ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

শুরুতেই আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি বন্যার্ত মানুষদের কাছে। গত বেশ কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বড় বন্যায় দেশের খুব বড় একটা এলাকা তলিয়ে গেছে। বৈষয়িক ক্ষতি তো আছেই, সাথে ক্ষতি হয়েছে প্রাণেরও; অনেক মানুষ মারাও গেছে। এই সময়ে আমাদের সবার উচিৎ বন্যার্ত মানুষের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছানো এবং বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসনে সরকারকে দ্রুত বাধ্যকরণে চাপ জারি রাখার জন্য লিখে যাওয়া। এই ব্লগের অনেকেই সেটা করছেন; তাঁদের ধন্যবাদ। বন্যার্ত মানুষের প্রতি সর্বোচ্চ সহমর্মিতা রেখে, তাঁদের কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করে আমি অন্য আরেকটা বিষয় নিয়ে আবার লিখতে যাচ্ছি; এই একই বিষয়ে কিছুদিন আগেও আমি লিখেছিলাম – ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়, থলের বাইরের বিড়াল আর নাউরু-সামোয়ার কথা

প্রশ্ন আসতেই পারে কিছুদিন আগে যে বিষয় নিয়ে মোটামুটি দীর্ঘ একটা ব্লগ লিখেছি, সেই বিষয়ে আজ আবার লিখছি কেন? আমি মনে করি এই সংশোধনী বাতিল করার রায়ের প্রভাব আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে কত বড় পদক্ষেপ সেটা আমরা অনেকেই বুঝতে পারছি না। তাই এটাও আমরা অনেকেই কল্পনা করতে পারছি না, এই রায়ের পরে সরকারের নানা পর্যায়, এমনকি সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যে অবিশ্বাস্য প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট, বিশেষ করে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে, সেটা আমাদের রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশে এক বিরাট ঝুঁকি তৈরি করছে। এই সময় রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের পক্ষে থাকা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কর্তব্য। আজ আবার বিষয়টি নিয়ে লিখার কারণ এটাই।

পরবর্তী আলোচনায় যাবার আগে ষোড়শ সংশোধনীর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর চারদিকে ভেসে বেড়ানো কিছু উক্তিতে চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক –

* প্রধান বিচারপতি পাকিস্তানের দালাল

* প্রধান বিচারপতি ‘ধৃষ্টতা’ দেখিয়েছেন।

* এ রায় আবেগ ও বিদ্বেষতাড়িত।

* মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করে বেশি দিন এই মসনদে থাকতে পারবেন না।

* বিচারপতিরা ইমম্যাচিউরড।

* আদালতের হাত এত বড় লম্বা হয়নি যে, সংসদ ছুঁতে পারে।

* প্রধান বিচারপতি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন।

* প্রধান বিচারপতি হিন্দু নন।

* এটা পেনড্রাইভ জাজমেন্ট। কোন পেনড্রাইভ থেকে এবং কোন ল্যাপটপ থেকে এ রায়ের উৎপত্তি হয়েছে সেটা আমাদের জানা আছে। রায়ের ড্রাফট লিখেছেন একটি ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক।

* ফাইজলামির একটা সীমা আছে।

* দেশ স্বাধীন না হলে তোমার মতো ছিঁচকে উকিল এই দেশের চিফ জাস্টিস হতে পারত না।

* ২৪ আগস্ট এর মধ্যে রায় বাতিল না করলে অক্টোবর থেকে প্রধান বিচারপতির অপসারণের দাবিতে আন্দোলন।

* উনি মাত্র ২৪ দিন সময়ের মধ্যে ৪০০পৃষ্ঠার কথা লিখেছেন, এটা ইমপসিবল, এটা হতে পারে না। এটা তার লেখা রায় মোটেও নয়।

* তুমি শুধু প্রধান বিচারপতির পদ ছাড়বা না, এই দেশ ছাড়তে হবে।

* প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে নিতে চান। এসব ফাইজলামির একটা সীমা আছে।

