ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
SK-Sinha-ed

প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে যা হচ্ছে, সেটা নিয়ে শুরু থেকেই যে ধোঁয়াশা ছিলো, সেটা কাটানোর এক চেষ্টা হয়েছে কাল আইনমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। অনুমান করি ধোঁয়াশা প্রায় পুরোটাই কেটে গেছে। তবে আইনমন্ত্রীর জন্য করুণা, তিনি ধোঁয়াশা কাটিয়ে যা বোঝাতে চেয়েছেন আমাদের, সেটা বুঝিনি আমরা অনেকেই; বুঝেছি ঠিক উল্টোটা।

দীর্ঘ অবকাশের পর সুপ্রীম কোর্ট খোলার ঠিক আগের দিন নিজ কার্যালয়ে অফিস করতে করতে মাননীয় প্রধান বিচারপতির হঠাৎ মনে হলো তিনি ক্যান্সার আক্রান্ত, তাই তাঁর এক মাসের ছুটি প্রয়োজন। যদিও অবকাশের পর সুপ্রিম কোর্ট খোলার দিন রীতি অনুযায়ী বিচারপতি এবং আইনজীবীদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের দাওয়াতপত্রও পাঠিয়েছিলেন তিনি। এর সাথে মিলিয়ে নিন ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপি দের তীব্র বিষোদগার, পদত্যাগের চাপ আর তাঁর পদ থেকে টেনে নামাতে আন্দোলনের হুমকি।

নিকট অতীতেই আমাদের সামনে আরেকটা আলোচিত ‘অসুস্থতা’র উদাহরণ আছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এরশাদ যখন এমনকি ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সরাসরি চাপকে অগ্রাহ্য করে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সরকার তাকে ‘অসুস্থ’ বানিয়ে তুলে নিয়ে যায়। আমাদের সরকার অন্তর্যামী – কারো অসুস্থতা তিনি নিজে না জানলেও ‘মহানুভব’ সরকার তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান, কিংবা ছুটি দিয়ে দেন। এই সব পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনায় নিলে স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান বলে এই ছুটির আবেদন অস্বাভাবিক।

বিষয়টি নিয়ে মূল ধারার মিডিয়ায় এক ধরণের রাখঢাক দেখা গেলেও সামাজিক মিডিয়া প্রতিবাদে খুব উচ্চকিত ছিল শুরু থেকেই। আর মিডিয়াকে অসুস্থতা, ছুটি সবকিছুর তথ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন এটর্নি জেনারেল, আর আইনমন্ত্রী যেটা অবিশ্বাস্য। তাঁরা এই ব্যাপারে কথা বলার কেউ তো নন! শাসন বিভাগের প্রতিনিধি কেন বিচার বিভাগের বিষয় নিয়ে কথা বলবেন? সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার কোথায়?

মানুষের ক্রমাগত প্রশ্নের মুখে সেটা দূর করার জন্য শেষ পর্যন্ত আবার এগিয়ে এল সরকারের আইনমন্ত্রী; বিচার বিভাগের কেউ নয়। যাই হোক, তিনি মানুষের সব রকমের সংশয় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলেন গতকাল; প্রধান বিচারপতির ছুটির ‘আবেদন’ টি দেখিয়েছেন তিনি। অনেকগুলো যাচ্ছেতাই ভুল বানান আছে ওটায়, যেটা যে কোনো প্রধান বিচারপতির সাথে একেবারেই বেমানান। এটা প্রমাণ করে ওটা লিখেছে অতি নিচু মানের শিক্ষার কোনো মানুষ, অথবা ওটি সুস্থিরভাবে লিখা হয়নি।

