ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম মিডিয়ায় খুব পরিচিত মুখ। এর আগেও যখন ডিবি তে ছিলেন, তখনও মাঝে মাঝেই ক্যামেরার সামনে এসে নানা রকম ‘চাঞ্চল্যকর’ অপরাধ নিয়ে পুলিশের কর্মকান্ডের আপডেইট দিতেন। বাস্তব জীবনে মানুষটি কেমন জানি না, কিন্তু সদা হাস্যোজ্জ্বল, আন্তরিক মানুষটিকে বিনয়ী এবং কর্তব্যপরায়ণ একজন পুলিশ অফিসার বলেই মনে হয় আমার। কিছুদিন আগেই তাঁর এক ফেইসবুক স্ট্যাটাস সব পত্রিকার খবর হয়েছিলো।

কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান নিয়ে মানুষের নানা সংশয় প্রকাশ নিয়ে জবাব দিতে গিয়ে তিনি ওই স্ট্যাটাস দেন। স্ট্যাটাসটি শুরু হয় পরিহাস দিয়ে, এভাবে – “কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানকালে সন্ত্রাসীদের গ্রেনেড নিক্ষেপে পুলিশের ৪ কর্মকর্তার মৃত্যু, আহত ৪২ কর্মকর্তা, তিন জঙ্গি গ্রেপ্তার হলেও বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে!” দুঃখিত, বন্ধু, এ রকম একটা খবর যদি আপনি আশা করে থাকেন, তাহলে আমরা আপনার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি!” এরপর ওই অভিযানের নানা দিক ব্যাখ্যা করার পর তিনি প্রকাশ করেন তাঁর ক্ষোভ-অভিমান – “আসলে পুলিশের কেউ মারা যায়নি কিংবা কেউ গুরুতর আহত হয়নি—এতেই তো আপনার যত আপত্তি তাই না, বন্ধু!” (বিস্তারিত দেখুন)

জনাব মনিরুলের পরিহাস আর ক্ষোভ এটা স্পষ্ট করেছে পুলিশের কোন অভিযানের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা কতোটা গভীর। আর এটাও এক ধরণের আশার কথা, পুলিশের সর্বোচ্চ মহল বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন আছেন। জনগণ পুলিশকে কীভাবে দেখছেন, সেটা পুলিশ বাহিনীর সর্বোচ্চ মহল জানেন, এটা ভালো, কিন্তু সেটা নিয়ে ক্ষোভ-অভিমান দেখানো খুব ইমম্যাচিওরিটির লক্ষণ, যেটা পুলিশের মতো একটা পেশাদার বাহিনীর কাছে অপ্রত্যাশিত; জনাব মনিরুলের স্ট্যাটাসের মধ্যে ভীষণভাবেই আছে এটা।

জনাব মনিরুল এর স্ট্যাটাসের বক্তব্য আমার কাছে সঠিক বলে মনে হয়নি, কিন্তু এই স্ট্যাটাস দেয়াকে একদিক থেকে প্রশংসা করাই যায় – মানুষের সাথে পুলিশ কমিউনিকেইট করতে চাইছে। রুটিন ব্রিফিং এর বাইরেও পুলিশ কর্তাদের হরহামেশাই দেখা যায় টিভি টক-শো গুলোতে অংশগ্রহণ করছেন, তাঁদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন – এটাও তাঁদের কমিউনিকেইট করার চেষ্টারই বহিঃপ্রকাশ।

এবার আসা যাক পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার প্রশ্নে। কোন সমাজে যে কারো সম্পর্কে একটা পারসেপশন, সেটা যেমনই হোক না কেন তার পেছনে একটা দীর্ঘ ইতিহাস থাকে। মানুষের সব পারসেপশন যে বাস্তবতার সাথে শতভাগ মিলে যাবে, সেটা নাও হতে পারে। কিন্তু এটা মানতে হবে দীর্ঘমেয়াদি কোন পারসেপশন পেছনে কোন না কোন বাস্তব ভিত্তি অবশ্যই আছে। তাই আমাদের দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের যে আস্থাহীনতা আছে, সেটার পেছনে অংশই বাস্তব ভিত্তি আছে। এই সমালোচনাগুলো মানুষ ‘হুদাই’ সরকারের সমালোচনার জন্য করে, এটা কেউ যদি মনে করেন, তিনি প্রচন্ড ভ্রান্তির মধ্যে আছেন।

