ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আজকের খবরে সন্তানের দেয়া আগুনে পিতার মৃত্যু দেখে আমাদের অনেকে খুব অবাক হচ্ছেন দেখে আমিই খুব অবাক হচ্ছি। আমি তো পাল্টা প্রশ্নই করতে চাই তাদেরকে – অবাক হবার কী আছে, এমনই কি হবার কথা ছিল না? যে বীজ আমরা বপন করে যাচ্ছি দীর্ঘদিন থেকে, সেটার ফসল তুলে নিতে হবে না?

ঘটনাটা ঘটেছিল কয়েকদিন আগে – এ বছর এসএসসি পাশ করা এক কিশোর তার বাবার কাছে একটা নতুন ব্র্যান্ডের মোটর সাইকেল চেয়েছিল, বাবা রাজি না হওয়াতে ঘরের মধ্যে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় সে – ভীষণভাবে দগ্ধ হন বাবা, মাও হন কিছুটা, এবং কিছুটা সে নিজেও। আর আজকের খবরে জানা গেল মারা গেছেন ওই কিশোরের বাবা।

আমাদের চোখে পড়ে না হয়তো, বা কোন কিছু চোখে পড়ার মতো দুই দন্ড ধরে দেখার সময় আমাদের নেই তাই আমরা দেখি না – গত ২০ বছরেই আমাদের সমাজ কি অবিশ্বাস্যভাবে পাল্টে গেছে! এমন একটা সমাজ আমরা গড়ে তুলেছি যেখানে ভোগবাদই শেষ কথা। কে কতো বেশী, কতো দামী জিনিষ ভোগ করার সক্ষমতা তৈরি করতে পারছে সেটাই হয়ে উঠছে সমাজে একজনের সম্মান-মর্যাদার একমাত্র (হ্যাঁ একমাত্র, মূল নয়) মাপকাঠি।

খেয়াল করলে দেখবো এই বিশ বছরের মধ্যে দু’টো গুরুত্বপূর্ন মিডিয়া আমাদের দেশে ঢুকেছে – ক্যাবল টিভি, আর ইন্টারনেট। এসবের মাধ্যমে এক লহমায় আমাদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়লো পুরো পৃথিবী। আমরা দেখতে থাকলাম কী অবিশ্বাস্য সব ভোগের বস্তু আমাদের চারপাশে। মানুষের মধ্যে যখন ভোগের তৃষ্ণা তৈরি হলো তখন সেই চাহিদা ভোগ্যপণ্যের যোগানও তৈরি করে দিলো। আমাদের সামনে আমাদের দেশে এখন পাওয়া যায় নিজের দেশে তৈরি এবং আমদানী করা অসংখ্য পণ্য। দরকার শুধু বেশুমার টাকা – সবকিছু আমার হাতের মুঠোয় থাকবে।

দারুণ সব প্রতিভা অসাধারণ সব বিপণন কৌশলে আমাদের প্রতিনিয়ত জানিয়ে যায় পণ্য থাকা মানেই যোগ্যতা, পণ্য থাকা মানেই আপনি অন্যদের চাইতে আলাদা, পণ্য না থাকা মানেই আপনি অন্যদের চাইতে পিছিয়ে, আপনার পণ্য কেনার ক্ষমতা আছে মানেই হলো আপনি অনেক যোগ্য। শুধু কী তাই? কেউ কেউ তো বলতে চায় যত বেশি পণ্য কেনা যায়, ততবেশী সুখও পাওয়া যায়। আমাদের দেশের এক বিখ্যাত ফাইন্যান্সিং কোম্পানি তো এক দারুন চাতুর্যপূর্ণ (কিন্তু ডাহা মিথ্যা) কথা বানিয়েছে – Financing happiness.

টাকা দিয়ে কি সুখ কেনা যায়? নাকি কেবল আনন্দ? সুখ আর আনন্দ কি একই বস্তু? নাকি আলাদা? এসব খুব গুরুত্বপূর্ণ ডিসকোর্স – সেটা নিয়ে আলোচনা করবো আরেক দিন। কিন্তু ওই কোম্পানীর মতো আরও অনেক কর্পোরেট আমাদের সমাজের সব মানুষের মাথায় এটা খুব ভালোভাবে ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে যে, অঢেল টাকা থাকলে সীমাহীন ভোগ করে যায়। আর সীমাহীন ভোগ আমাদের যোগ্যতা প্রমাণ করবে আমাদের সমাজের আর দশজনের সামনে – আর যারা এই ভোগ করতে পারছে না, আমাদের প্রতি তাদের ঈর্ষার দৃষ্টি আমাদেরকে ‘সুখী’ করে তুলবে।