সাথে যোগ করুন, প্রধান বিচারপতির স্বাক্ষর একেবারেই মিলছে না তাঁর আগে করা স্বাক্ষরের সাথে। আরেকটা ব্যাপার আমার চোখে পড়লো। আইনজীবী না হলেও সেটা নিয়ে কিছু কথা বলছি। তাঁর আবেদন পত্রের শেষে লিখা আছে, ‘মহাত্মনের সানুগ্রহ অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিনীত অনুরোধ করছি’। আমি যদ্দুর জানি, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর বিচার বিভাগ যেহেতু স্বাধীন, তাই প্রধান বিচারপতির ছুটি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অনুমোদিত হবার দরকার নেই। তিনি নিজের ছুটি নিজেই নেন, আর সেটা রাষ্ট্রপতিকে জাস্ট জানিয়ে দেন। আমাদের কি এটা বিশ্বাস করতে হবে, বিচারপতি সিনহা রাষ্ট্রপতির কাছে ছুটি মঞ্জুরের আবেদন করেছেন! দেশের বিচার বিভাগ এর স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত করার জন্য যে বিচারপতি অসীম সাহস নিয়ে দুর্বৃত্ত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন তিনি এটা জানেন না! জবাবটা খুব সোজা, যে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ চিঠিটা ড্রাফট করেছেন, তিনি এই তথ্য জানেন না।

পারিপার্শ্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে গতকাল পর্যন্ত এটা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলো কোনো ধরনের ভয়ঙ্কর চাপ দিয়ে প্রধান বিচারপতিকে ছুটিতে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু কাল চিঠিটি দেখার পর এর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এখন যে সিদ্ধান্ত দাঁড়াচ্ছে সেটা আরও ভয়ঙ্কর – বিচারপতি সিনহা চাপের মুখেও ছুটির আবেদনে সই করেননি, কাল স্রেফ একটা জাল কাগজ দেখানো হয়েছে আমাদের। একটা রাষ্ট্র পরিচালনাকে স্রেফ ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলা হয়েছে, সেটার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ দেখলাম আমরা।

বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার জন্য জনাব সিনহা যে লড়াইটা করে যাচ্ছিলেন তার জন্য তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থাকবে আজীবন। আর তীব্রতম চাপের মুখে ‘ছুটি’তে যেতে অস্বীকার করার জন্য তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার পরিমান বেড়েছে বহুগুণ।

একটা রাষ্ট্রের সরকার শুধুমাত্র অনৈতিক (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জনের নির্বাচিত হওয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা রিট পিটিশন এর রায়ে এটা অবৈধ/বেআইনিও ঘোষিত হতে পারে) ক্ষমতায় থাকাকে ‘জায়েজ’ করতে বিদেশি রাষ্ট্রের অনুকূলে দেশের সব স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে, একে একে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। সরকার এখন ডুবন্ত অবস্থায় কোনো রকমে নাক উঁচু করে বেঁচে থাকা (ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী) বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে অন্যায় ক্ষমতায় থাকাকে আরও অনেক কাল টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

এবার আসি পাকিস্তানের কথায়। আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি যে স্বপ্ন নিয়ে, যে তিনটি মূলনীতির (সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার) ভিত্তিতে আমরা আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলাম, স্বাধীনতার ৪৬ বছরের পরেও আমরা সেগুলো থেকে অনেক দূরে। কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থার সাথে তুলনা করলে মনের গভীরে একটা স্বস্তি পাই, কারণ নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক সূচকে আমরা পাকিস্তানের চাইতে অনেকটা এগিয়ে আছি।

সমস্যা হচ্ছে পাকিস্তানের তুলনায় আমাদের এসব অগ্রগতি জনিত দম্ভ আর ‘৭১ এর ঘটনা আমাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যে আমরা এখন প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রও ‘পাকিস্তান’ নামটি নিতে পারি না। টাইমস হায়ার এজুকেশন র‍্যাংকিং এ বাংলাদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর নাম ১০০০ এর মধ্যে দেখে আমরা যখন ‘গর্বিত’ হই, তখন কিন্তু আমরা বলতে পারি না ওই র‍্যাংকিং এ পাকিস্তানের মতো প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এটা বললে ‘স্বাধীনতা বিরোধীদের দোসর’ হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা।

মন থেকে ফালতু টাবু সরিয়ে দেখলে দেখবো দফায় দফায় সামরিক শাসক ক্ষমতায় থাকার পরও পাকিস্তানের বিচার বিভাগ আমাদের দেশের তুলনায় অনেক স্বাধীন। এমনকি আজ নির্দ্বিধায় বলছি, জবরদখলকারী এরশাদের মতো ফালতু লোকের শাসনামলেও উচ্চ আদালতের ওপর এমন নোংরা হস্তক্ষেপ হয়নি। এরশাদের ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েই তো তাঁর উচ্চ আদালতকে বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে করা সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছিলো। সরকার তখন সেই রায় মেনে নিয়েছিল; এর সাথে মিলিয়ে নিন ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর আমাদের গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার চেতনা বিতরণের একমাত্র ‘ডিলার’ দলটি কী কী করছে।