না, এসব ‘অমিয়বাণী’ মোটেও কোনো ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী বখাটের নয়, এসব ‘অমিয়বাণী’ বর্ষণ করেছেন সরকারি দলের সাংসদ, মন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, এমনকি একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি। এসব কথাকে কেউ কেউ এক ধরণের রাজনৈতিক মেঠো বক্তৃতা বলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এরপর গত ২১শে আগস্টের আলোচনা সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা যা বলেছেন বিচার বিভাগ এবং মাননীয় প্রধান বিচারপতি সম্বন্ধে তাতে এটা স্পষ্ট সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাথায় রেখে নানা পর্যায় থেকে এসব কথা বলা হয়েছে। কী বলেছেন প্রধানমন্ত্রী, তার কিছুটা দেখে নেয়া যাক (বিস্তারিত পড়ুন):

* অনেক অবান্তর কথা এবং স্ববিরোধী বক্তব্য’ রয়েছে ওই রায়ে।

* পাকিস্তানের সাথে তুলনা করা… সব সহ্য করা যায়, কিন্তু পাকিস্তানের সাথে তুলনা করলে… এটা আমরা কিছুতেই সহ্য করব না। পাকিস্তান রায় দিলো দেখে কেউ ধমক দেবে…

* আজকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে কেন তুলনা করবে? আর, ওই হুমকি আমাকে দিয়ে লাভ নাই।

* ওই রাষ্ট্রপতি দ্বারা নির্বাচিত হয়ে, ওই চেয়ারে বসে নিজের নিয়োগের কথা ভুলে গেলেন?… এই কথাগুলো বলার আগে উনার (প্রধান বিচারপতি) ওই পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত ছিল।

* রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও হাতিয়ে নিয়ে যাওয়া… এটা কোন ধরনের দাবি।

* সময় থাকতে শুধরে যান। এই দেশে দাঁড়িয়ে বড় কথা বলা… এই দেশের মানুষ গ্রহণ করবে না।

আমরা জানি, ‘আদালত অবমাননা’ বলে এক বস্তু আছে আমাদের আইনে, যেটার অধীনে অনেক মামলা হয়েছে, এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমটো)  রুল জারি করে অনেককে শাস্তি দিয়েছে বা ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছে। হালে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হচ্ছে, তার তুলনায় একেবারেই নস্যি সব অভিযোগে আগে বহুবার এটা করা হয়েছিলো। আগ্রহীরা এই দুইটি কলাম পড়ে দেখতে পারেন – ১. মিনিটে একটি আগাম জামিন কীভাবে? ২. ছয় থেকে আট সপ্তাহের স্বাধীনতা। এই কলামগুলোর জন্য প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খানকে আদালত অবমাননার জন্য আদালতে ডেকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল, এবং গুরুদন্ড এড়ানোর জন্য তাঁকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়।

কিন্তু প্রধান বিচারপতি এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালত নিয়ে যাচ্ছেতাই অবমাননাকর মন্তব্য করার পরও এদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা কি একেবারে জরুরি হয়ে পড়েনি? এক মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি এটর্নি জেনারেলকে জানিয়েছেন তাঁরা ‘ধৈর্য ধরছেন’। মাননীয় বিচারপতিগণকে বলতে চাই এসব মানুষকে আদালত অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত না করে, তাঁদের এই ধৈর্য ধরা ভবিষ্যতের জন্য এক খুব খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

