ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দেয়ার দারুণ এক প্রদর্শনী ফেইসবুকে চলছে গত কিছুদিন যাবৎ। নানা আক্রমনাত্মক কথা, ট্রল চলছে টার্গেট গ্রুপকে কেন্দ্র করে। সিএনজি (এই শব্দের সাথে ‘অটোরিকশা’ শব্দটা না থাকলেও আমরা যেহেতু ভালোভাবেই বুঝি, তাই এই শব্দটিই লিখবো) চালকদের ওপর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ এভাবেই বেরিয়ে আসার কথা ছিল হয়তো। কোনো সন্দেহ নেই সিএনজি কে কেন্দ্র করে এই অচল নগরের বাসিন্দারা বছরের পর বছর ভয়ঙ্কর হয়রানির শিকার হয়েছেন। আমিও এর বাইরে নই।

ফেইসবুকে কাউকে কাউকে আক্ষেপ করতে দেখছি, সিএনজি চালকদের চারপাশের ওই লোহার খাঁচাটা যদি না থাকতো তাহলে বহু সিএনজি চালক মার খেয়ে ‘সাইজ হয়ে লাইনে আসতো’। আমাদের তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধতা হয়তো আমাদের এভাবে কোনোদিন ভাবায়নি, এই চালকদের চারপাশে একটা অদৃশ্য খাঁচা আছে, যেটার কারণে চাইলেও এদের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব হয় না। আমরা তলিয়ে দেখি না বলেই যাদের সামনে পাই, সেই সিএনজি চালকদের বলির পাঁঠা বানাই। আমাদের ভোগান্তির জন্য আমি এই মানুষগুলোর চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করছি না।

অনেক কাল আগেই ব্যক্তিগত আগ্রহে আমি বেশ কিছু সিএনজি চালকের সাথে কথা বলেছি, বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেছি। এমন রিপোর্ট পত্রিকায়ও মাঝে মাঝে এসেছে, কিন্তু সেসব শিরোনাম দেখে পড়া দূরেই থাকুক, হয়তো মনে মনে বিরক্তই হয়েছি, ‘কেন এসব বাজে মানুষকে নিয়ে এমন রিপোর্ট!’

01_CNG+Auto+Rikshaw_Strike+_270514_0002

প্রাথমিকভাবে সিএনজি চালু হবার পর কয়েকবার ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবার একই চিত্র দেখা গিয়েছিল – অল্প কয়েকদিন মিটারে চলার পর আবার তারা আগের অবস্থায় ফিরে গিয়ে যখন আমাদের ‘ঠ্যাক’ দিতে শুরু করে, সেটা আমাদের ক্ষুব্ধ করে। কিন্তু আমরা খোঁজ নিয়ে দেখি না, প্রতিবার মিটারের ভাড়া বাড়ানোর সাথে সাথে সিএনজি মালিক তার জমার পরিমান বাড়িয়ে দেয়।

বর্তমানে একটা সিএনজি’র জমা ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা। এখন একজন সিএনজি চালকের ন্যূনতম খরচের একটা হিসাব করা যাক। ১০০০ টাকা জমার সাথে অন্তত ২০০ টাকার গ্যাস আর চালকের সারাদিনের খাওয়া খরচ ন্যূনতম ২০০ টাকা ধরলে কমপক্ষে ১৪০০ টাকা উপার্জন করার পর তার নিজের জন্য কিছু টাকা আয় হতে শুরু করে। তিন মাসের মতো শীতের আবহাওয়া বাদ দিলে বাঁকি নয় মাস ভয়ঙ্কর আবহাওয়ায় এই বিশ্রী শহরের রাস্তায় সিএনজি চালানো মানুষগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিন চালাতে পারে না, সাধারণত চালায় একদিন পরপর। এই দুর্মূল্যের বাজারে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করা মানুষের ন্যূনতম মাসিক উপার্জন কত হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি?

যে নীতিমালার আলোকে সিএনজি চালু করা হয়েছিল, সেটা অনুযায়ী কোনো সিএনজি চালক গন্তব্যের ব্যাপারে কোনো অপশন দেখাতে পারবেন না; যাত্রী যেখানে যেতে বলবে সেখানেই তাদেরকে যেতে হবে। বাস্তবে এটা কি আদৌ সম্ভব? এই ঢাকায় এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা নষ্ট হয়, তাতে তাদের জমার টাকা উঠানোই দায় হবে। এই প্রসঙ্গে একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই। ঢাকার গণপরিবহন নিয়ে এক টক শো তে দেশের সফল পরিবহন ব্যবসায়ী সোহাগ পরিবহনের মালিক জানিয়েছিলেন, ঢাকায় উন্নত মানের গণপরিবহন চালু করার জন্য বিশ্বব্যাংক এর বড় অংকের ঋণের অফার তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই ব্যবসা পোষানো সম্ভব না বলে। কারণ হিসাবে তিনি বলেছিলেন জ্যামের কারণে ট্রিপের যে সংখ্যা হবে সেটা দিয়ে ভালো ব্যবসা করা সম্ভব না। জ্যাম নিয়ে একটা তথ্য এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, ঢাকার রাস্তায় শতকরা ৭০ ভাগের বেশি দখল করে রাখে প্রায় ৫ শতাংশ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি।

