদের একটা অস্ত্র, এটা দিয়ে একটা জাতি আরেকটা জাতির ওপর সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার করতেই পারে। হিন্দি ভাষার সিনেমা/টিভি চ্যনেল এর মাধ্যমে এই দেশের ওপর ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলছে দীর্ঘদিন থেকে, এবং সেটার বেশ কিছু কুফল এর মধ্যেই দেখা দিতে শুরু করেছে। এখন প্রয়োজনের ক্ষেত্রে হিন্দি না বললেই কি এই আগ্রাসন থেমে যাবে?

ইংরেজি কি সাম্রাজ্যবাদীদের ভাষা না? এটা দিয়েও কি সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েম করা যায় না? তো আমরা তাহলে এই ভাষাকে রীতিমত রাষ্ট্রীয়ভাবে শিখছি কেন? প্রশ্নগুলোর জবাব আমরা জানি। তারপরও প্রশ্ন আসে, একটা ভিন্ন ভাষা ভালোভাবে জেনেও কি নিজের সংস্কৃতি ভীষণভাবে আঁকড়ে থাকা যায় না? এই দেশেই কি এমন অনেক ব্যক্তির উদাহরণ দেয়া যায় না, যাঁরা অসাধারণ ইংরেজি জেনেও হাড়ে হাড়ে বাঙালি? আমাদের যৌক্তিকভাবেই বুঝতে পারতে হবে, ভাষা শিক্ষার সাথে সাথে সাংস্কৃতিক আধিপত্য ‘একটা নিলে আরেকটা ফ্রি’ এর মতো ব্যাপার না। খুব ভালোভাবে ভাষা শিখেও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে দূরে থাকা যায়; আর সেটা কীভাবে, তাও আরেক গুরুত্বপূর্ণ ডিসকোর্স, অবশ্য এটা এই পোস্টের চৌহদ্দির বাইরে।

ওই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারতো হয়তো, যদিও আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি ১০/১২ বছর আবশ্যিক ইংরেজি শিখে আমাদের দেশের শিক্ষিত মানুষের ইংরেজির দক্ষতা ভীষণ দুর্বল। কিন্তু ধরে নিলাম তারা ইংরেজিতেই ভালোভাবে যোগাযোগ করতে পেরেছিল, তাতে তারা যত সংখ্যক ভারতীয়ের সাথে সরাসরি (অনুবাদ ব্যতীত) যোগাযোগ করতে পারতো, তার চাইতে বেশি মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা গেল না? ভাষা নিয়ে কারো যদি কিছুটা পড়াশোনা করা থাকে তো তিনি জানেন একটা ভাষার শব্দে আর বাক্যে যা প্রকাশিত হয়, তার চাইতে অনেক বেশি কিছু প্রকাশ করে বক্তার কথার পিচ, ইনটোনেশন ইত্যাদি (এক কথায় ইনফ্লেকশন)। তাই আমরা মনে রাখবো বক্তার কথার অনুবাদ দিয়ে ‘ঠেকা’ কাজ চলে, তবে ফলাফলের দিক থেকে সেটা কখনো সরাসরি কমন ভাষায় যোগাযোগের আশেপাশেও না।

এক সময় আমরা ইংরেজি শিখেছি কারণ সেটা ছিল শক্তিমানের ভাষা। শক্তির ভারসাম্য পাল্টাচ্ছে – এই শতাব্দী হতে যাচ্ছে এশিয়ার, তাই চীনা, হিন্দি এসব অন্তর্জাতিকভাবেই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে, ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। এই লিংকে দেখুন, আমেরিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এনরোলমেন্টের সংখ্যায় যে ভাষাগুলো দীর্ঘদিন শীর্ষস্থান দখল করে ছিল, তাদের সবগুলোর নেগেটিভ গ্রোথ হয়েছে; পজিটিভ গ্রোথ হয়েছে শুধুমাত্র চীনা ভাষা ম্যান্ডারিন এর। এটা কীসের প্রমাণ সেটা বোঝা যায় ন্যূনতম কান্ডজ্ঞান দিয়েই। এখানে আমাদেরও আসার জায়গা আছে, বিশ্ববিখ্যাত ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাক্স এর বিশ্লেষণে BRICS এর পরে যে এগারোটি দেশ উন্নত দেশের কাতারে যাবে (Next 11) তার একটি দেশ আমাদের বাংলাদেশ। হ্যাঁ, অদূর ভবিষ্যতে অনেক দেশের মানুষ (স্মার্ট ভারতীয়রাও) বাংলাও শিখবে।

আজ যিনি হিন্দি শুনে বোঝেন, বলতে পারেন, তাঁর লজ্জার কিছু তো নেই ই তাঁর বরং উচিৎ গর্বিত হওয়া। এরপর তাঁর উচিৎ হবে হিন্দিতে লিখতে এবং পড়তে শিখে ভাষা জ্ঞানটাকে পূর্ণাঙ্গতা দেয়া। যাঁরা ওটা পূর্ণাঙ্গভাবে পারেন, তাঁরা সময় করে ম্যান্ডারিন শিখুন। এগুলো সব আপনার জন্য সম্পদ হয়ে থাকবে; আর ব্যক্তির সম্পদ শেষ বিচারে রাষ্ট্রেরই সম্পদ বৃদ্ধি করে। তাই আসুন, প্লিজ কারো কোন ভাষাজ্ঞানকে কটাক্ষ না করে সেটা নিজে অর্জন করার চেষ্টা করি, এবং প্রয়োজনে সেটা ব্যবহার করি।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77