সমাজে যখন এই হয় যোগ্যতার মাপকাঠি, তখন সবাই চায় যে কোন মূল্যে অনেক বেশি পণ্য কেনার সক্ষমতা অর্জন করা। তাইতো টাকাটা কোথা থেকে আসছে সেটা আদৌ আর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে আসে না। খেয়াল করলে দেখবো, সরকারি চাকুরীতে ঢুকে কয়েক বছর না যেতেই বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়ানো মানুষটার প্রতি আমাদের ঘৃণা নেই, বরং একধরণের ঈর্ষা আছে, আমার ওই সুযোগ নেই বলে। বিয়ের বাজারে এমন পত্রের রমরমা। মনে পড়ে গেল, আমি আমার বাবার কাছে শুনেছি কয়েক দশক আগেই কন্যার বিয়ের পাত্র খোঁজার সময় এটা দেখা হতো পাত্র বা পত্রের পরিবার হঠাৎ করে ধনী হয়েছে কিনা, সেটা মানে কোন গড়বড় থাকতে পারে, এমন ক্ষেত্রে পিছিয়ে আসতো অনেকেই।

এখন ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা এর স্বপ্ন থাকে যেভাবেই হোক সন্তানকে অনেক টাকা উপার্জনের মেশিন বানাবেন। তাদের বাইরের বই পড়া বন্ধ, মাঠে দৌড়ঝাঁপ করে খেলার সুযোগ তো নেই ই। আমার অনুমান পর্যাপ্ত মাঠ থাকলে বাচ্চাদের খেলতে পাঠাতেন না বেশিরভাগ বাবা-মা সময় ‘নষ্ট’ হবে বলে। এই শিশুগুলো বাসায় এসব শুনছে, মিডিয়ায় দেখছে তাই তার জীবনে চরম ভোগবাদ বাসা বাঁধবেই।

যে কিশোরটি বাবা-মা এর গায়ে আগুন লাগিয়ে দিলো সে দেখছে তার বর্তমান বাইকটি তার বন্ধুদের কাছে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছে, মেয়েরাও তার প্রতি হয়তো বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। সে দেখেছে তার কোন বন্ধু যে পড়াশোনায় ভালো, বা যে ভালো গান গাইতে পারে, ছবি আঁকতে পারে তার চাইতে তার মর্যাদা বেশি। এমনকি অন্যভাবে যোগ্য বন্ধুরাও তাকে তোয়াজ করে। তাই তার এটা ভাবা খুবই স্বাভাবিক যে, আরো ভালো-দামী কোন মডেলের বাইক থাকলে তার মর্যাদা আরো বাড়বে।

এই কিশোরের মতো প্রায় সব কিশোরই ছোটবেলা থেকে এটা দেখে বড় হয়, তার পরিবার টাকা উপার্জনকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করে। তাদের পরিবারের দৃষ্টিতে সেই মানুষ ততো বেশী সফল যার অনেক ভোগ করার ক্ষমতা আছে। আর সমাজ, রাষ্ট্র তো তাদেরকে এসব চিন্তা দিচ্ছেই প্রতিনিয়ত। সাথে আছে মাদকাসক্তি; এটা নিয়েও লিখতে হবে আলাদাভাবে।

আমাদের রাষ্ট্র ক্রমাগত উন্নয়নের ঢোল পিটিয়ে যায় ব্রিজ, বিদ্যুৎকেন্দ্র আর ফ্লাইওভার দেখিয়ে। উঁচু নৈতিকতার প্রমান লাগে যেসব ক্ষেত্রে যেমন সুশাসন, দুর্নীতি থেকে মুক্ত হওয়া এসবের কোন মূল্য নেই রাষ্ট্রের কাছে; এসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন মনে উন্নয়ন না। বরং এই সব কিশোররা দেখছে কোনোভাবে ক্ষমতাসীন দলের ছোটখাটো পর্যায়ে যেতে পারলেই হলো, বেশুমার টাকা, আর ক্ষমতার মূল বলয়ের আশেপাশে যেতে পারলে তো আর কথাই নেই।

আমরা কি দেখছি না, শৈশব থেকেই তাদের মনে কী বীজ রোপণ করছি আমরা? সেই বীজের ফল এমন হবে না তো কেমন হবে? আর এতেই শেষ হবে এরকম ঘটনা? অবশ্যই না। আরও ভয়ঙ্কর রূপে আমাদের ফসল আসবে আমাদের সামনে।

শেষ করছি কবীর সুমনের গানের একটা অংশ দিয়ে – টাকাটাই শেষ কথা, বাঁকি সব বাতুলতা; টাকা কথা রাখে।

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77