ব্রিটিশ আর পাকিস্তান আমলের কথা বাদই দেই, এই স্বাধীন দেশে যখন থেকে আমাদের পুলিশ আমাদের সরকারের অধীনে তখন থেকেও কি পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আমরা পাচ্ছি না? আর সব সরকারি বিভাগসহ আমাদের পুলিশ কি আদৌ পাবলিক সার্ভেন্ট হয়ে উঠেছিল কোনোদিন? না; কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরা মোটাদাগে স্রেফ সরকারের পুলিশ হয়েই ছিলেন, এখনো আছেন। চাইলে অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে এই ব্যাপারে। পুলিশকে নিয়ে এর আগে একাধিক লিখায় আমি বলেছি এর দায় আদৌ এই বাহিনীর না, শতভাগ সরকারের, সেটা আরেক আলোচনা।

ফিরে আসি পুলিশ সম্পর্কে সাধারণের পারসেপশন এর কথায়। কল্যাণপুরের এই ঘটনার পর নানাভাবে নানা প্রশ্ন এসেছে অনেকের মনে। মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় এটা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে – যৌক্তিক, অযৌক্তিক পয়েন্ট এসেছে আলোচনায়। কিন্তু পুলিশ বাহিনীর এই প্রশ্নগুলোর জবাব ফরমাললি দিয়েছে, এটা আমার চোখে অন্তত পড়েনি। অথচ পুলিশ কিন্তু সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে অস্পষ্ট বিষয়গুলো স্পষ্ট করে তুলতে পারতো। কিন্তু সেটা তাঁরা করলেন না। অভিমান করেছেন তাঁরা? এতো সফল অভিযান পরিচালনা করে বাহবা পেলেও কিছু মানুষের এমন প্রশ্ন!

অতি সাম্প্রতিক একটা ঘটনায় পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তারা কী বলেছেন একটু মনে করে নেই। গুলশানের সন্ত্রাসী আক্রমণের পর আটককৃত হাসনাত-তাহমিদকে নিয়ে কী হাস্যকর পরস্পরবিরোধী কথা বলে গেছেন তাঁরা – ‘আমাদের হেফাজতে আছে’, ‘জিজ্ঞাসাবাদ করে কয়েকদিন পরেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে’, ‘তারা আমাদের নলেজে আছে’; আর সর্বশেষ জানানো হলো দুইজনকে ঢাকার দুই স্থান থেকে আটক করে আদালতে নেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে তাঁদের বাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাবুল আখতারের স্ত্রীর হত্যাকাণ্ডের পর কী কী বলেছে পুলিশ সেসব তো রীতিমত হাসির খোরাক তৈরি করেছে।

আর সর্বোপরি ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধের যে বয়ান আমাদের সামনে খাড়া করা হয় প্রতিদিন সেটা তো জাতীয় কৌতুকে পরিণত হয়েছে। দুঃখিত, আমাদের হাতে অস্ত্র নেই, কিন্তু ঘটে ন্যূনতম কিছু বুদ্ধি আছে, তাই স্কুল পড়ুয়া শিশুও জানে ওই বয়ানের মানে কী। যে পুলিশ আমাদের সামনে দিনের পর দিন এমন সব বয়ান নিয়ে হাজির হয়, তার নতুন কোন ‘সহি’ বয়ান যদি আমরা বিশ্বাস না করি, বা যাচাই করে নিতে চাই, তাহলে কি আমাদের আদৌ কোনভাবে দায়ী করা যাবে? ন্যূনতম সংবেদনশীলতা থাকলে কেউ সেটা করবে না।

গুলশান আর শোলাকিয়ায় পুলিশের অভিযান নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন আসেনি, কারণ ওই দু’টি ঘটনায় পুলিশ হতাহত হয়েছে। অবশ্য এই হতাহত হবার ঘটনারও অপব্যবহার শুরু হয়েছে। কেউ কি খেয়াল করছি, গত কয়েকদিন ধরে ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার সাথে পুলিশ/র‍্যাব এর আহত হবার খবর যুক্ত করা হচ্ছে (দেখুন)। এবার ভবিষ্যতে যদি কোন জঙ্গি আস্তানায় হামলার সময় বা জঙ্গি হামলা প্রতিরোধের সময় পুলিশ সত্যিসত্যি হতাহত হয় এবং সেটার প্রামাণ্য ছবি বা ভিডিও না দেখলে যদি আমরা সেটা বিশ্বাস না করি, তার জন্য কি আমাদের দায়ী করা যাবে?