ফিরে আসি পাকিস্তানের কথায়। কিছুদিন আগে যখন আদালতের রায়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অপরাধী সাব্যস্ত হন, তখন বিনা বাক্য ব্যয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা ছেড়ে দেন। এমন কিছু হলে কী হতে পারতো বাংলাদেশে সেটা কল্পনা করা যায়? এই উদাহরণকে কেউ যখন পাকিস্তানের বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নজির হিসাবে দেখাতে চেষ্টা করেছেন, তখন আবার কেউ কেউ পাল্টা বলেছেন, এর পেছনে আসলে সামরিক বাহিনী কলকাঠি নেড়েছে। তাই কি? তাহলে নওয়াজ এর দল ক্ষমতায় থাকে কী করে? তবুও তর্কের খাতিরে ধরে নেই কথাটা সত্যি।

এবার তাহলে একটু পেছনে ফেরা যাক। ২০০৭ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশারফ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীকে (যাঁকে পারভেজ ই নিয়োগ দিয়েছিলেন ২০০৫ সালে) পদত্যাগ করতে বলেন। ইফতেখার সেটা অস্বীকার করেন, কিন্তু তারপর পারভেজ তাঁকে সাসপেন্ড করেন। এরপর যা ঘটে সেটা শুধু এই উপমহাদেশই না দৃষ্টি কাড়ে সারা বিশ্বের। আইনজীবী, সাধারণ মানুষ সবাই মিলে এক অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে তোলে, যার পরিণতিতে পারভেজ বাধ্য হন ইফতেখারকে আবার তাঁর পদে ফিরিয়ে নিতে। মানুষের সামষ্টিক প্রতিবাদে এটা হতে পেরেছিলো একজন সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলকারীর বিরুদ্ধে।

অথচ কী হচ্ছে আমাদের দেশে! দেশের বিচার বিভাগ নিয়ে ছেলেখেলা করে যখন সেটাকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে, তখন এর রক্ষক সুপ্রিম কোর্ট কি কিছুই দেখছে না? অন্তত ‘ছুটি’র আবেদনের প্রশ্নে কি একটা সুয়োমটো রুল একেবারে ফরজ ছিলো না? অথচ দেশের জনগুরুত্বসম্পন্ন অনেক বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টকে স্বতঃপ্রণোদিত রুল (সুয়োমটো) দিতে নিয়মিতই দেখি।

ওদিকে এই ঘটনায় আইনজীবীরা তেমন শক্ত কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না, পাকিস্তানের মতো দিনের পর দিন আদালত বর্জন তো দূরেই থাকুক। মূল ধারার মিডিয়াও বিষয়টি নিয়ে খুব একটা উচ্চকিত না। আর সাধারণ মানুষ তো এখন এক রকম সর্বংসহা হয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের বিচার ব্যবস্থাটির মেরুদন্ড ভেঙে একেবারেই সরকারের আজ্ঞাবহ করার কাজটি সম্পন্ন হবে।

আমরা পাকিস্তান নই। অনেক ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের সাথে আমাদের দেশ তুলনীয় হলে সেটা আমাদের মর্মপীড়ার কারণ হয়; আমারও হয়। কিন্তু এবার আমি অন্তত চেয়েছিলাম আমরা পাকিস্তান হই। তাহলে স্বাধীনতা উত্তর আমাদের বিচার ব্যবস্থার সম্ভবত সবচাইতে সাহসী মানুষটিকে আমরা এভাবে হারাতাম না, আন্দোলন করে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারতাম। তাতে তাঁর হাত ধরেই আমাদের বিচার ব্যবস্থা নিম্ন আদালত সহ পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীন এবং শাসন বিভাগ হতে পৃথক হতো; বন্ধ হতো নাগরিকদের ওপর সরকারের অন্যায় নিপীড়ন।

প্রাসঙ্গিক পাঠ:

১. ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়, থলের বাইরের বিড়াল আর নাউরু-সামোয়ার কথা

২. ‘বালক’ প্রধান বিচারপতি ‘বালক’ই থাকুন