ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

সিনেমা দেখতে হলে গেলে সবসময় চারপাশে কান খাড়া করে রাখি। এটা এজন্য নয় যে মূলত একান্ত সময় কাটানোর জন্য সিনেমা হলে ঢোকা তরুণ-তরুণীদের ‘গোপন’ আলাপ শুনতে চাই, বরং এটা এজন্য যে নিজে সিনেমা বানাতে চাই, তাই কোন বিষয় দর্শকরা কীভাবে নিচ্ছে সেটা বুঝে ওঠা আমার জন্য জরুরি। আমার বিবেচনায় আমাদের সিনেমার বানানোর সাথে জড়িত মানুষদের অনেকেরই এটার ঘাটতি আছে – দর্শকের মন বুঝতে চাই না আমরা। তো আয়নাবাজি দেখতে গিয়েও সিনেমা দেখার সময়টা কান খাড়া করে ছিলাম; কান খাড়া করে ছিলাম যখন সিনেমা শেষ হবার পর জনস্রোতের সাথে ধীরে ধীরে বেরোচ্ছিলাম। কী শুনেছি, সেই প্রসঙ্গে আসবো এই পোস্টের শেষের দিকে।
aynabaji-01

একটা প্রচণ্ড হাইপ তৈরি করা হয়েছে আয়নাবাজির মুক্তির আগে – একটা বিখ্যাত বিজ্ঞাপণ নির্মাণ সংস্থা আর সাথে অতি বিখ্যাত একজন বিজ্ঞাপণ নির্মাতার যুগলবন্দির কাছে প্রত্যাশিতই ছিল এটা। এই হাইপ আসলে একটা শাঁখের করাত – না হলে মানুষ সিনেমা হলে যাবে না; আবার হাইপ মানুষের প্রত্যাশার পারদ নিয়ে যায় অনেক উঁচুতে, তাই অনেকেই সিনেমা দেখে ফিরবে অসন্তুষ্টি নিয়ে। মূল আলোচনার আগে বলে নিতে চাই, এই “প্রচারেই প্রসার” এর যুগে আয়নাবাজি সিনেমার বিপণন কৌশল (‘বাঙালী মুসলমান এর ডিরেক্টর’ জনিত বিতর্ক সহ) ভবিষ্যত প্রযোজকদের পাথেয় হয়ে থাকা উচিৎ।

আয়নাবাজি অবশ্যই বাংলা সিনেমা, কিন্তু “বাংলা সিনেমা” বললেই যে একটা প্রপঞ্চ আমাদের মানসপটে খাড়া হয় আয়নাবাজি কোনোভাবেই সেটা নয় বলেই আয়নাবাজিকে কিছু ডিসকার্সিভ ব্যবচ্ছেদ এর মধ্য দিয়ে যেতেই হচ্ছে। সিনেমাটা দেখার আগে বেশকিছু সংক্ষিপ্ত ফেইসবুক স্ট্যাটাসে এই চর্চা চোখে পড়ছে বেশ। ওসব স্ট্যাটাস দেখতে দেখতে কানে বেজে উঠলো বেশ কিছুদিন আগে এক আড্ডায় এক পরিচিত জনের উক্তি – “এইটা ডিসকোর্স এর জামানা ভাই”।

একজন দুর্দান্ত অভিনেতা আয়নাকে তার মাকে বাঁচানোর টাকার সংস্থান করতে হয় ভিন্ন একজন মানুষ সেজে জেলে গিয়ে। বিষয়টা বাংলা সিনেমার জন্য টিপিক্যাল, অমিতাভ রেজার কাছ থেকে অবশ্য অপ্রত্যাশিত – জানি, উনি জেনেশুনেই অপরাধীর অপরাধের একরকম ‘মানবিক’ ব্যাখ্যা আমাদের সামনে আনেন, কারণ এটা দর্শকরা ‘খায়’ ভালো, কিন্তু দর্শকদের এই মনোজগৎ তো পাল্টানো দরকার – একজন ‘অমানবিক’ অপরাধীর জীবনও হতে পারে সিনেমার দারুণ গল্প। যাক এরপর আয়না দীর্ঘ সময় আটকে পড়ে জেলে আর বেরিয়ে এসে দেখে মা মৃত। এই শোক তাকে তাড়া করে ফেরে, আর সেটা থেকে ক্রমাগত পালানোর চেষ্টা তাকে প্রলুব্ধ করে একের পর এক ভীন্ন মানুষ হয়ে ‘বাস্তব জগতে’ অভিনয় করে যেতে। সাথে আছে অভিনয়ের প্রতি তার তীব্র আবেগ।