তাত্ত্বিকভাবে ধরে নেই কাল থেকে পুলিশ বাহিনী মানুষের আস্থা ভঙ্গ করার মতো কোন কাজ করবে না, তবু তাদের ‘পূর্বপুরুষ’দের কারণে সৃষ্ট আস্থাহীনতা কি মুহূর্তেই উবে যাবে আমাদের মন থেকে? ব্যক্তিগত জীবনেও দেখেছি নষ্ট হওয়া বিশ্বাস-আস্থা পুনরুজ্জীবিত করতে দীর্ঘ সময় লাগে। পুলিশকেও এটা মেনে নিতে হবে – শুধু বাংলাদেশের সময়টা ধরলেও এটা অর্ধ শতাব্দী সময়কালে সৃষ্ট আস্থাহীনতা সহজে দূর হবার নয়। আর পুলিশ যদি এখনো আস্থা নষ্ট করার মতো কথা প্রতিনিয়ত বলে যায়, তাহলে তাদের ওপর আস্থা আসার কল্পণা করাটা স্রেফ আহাম্মকি। ছোট বেলায় শোনা মিথ্যেবাদী রাখালের গল্প কি আমরা ভুলে গেছি? কিন্তু ভীষণ হতাশ হয়ে দেখি পুলিশ এটা করছেই ক্রমাগত!

আমরা পছন্দ করি বা না করি একটা রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুলিশ থাকবেই। আর পুলিশ সেই সংস্থা যার হাতে আছে বল প্রয়োগের ক্ষমতা। তাই সরকারি আর সব সংস্থার তুলণায় পুলিশকে সাবধান হতে হবে অনেক বেশি – বেশি ক্ষমতাবনের কাছে মানুষ অনেক বেশি দায়িত্বশীলতাও আশা করে। তবে আমি কখনোই আশা করি না, আমাদের যাবতীয় সেক্টরে নানা রকম অনিয়ম থাকবে, আর পুলিশ মাঝখান থেকে অসাধারণ কর্তব্যপরায়ণ আর দুর্নীতিমুক্ত হয়ে যাবে। এটা নিয়ে আমার লিখা একটা পোষ্ট স্মরণ করছি এখানে – পুলিশের কাছে আমার প্রত্যাশা সামান্যই, কারণ…

রাতারাতি না হলেও চাই আমাদের পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে আমাদের আস্থা অর্জন করবে। আর এই আস্থা অর্জনের পথে মানুষের সমালোচনা-বিদ্রুপ-অনাস্থা এসবের সাথে মানিয়ে চলবে, ক্ষিপ্ত হবে না। তাদের মেনে নিতে হবে এসব তাদের ‘প্রাপ্য’ – এই লিখায় যেটা প্রমাণ করতে চেয়েছি আমি। পুলিশ বাহিনীর কোন সদস্য আমাকে যেন ভুল না বোঝেন, এই দেশকে আমি যেমন ওন করি পুলিশ বাহিনীকে আমি ওন করি – যে অবস্থায়ই থাকুক, এটা আমাদের পুলিশ। নানা দিক থেকেই আমাদের রাষ্ট্র আমাদের মনের মতো হয়ে ওঠেনি, তেমনি হয়ে ওঠেনি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোও। স্বপ্ন দেখি এই রাষ্ট্র তার সব সংস্থাসহ আমাদের স্বপ্নের মতো হয়ে উঠবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘জীবিত ও মৃত’ এর মূল চরিত্র কাদম্বিনীর ঘটনা আমরা জানি, যার পরিণতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে বাক্য রচনা করেন সেটা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে – ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই’। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্য হতাহত হয়েছেন এমন কোন সফল অভিযানের পর অনেকেই পুলিশের প্রতি অনাস্থা হেতু সেই বাক্যের অনুকরণে প্রকাশ্যে না হলেও মনে মনে ভাববেন, “পুলিশ মরিয়া প্রমাণ করিলো, অভিযানখানা সহি ছিল” – খুবই দুঃখজনক, কিন্তু এটাই এটাই রূঢ় বাস্তবতা। তবে আমি আশা করতে চাই আমাদের পুলিশ এই আস্থাহীনতার জায়গা থেকে উঠে আসতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77