শুরুর দিকে সরকার চেষ্টা করেছিলো চাপ দিয়ে প্রধান বিচারপতির রায়ের পর্যবেক্ষনগুলো যেন তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক্সপাঞ্জ করেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি দৃশ্যত তাতে সাড়া দেননি, তাই সংকটটা এখন এমন পর্যায়ে গেছে, সরকার প্রধান বিচারপতিকে যে কোনো মূল্যে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছে। এর পদক্ষেপ হিসাবে অবিশ্বাস্য সব নজির স্থাপন করা হয়েছে, যা কোনো বিচারের একটা পক্ষের জন্য স্রেফ অকল্পণীয়। সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক প্রধান বিচারপতির সাথে দেখা করে তাঁদের ক্ষোভ-উষ্মা জানিয়েছেন। প্রধান বিচারপতির সাথে খাস কামরায় ঢুকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আলোচনা করেছেন। এমনকি করণীয় ঠিক করতে গণভবনে রাষ্ট্রপতির (যিনি কোনোভাবেই দলীয় ব্যক্তি নন) সাথে প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ অন্য প্রভাবশালী মন্ত্রী, এবং এটর্নি জেনারেলের বৈঠক হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৭ দ্বারা প্রধান বিচারপতিকে অপসারণ করার কথা হয়েছে। কিছুদিন আগে তো প্রধানমন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে পরোক্ষভাবে পদত্যাগ করার কথাই বলেছেন।

সর্বশেষ এখন শোনা যাচ্ছে প্রধান বিচারপতির অসদাচরণ, দুর্নীতি ইত্যাদি দিয়ে তাঁকে পদচ্যুত করা হবে। একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত বন্ধ করার জন্য চিঠি দিয়ে তিনি অসদাচরণ করেছেন কিনা, সেটা খুঁজে দেখা হচ্ছে। সাথে এনবিআর কে দিয়ে খুঁজে দেখা হচ্ছে তাঁর আয়-ব্যয়ের হিসাব। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা সঠিকভাবে আয়কর না দেবার অভিযোগ সত্যি, তাহলে এসব অভিযোগে জন্য তাঁকে আগে পদচ্যুত করা হলো না কেন? কেন এখন এসব কথা বলা হচ্ছে এটা বোঝার জন্য খুব সামান্য কাণ্ডজ্ঞানই দরকার।

এই দেশে আস্থা রাখা যায়, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। উচ্চ আদালতই সম্ভবত একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেটা এখনও কিছুটা আশা জাগায় মনে। জাতি হিসাবে আমাদের সৌভাগ্য, একজন এস কে সিনহাকে আমাদের প্রধান বিচারপতি হিসাবে পেয়েছি, এবং তিনি উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা নিশ্চিত রাখার সাথে সাথে নিম্ন আদলতকেও সেই পথে নিয়ে যাবার লড়াই করছেন। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের কথা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২ এ স্পষ্টভাবে লিখা আছে, আর মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর এসব নিয়ে এতটা কালক্ষেপণ তো বিরাট অপরাধ। নিম্ন আদালতসহ বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীন হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে কাউকে নিপীড়ন করার ইচ্ছা যাদের আছে, হাতেগোনা তেমন কিছু মানুষ ছাড়া এই দেশের আর সব সাধারণ মানুষের কাছে এটা হবে একটা অসাধারণ ব্যবস্থা।

আগেই উল্লেখ করেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২১ আগস্ট প্রধান বিচারপতিকে ‘বালক’ এর সাথে তুলনা করে তাঁর কাজকে বালকসুলভ বলেছেন। একটু দেখি বালক বয়সটা কি শুধু নেগেটিভই। আমি তো বরং মনে করি বালক বয়স অনেক দিক থেকে পরিণত বয়সের চাইতে ভালো – ওই বয়সে মানুষ ধান্ধাবাজি শেখে না, তেলবাজি শেখে না, শেখে না নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের স্বার্থের ক্ষতি করতে। বালকরা বেপরোয়াও হয়, নিজে যা ভালো বোঝে সেটার পেছনে লেগে থাকে নাছোড়বান্দার মতো। এই বিবেচনায় বলছি আমাদের ‘বালক’ প্রধান বিচারপতি ‘বালক’ই থাকুন, তিনি সব লোভ, ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের বিচার বিভাগকে সত্যিকারভাবে স্বাধীন করে তোলার সংগ্রামে লেগে থাকুন নাছোড়বান্দার মতো। এতেই এই রাষ্ট্রের, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের এমনকি দীর্ঘমেয়াদে আওয়ামী লীগেরও মঙ্গল, কিন্তু দলটি পরিস্থিতি যাচ্ছেতাই রকম ঘোলাটে করে ফেলেছে আহাম্মকের মতো।