নানা রকম সংকটে জেরবার বর্তমান সময়ের মানুষ কি এভাবেই প্রতিদিন বাস্তব জীবনে অভিনয় করে? পালাতে চায়, ভুলে থাকতে চায় সংকটকে? আর সাথে যুক্ত হয় অনেক বৈষয়িক অর্জনের এজেন্ডা, যেটা এই ম্যাটিরিয়ালস্টিক সমাজের মূল চালিকাশক্তি। সিনেমার সাথে সরাসরি যুক্ত না হলেও একটা ঘটনা এখানে কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক – এই সিনেমার মুক্তি উপলক্ষ্যে অমিতাভ এর পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার সময় ফেইসবুকে ঘুরে বেড়ানো অমিতাভ এর একটা ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, তিনি কোন আবেগ-চেতনা বিযুক্ত হয়ে, সবকিছুর উর্দ্ধে উঠে টাকার জয়গান গাইছেন। এখানে অমিতাভ অকপট – কোন ভণিতা নেই, মুখোশ নেই, অভিনয় নেই। কিন্তু এই বক্তব্য আমাদের বেশিরভাগেরই প্রাণের বক্তব্য হলেও এতে আমাদের অনেকের একটা মুখোশ লাগে, অভিনয় করতে হয় এখনও। এজন্যই আমাদের অনেকেরই ভেতরে এক এক জন আয়না বাস করে হয়তো।

আয়নার কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে আমরা দেখে যাই এই রাষ্ট্রে টাকার ক্ষমতা। অন্যের হয়ে স্বেচ্ছায় জেল খাটা কিংবা ক্ষমতাসীনদের প্রভাবে একজনের জায়গায় জোর করে অন্যজনকে আসামী করে সাজা দেয়া – এসব খবর আমাদের দেশে সবসময় চাপা থাকেনি। সিনেমায় আমরা দেখি প্রিজন ভ্যানে করে আসামী নেয়ার সময় মানুষ বদল করার জন্য ম্যানেজ করা যায় পুলিশকে, আমরা এটাও দেখি যে কোন নোংরা কৌশলেও মক্কেলের স্বার্থ রক্ষা করার মতো উকিলও আছে অনেক। আমরা এটাও শুনি “আয়নাদেরই ফাঁসি হয়”। এসব দেখে আর্লি টিন বয়সের কারো মনে বেজে উঠতে পারে কবীর সুমনের গানের লাইন “প্রথম জানা পয়সা দিয়ে সবই কেনা যায়”।

সিনেমার পুরো গল্পটা বলে ফেলা সঠিক বলে মনে করছি না; দর্শকদের মধ্যে এই চমকটা থাকুক। এই কারণে সিনেমার অনেক দিক নিয়ে (বিশেষতঃ চিত্রনাট্য) বিস্তারিত বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। তবে চিত্রনাট্য নিয়ে এটুকু বলি, চিত্রনাট্যের কিছু দিক আমার কাছে দুর্বল মনে হয়েছে। নারী চরিত্রে নাবিলার চরিত্র খুব কম বিকশিত হয়েছে বলেই আমার মনে হয়। আসলে আয়না ব্যতীত আর কোন চরিত্র এবং কোন সাব-প্লটই খুব একটা বিকশিত হয়নি, কিংবা ইচ্ছে করে হতে দেয়া হয়নি। এর একটা অনিবার্য ফল হয়েছে সেটা নিয়ে শেষে কথা বলছি।

সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফি চমৎকার হয়েছে; চমৎকার কাজ করেছেন রাশেদ জামান। তবে অনেকের কাছে খুব ভালো লাগলেও আমার কাছে বেশিরভাগ ড্রোন শট অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু এটা মানি, এই ড্রোন শটগুলোর মতো আরও কিছু শট, যেগুলোকে আমার কাছে স্রেফ গিমিক বলে মনে হয়েছে, সেগুলো এরকম একটা সিনেমার দর্শকদের জন্য দরকারও ছিল। চারদিকের নানা সিনেমা দেখে চোখ ধাঁধিয়ে ফেলা দর্শকরা পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা দেখতে এসে চোখ ধাঁধাবে না, এটা মেনে নেবেন না নিশ্চয়ই।

