ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

kado

“কাঁদো বাঙালি কাঁদো” বলে মানুষকে কাঁদার আহ্বান জানিয়ে আরেকটি জাতীয় শোক দিবস এলো। মানুষের কান্না শেষ হয়ে গিয়েছে বলেই কি কাঁদার জন্য উদাত্ত আহ্বান? কিন্তু কাঁদার আহ্বান, আর শোকের কথা বলাটাই কি একমাত্র কথা হবার কথা ছিল এই দিনে? আজকের শোক দিবস নিয়ে একটা অন্যরকম চিন্তা পেলাম আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সাম্প্রতিক একটা কলামে।

কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী দারুণ আওয়ামীপন্থী; তাঁর বেশিরভাগ কলাম আমার কাছে বেশ ‘একচোখা’ বলে মনে হয়। তবে ছাত্রলীগের নোংরা কর্মকান্ড, আওয়ামী সরকারের অনেক মানুষের দুর্নীতি, আর মৌলবাদীদের সাথে আপোষ এর বিরুদ্ধে তাঁকে এখনো কথা বলতে দেখা যায়। তাঁর সাম্প্রতিক একটা কলামে ১৫ আগস্ট নিয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন একজন জাতীয় নেতার মৃত্যুর ৪০ বছর পর শোক প্রকাশের শেষ হওয়া উচিৎ; হওয়া উচিত স্মরণ – যেখানে তাঁর জীবন ও কাজের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করবে সবাই। জানি সেটা হবার নয় আরো দীর্ঘকাল – শেখ মুজিবর রহমানের জীবন আর কাজ নিয়ে আলোচনা, বিশ্লেষণ করতে হলে পেটে কিছু বিদ্যা তো লাগে। সেটা কোন কালে ছিল আমাদের ‘বড়’ দুই দলের বড় থেকে শুরু করে পাতি নেতাদের? তাই কালো ব্যানারে আর তোরণে দেশ ছেয়ে ফেলে “কাঁদো বাঙালি কাঁদো” ই সই।

যারা পুরো জাতিকে শোক করার আহ্বান জানাচ্ছে, তারা কী করছে গত কয়েক বছর সেটা খেয়াল করেছি খুব মন দিয়ে। ঢাকার নানা জায়গায় প্যান্ডেল তৈরি হতে শুরু করে ১৪ আগস্ট থেকেই। আর ১৪ আগস্ট এর সন্ধ্যার পর থেকেই বিকট শব্দে লাউড স্পিকারে দেশাত্মবোধক গান, আর ৭ই মার্চের ভাষণ চলতে থাকে। প্যান্ডেলের নীচে পার্টির কিছু লোকজন দেখা যায় যেটা অনেক বেড়ে যায় ১৫ আগস্ট। খেয়াল করে দেখেছি কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্যান্ডেলের নীচে বসে দারুন আড্ডায় মগ্ন থাকে লোকজন – হাসাহাসি, ফাজলামো সব চলে দেদার। আর কয়েক বছর থেকে তো যুক্ত হয়েছে নতুন অনুষঙ্গ – শোক দিবস পালনের কর্তৃত্ব নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি আর প্যান্ডেল ভাংচুর।

প্রতি বছর ‘মাস্তি’ রত এদের দিকে তাকিয়ে ভীষণ অবাক লাগে, এই একদিনও কি ওরা একটু ‘শোকের ভান’ করতে পারে না? শোকের ভানের কথা কেন বলেছি সেই আলোচনায় পরে আসছি। অথচ এই পার্টি (আওয়ামী লীগ আর বিএনপি এক ধরণের পার্টি, এগুলোকে রাজনৈতিক দল বলে আমি মনে করি না) করে এই লোকগুলো কী না পেয়েছে। নিজ যোগ্যতায় এই বাজারে কয়েক হাজার টাকা বেতনের একটা চাকরি জোটানোর মুরোদ নেই এমন মানুষ দিব্যি গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়ে আছে। অথচ যে মানুষটার ইমেজকে সামনে খাড়া করে চলে তাদের ধুন্ধুমার ব্যবসায়, তাঁর মৃত্যুদিবসে মানুষকে কাঁদার আহ্বান জানিয়ে একদিনের জন্য শোকের প্যান্ডেলের নীচে বসার তাদের অন্তত হাসি-আমোদ থেকে দূরে থাকা উচিৎ। কিন্তু আজও ঢাকার বেশ কয়েকটা প্যান্ডেলের দিকে সময় নিয়ে, মন দিয়ে তাকিয়েছি; যথারীতি হাসি-আমোদের আড্ডা দেখেছি, রীতিমত উৎসবের আবহ। আপত্তিকর শোনালেও শিরোনামে ‘শোকের উৎসব’ ব্যবহার করেছি এই কারণেই।

ইতিহাসের নানা পর্যায়ে পেশাদার শোককারি মানুষের কথা জানা যায় (বাইবেল এ ও এর উল্লেখ আছে)। এরকম পেশাদার শোককারির অস্তিত্ব আমাদের পাশের দেশেই আছে, ভারতের রাজস্থানে। উঁচু জাতের ধনী মানুষের মৃত্যুতে তার পরিবারের মানুষরা প্রকাশ্যে শোক করে না, এতে বংশের আভিজাত্য নষ্ট হয়। উপায় হলো, নিচুজাতের কিছু নারীকে ভাড়া করে আনা, যারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে উঁচু স্বরে কেঁদে শোক প্রকাশ করবে। হ্যাঁ, এরাই ‘রুদালী’ বলে পরিচিত (এদেরকে নিয়ে সদ্যপ্রয়াত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর এই নামে একটা উপন্যাসও আছে, যেটাকে ভিত্তি করে একটা সিনেমাও তৈরি হয়েছিল)।

রুদালিরা পেটের দায়ে শোকের ভান করে, কাঁদে। শোক দিবসের প্যান্ডেলের নীচের মানুষগুলোর পেটের দায় নেই, আরো বড় দায় তো আছে, বেশুমার টাকা বানানোর দায়। সেই দায়ে তো অন্তত তাদের শোকের ভান করে উচিৎ – না, আমি তাদেরকে একেবারে বিলাপ করে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে কাঁদার ভান করতে বলছি না, জাস্ট একটু আনন্দ করা থেকে দূরে থাকা। জানি, ওই ভান না করেই তো টাকা বানানো যাচ্ছে, তো কেন সেই ভান করতে হবে? ওদের ‘মাস্তি’টা আমাদের চোখে লাগে যে বড়।

সবচাইতে ভালো হয় গাফফার চৌধুরী’র পরামর্শ গ্রহণ করলে – শোক দিবস না, এদিন হবে মুজিব স্মরণ দিবস। এদিন সবাই এই মানুষটির জীবনের নানাদিক নিয়ে আলোচনা করবেন, বিতর্ক করবেন, নানা দিক থেকে তাঁর কর্মকান্ডের বিশ্লেষণ হবে। এভাবেই তাঁকে আমরা স্মরণ করবো, ভালোবাসা জানাবো। এরকম একটা চিন্তা থেকেই চার বছর আগে এই দিনে একটা ব্লগ লিখেছিলাম, সেটা স্মরণ করছি আজ – ‘দেবতা মুজিব’কে ‘হত্যা’ করার শপথ হোক আজ!!

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77