ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে একটা ভাষাগত মারপ্যাঁচ আছে আমাদের দেশে। সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন, এই শব্দ দু’টি এই দেশের সরকারগুলো ব্যবহার করে মূলতঃ সেই সব ঘটনার ক্ষেত্রে, যেটা সরকারের জন্য কোনো বিবেচনায় বিব্রতকর হয়। কিছুদিন আগেও সরকারের জন্য তেমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হ্যাঁ, ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে প্রাপ্ত মুক্তিপণের ১৭ লক্ষ টাকা সহ ডিবি পুলিশের সাত সদস্য সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার কথা বলছি (বিস্তারিত পড়ুন)।

এই ঘটনায়ই নয়, ইদানীং পুলিশের বড় কর্তাদের বলতে শোনা যায়, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানুষের ওপর নির্যাতন ইত্যাদি নাকি কোন পুলিশ অফিসারের একক ও বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড। তাই এগুলোর দায় হল ব্যক্তি পুলিশের, প্রতিষ্ঠান পুলিশের নয়। তাই তারা সংশ্লিষ্ট অফিসারদের শাস্তি দিচ্ছেন। আপাতভাবে এটাকে বড় বাহবা পাবার কথা বলেই মনে হয়।

বাংলাদেশে দুর্নীতি দূর করা কোন কালেই কোন সরকারের প্রায়োরিটি ছিল না। তাই পুলিশের দুর্নীতি রোধ পুলিশ কর্তাদর যে প্রথম পছন্দ হবে না সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যায়। ভেড়ার পাল যদি অন্যের জমিতে মুখ দেয়, সেই ভেড়াকে দোষ দিয়ে কতটা লাভ? আর যদি ভেড়াই সর্বেসর্বা হয়, তবে আর মেষপালকের দরকার কী? প্রশ্ন আসতে পারে, পুলিশ সদস্যদের, বিশেষ করে নিম্ন পর্যায়ের পুলিশ অফিসারদের ভেড়ার সাথে তুলনা করা যায় কি না।

আলবৎ যায়। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি পুলিশের কমাণ্ড-কন্ট্রোলে কনস্টেবলটি থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি পুলিশ সদস্যই তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তার অধীন। সিভিল ফোর্স হলেও এখানে হায়ারার্কি অনেক মূল্যবান। এখানে পরম চরিত্রহীন, চূড়ান্ত ঘুষখোর বড়কর্তার কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ কোন ছোট অফিসার করতে পারে না। লম্পট বসকেও সাধ্বী নারীরা স্যালুট করে। তাই ভেড়ার পালের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি মেষপালককে অবশ্যই করতে হবে।

আধুনিক রাষ্ট্রের জবাবদিহি ইথিক্সে অধীনস্তদের কর্মকাণ্ডের দায়ভার উপরওয়ালাদের নিতে হয়। বেশ দৃঢ় হায়ারার্কি এবং একটা সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসাবে এ বিষয়টি পুলিশের ক্ষেত্রে আরো বেশি সত্য।

 

89458dsf85

 

কক্সবাজার জেলার ডিবির যে পুরো দলটি ১৭ লক্ষ টাকাসহ সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে ধরা পড়লো তার পিছনের কাহিনী কি অনুমান করা যায় না? কয়েক দিন ধরে চলেছে অপহরণ ঘটনা। এ সময় ছোট্ট একটি জেলার ছোট্ট একটি শাখার সাতজন অফিসার কোথায় গিয়ে কী করছিল এটা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তা, বিশেষ করে এসপির অজানা থাকার কথা নয়।

যদি মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করা যায়, তবে এই সময়ব্যপ্তিতে ঐ অভিযুক্ত অফিসারদের সাথে এসপি সাহেবের অন্তত কয়েক ডজন বার ফোনে কথাবার্তা হবার প্রমাণ থাকার কথা। আর যদি সেটা নাও হয়, তবে গোটা ডিবির দলটি এত সময়ের মধ্যে কোথায় ছিল, কি করছিল সেটা এসপি সাহেব কি সিরিয়াসলি খোঁজখবর করেছিলেন?

এসপি সাহেবকে ঊর্ধ্বতন মহল থেকে সিরিয়াস কোনো জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে, এমন কোনো তথ্য আমি কোনো মিডিয়ায় দেখিনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত অফিসারের কাছে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, কেবল কক্সবাজার এসপিকে কেন, কোনো এসপিকেই তার অধীনস্তদের কুকীর্তির জন্য প্রশ্ন করা হয় না, জবাব দিতে হয় না।

পুলিশের নিম্ন পর্যায়ের ঘুষের অর্থ উপর মহল পর্যন্ত যায় বলে জনশ্রুতি আছে। সেটা অবশ্য আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু কক্সবাজার ডিবির কাছে পাওয়া ১৭ লাখ টাকা যে এসপির প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে থাকা কনস্টেবল আর এসআইরা মিলে ভাগ করে নিয়ে এসপিকে বঞ্চিত করত, এটাও আমরা বিশ্বাস করতে পারি না।

অপকর্মকারী নিম্নপদস্থ পুলিশ কর্মচারীগণের ফৌজদারি অপরাধ বা অসদাচারণের দায়ভার পুলিশের উপরওয়ালা আইনের মারপ্যাঁচে হয়তো গ্রহণ করেন না, কিন্তু এ পাপের দায়ভার তাদের অবশ্যই গ্রহণ করতে হয়। পুলিশ যে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারছে না, আমাদের সমাজ যে তাদের অনেকটাই অচ্ছুত মনে করে সেই অনাস্থার সামাজিক হেয়পনা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকতাদের অবশ্যই কষ্ট দেয়। প্রকাশ্যে অস্বীকার করলেও, অপ্রকাশ্যে ও পারিবারিক পর্যায়েও তারা যে অপমাণিত বোধ করেন, সেটার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে।

আমাদের সমাজে দুর্নীতি আগেও ছিল এখনও আছে ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু বর্তমানের মতো দুর্নীতির ভয়াবহতা হয়তো অতীতে ছিল না। আশার কথা বর্তমানে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্নীতি থেকে বের হয়ে আসার কথা বলছেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীদের এতিম বানিয়ে কারাগারেও প্রেরণ করছেন। তাই আমরা ভরসা করতে চাই যে তারা বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠনিকীকরণ করে আমাদের দুশ্চিন্তামুক্ত করবেন।

মাঠ পর্যায়ের যে সিনিয়র অফিসারের অধীনস্তরা অপকর্মে জড়িয়ে পড়বেন, অপকর্মকারীদের সাথে সাথে সেই সুপারভাইজারদেরও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এটা হতে পারে পুলিশের দুর্নীতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।