কয়েকটি চরিত্রের ভেতরে ঢুকে চঞ্চল চৌধুরী দারুণ অভিনয় করেছেন। পার্থর অভিনয় আমার কাছে মাঝে মাঝেই মেলোড্রামাটিক বলে মনে হয়েছে। নাবিলা মোটামুটি উৎরেছেন। গাউসুল আজম শাওন, জর্জ এঁরা চমৎকার করেছেন। আর হলিউড স্টুডিও’র শিশু কর্মচারীটির অতি ইঁচড়ে পাকা এটিটিউড ভালো লাগেনি আমার। এটা এক পুরোনো ভুত এফডিসি কেন্দ্রীক বাংলা সিনেমার – শিশুদের মুখে অতি ইঁচড়ে পাকা ডায়লগ দেয়া। কিন্তু এই ভুত একইভাবে না হলেও ভীন্নভাবে ‘আছর’ করেছে এই সিনেমার ওপরও। সাউন্ড এর ক্ষেত্রে বেশ কিছু জায়গায় বেশ কিছুটা আরোপিত মনে হয়েছে, তবে অডিও স্পেইস তৈরি করতে পেরেছেন সাফল্যের সঙ্গেই। গানগুলো ভালো লেগেছে।

অতি আলোচিত চুমু’র সিন স্রেফ একটা হাইপ তৈরির কৌশল ছাড়া আর কিছুই না – বাংলা সিনেমায় একটা ‘ফ্রেঞ্চ কিস’ এর দৃশ্য দেখবেন বলে যারা অপেক্ষা করছেন তারা হতাশ হবেন। পুরো সিনেমায় তেমন কোন কিছু পেলাম না যেটাকে বহুল আলোচিত “বাঙালী মুসলমান” প্রপঞ্চ এর সাথে মেলানো যায় – এটাও একটা ক্যাম্পেইন টুল ছিল। একইভাবে পর্দায় আরেফিন শুভর উপস্থিতিও এক ধরণের চমক সৃষ্টির চেষ্টাই। মূল ন্যারেটিভ আদৌ দরকার না থাকলেও এটাও কিছু দর্শককে মুহূর্তের উত্তেজনা দিতে পারে।

স্তম্ভিত হয়েছি দেখে যে পার্থর মদ খাওয়ার দৃশ্য অসংখ্যবার আছে, কিন্তু একবারও এটা নিয়ে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ নেই! আমাদের সেন্সর এটা এভাবে ছাড়লো কীভাবে! আর কোথাও এটা কল্পণাও করা যায়!

সিনেমাটির যেখানে এন্ড টাইটেল উঠতে শুরু করে সেখানে শেষ করে দিলেই আমার কাছে ভালো মনে হতো। অমিতাভের কাছেও সম্ভবত তাই। তাই এখানে এন্ড টাইটেল শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত অংশকে ডিরেক্টর’স কাট বলাই যায়। কারণ এর পরের অংশগুলো দেখানো হয়েছিল এন্ড টাইটেল এর মাঝে মাঝে। বোঝাই যায়, যারা দীর্ঘকাল সিনেমায় “দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন” এবং “অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো” মনস্তত্ব লালন করেন, তাদেরও আঘাত দিতে চাননি তিনি, খুশি করেছেন তাদেরও। পুরো সিনেমায় নানা টুল ব্যবহার করার চেষ্টা দেখি আমরা; যেমন ন্যারেটিভ এর সাথে অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিকভাবেই মার্ক্স এর দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কথা নিয়ে আসা, নারীর নিতম্বের ক্লোজআপ শট, কুঁচকিতে হাত দেয়ার ব্যাখ্যার ডায়লগ। যৌক্তিকভাবেই অনুমান করা যায় এসব দিয়ে অমিতাভ চেষ্টা করেছেন তাঁর টার্গেট দর্শকের রেঞ্জটা যতদূর সম্ভব বাড়াতে।

শুরুর কথায় ফিরে আসি, দর্শকরা সিনেমা দেখার সময়, এবং পরেও শুধু চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়ের প্রতি তাদের অতি মুগ্ধতার কথা বলছিলেন। যারা কাল আমার সাথে বসুন্ধরার স্টার সিনেপ্লেক্স এ সিনেমা দেখেছেন, তারা অমিতাভকে খুব ভালো করে চেনেন। খুব মনযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করেও কাউকে বলতে শুনলাম না, অমিতাভ একটা দারুণ সিনেমা বানিয়েছেন। ফেইসবুকও মূলত চঞ্চলময়। চিত্রনাট্যের ক্ষেত্রেও লিখেছিলাম গল্পের ট্রিটমেন্টের কারণে (অন্য চরিত্র এবং সাবপ্লটকে যথেষ্ট বিকশিত হতে না দেয়া) সিনেমাটা আক্ষরিক অর্থেই “আয়নাবাজি”ই হয়ে গেছে। এখানে একটা চরিত্র সবদিক থেকেই ছাপিয়ে গেছে সিনেমার ন্যারেটিভকে; এমনকি পরিচালককেও। আয়নার অভিনয়ের চমক দেখতে দেখতে আমাদের অনেকেই হয়তো এটাও ভুলে যাই, আয়না কিন্তু জেনেশুনে ভয়ঙ্কর একটা অপরাধের অংশ।

এই সিনেমার ডিরেক্টর অমিতাভ রেজা বলে, আর এর দর্শকদের মধ্যে অনেক বড় অংশ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বলে এই সিনেমা কতোটা শিল্প হয়েছে, আর কতোটা পণ্য, সেই বাহাসও দেখেছি ফেইসবুকে। শিল্প কি নিজেই একটা পণ্য নয়? শিল্পের সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে কে? যে মানদণ্ডে শিল্পের বিচার হবে সেটা বানাবে কে? সেই মানদণ্ড কি মানতেই হবে? না মানলে কি আর সেটা শিল্প হবে না? এটা আরেক গুরুত্বপূর্ণ ডিসকোর্স, আজ থাকুক; ফ্রেঞ্চ ফিলসফার “Pierre Bourdieu” এর “Distinction: A Social Critique of the Judgment of Taste” এর আলোকে সেই আলোচনা করবো আরেকদিন। অমিতাভ এই বাহাসে কিছু বলেছেন কিনা জানি না, তবে এটুকু বলতে চাই, তিনি দারুণ নিষ্ঠা নিয়ে দর্শককে হলে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। সিনেমার নানা দিক বিবেচনা করে এটা নিরাপদেই বলা যায়, ব্যবসা করা মানুষরা চেয়েছেন একটা ব্যবসাসফল সিনেমা বানাতে। বাংলা সিনেমার এই অকালে ব্যবসাটাও খুব জরুরী।

সব শিল্পের মতো সিনেমার সমালোচনাও খুব সাবজেক্টিভ একটা বিষয়। এতোক্ষণ যা লিখলাম, সেটা আমার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, দ্বিমত থাকতেই পারে যে কারো। তবে এটুকু বলতে পারি, সব ক্ষেত্রেই আয়নাবাজির টিম পরিশ্রম করেছেন, চেষ্টা করেছেন এমন একটা সিনেমা বানাতে যেটা মানুষ গাঁটের পয়সা খরচ করে, জ্যামে গলদঘর্ম হয়ে হলে দেখতে যাবে। অগ্রিম টিকেট না কেটে সিনেমা দখতে না পারা, টিকেটের কালোবাজারি এসব এসব প্রমাণ করে তাঁরা কতটা সফল হয়েছেন।

fullsizephoto354974

পুনশ্চ: দীর্ঘ লিখাটি যারা মন দিয়ে পড়েছেন, তারা হয়তো খেয়াল করেছেন লিখাটি একটা সময় এর পর থেকে কিছুটা খেই হারিয়েছে। আসলে ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটা খবর দেখার পর থেকে এটা হয়েছে। আয়নাবাজির সাথে কোরিয়ান সিনেমা “Tumbleweed” এর মূল কনসেপ্ট এর সাথে বেশ মিল আছে (পড়ুন – প্লট – ১, প্লট – ২)। বিষয়টা আমার কাছে ঠিক “Great people think alike” বলে মনে হয়নি।

 

 

Facebook: https://www.facebook.com/zahed.urrahman.77