জমার ব্যাপারে মালিকের জবাবদিহি চান, দেখবেন তিনি জানাবেন অনেক টাকা দিয়ে সিএনজি কিনে এখন মেয়াদ পার হওয়া সিএনজিগুলোর মোটা রক্ষনাবেক্ষন ব্যয়, মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ঘুষের টাকা সব মিলিয়ে তাদের খরচও অনেক। আমরা অনেকেই হয়তো মনে করতে পারবো প্রথম যখন সিএনজি চালু করা হয়, তখন পত্রিকায় রিপোর্ট এসেছিল সরকারের কিছু লোকের যোগসাজসে একটা কোম্পানি মনোপলি করে সোয়া এক লাখ টাকার সিএনজি পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। ওইসময় মিটারের ভাড়া নির্ধারিত হয়েছিল এসব বিষয়কে এড়িয়ে গিয়ে, ফলে সিএনজি যে মিটারে চলবে না, সেই বীজ বপন করা হয়েছিল সেই দিনই।

অনেক বছর থেকেই আমাদের দেশে কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, এটা অর্থনীতিবিদদেরই কথা। ঘরে ঘরে চাকুরীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আর সব প্রতিশশ্রুতির মতোই ‘কথার কথা’ হয়ে থাকে। তাই প্রতি বছর জব মার্কেটে প্রবেশ করা তরুণদের একটা বড় অংশই বেকার থেকে যায়। জীবন ধারণের জন্য এরাই যে কোনো মূল্যে কোনো না কোনোভাবে উপার্জনের চেষ্টা করে। এভাবেই এক একটি সিএনজি চালানোর জন্য যখন অনেক কর্মহীন মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকে, তখন সেই চিরন্তন চাহিদা-যোগান তত্ত্ব আমাদের জানিয়ে দেয় সিএনজি’র জমা বাড়বেই হু হু করে। ‘ঠ্যাক’ দেবার সুযোগ পেলে এই বাজারে কে দেয়না ‘ঠ্যাক’?

মালিকদের এই ‘ঠ্যাকবাজি’ কিন্তু সহজেই বন্ধ করে দেবার সুযোগ ছিলো, সিএনজি’র সরবরাহ বাড়িয়ে। কিন্তু সেটা করা হয়নি। বহু বার শোনা গিয়েছিল নতুন সিএনজি’র লাইসেন্স দেয়া হবে; এমনকি সিএনজি চালকদের কাছে সরাসরি সিএনজি বিক্রি করার সিদ্ধান্তের মতো মানবিক কথাও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি, কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এই প্রক্রিয়া এই ঠোকাঠুকিতেই সময় পার হয়েছে। অথচ আরও কিছু সামর্থ্যবান মানুষকে সিএনজি’র মালিক না বানিয়ে চালকদের মধ্যে সিএনজি বিক্রি করলে জমার চাইতে কম টাকা দিয়েও তারা দাম শোধ করে দিতে পারতো; এই রাষ্ট্রের কিছু মানুষ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারতো। এমনকি মালিকদের কাছে আরও সিএনজি বিক্রি করলেও সরবরাহ বাড়ার কারণে মালিকরা যাচ্ছেতাই জমা চাইতে পারতো না। সিএনজি চালকরাও মিটারের ভাড়াতেই আমাদের গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারতেন।

সময় পাল্টে যায়। নতুন নতুন ব্যবস্থা পুরোনোটাকে প্রতিস্থাপন করে। অনেক সময় নতুনের প্রভাবে পুরনোকেও পাল্টে যেতে হয়। সিএনজি মালিক আর চালকের পক্ষ থেকে উবার আর পাঠাও বন্ধের যত দাবিই করা হোক না কেন, এটা হবে না। এটা যাত্রীদের হাতে এবার সিএনজি কে ‘ঠ্যাক’ দেবার একটা পথ খুলে দিয়েছে। এই চাপে হয়তো মালিকরা ‘সিধা’ হবে, নইলে তাদেরকে বিলুপ্ত হতে হবে।

আমার আফসোস এই জায়গায় যে সামনে পাই বলে, আবার অর্থনৈতিক শ্রেণীর বিচারে ‘নিচুজাত’ বলে সিএনজি চালকদের উপরেই সব ঝামেলা যায়। মিটারে না যাবার জন্য এদেরকেই পুলিশের মামলার শিকার হয়েছে বা ঘুষ দিয়ে ছাড়া পেতে হয়েছে। কই আমরা তো কোনোদিন শুনিনি যে অংকের জমার ভিত্তিতে মিটারের ভাড়া নির্ধারিত হয়েছিল, তার চাইতে অনেক বেশি জমা নেবার কারণে কোনো মালিককে পুলিশ ধরেছে।

আমাদেরও যাবতীয় চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধারের লক্ষ্য সিএনজি চালকরাই, এর মালিক বা সিএনজি বাজারজাত করে শত শত কোটি টাকা লুটকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক নয়, বা সরকারের সেই মানুষগুলোও নয়, যাদের কারণে এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সম্ভব হয়েছে। এটা অন্যায়, অবিচার। লেখাটা শেষ করার সময় মনে হলো চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধারের জন্য আমার নামও সিএনজি চালকদের সাথে যুক্ত হতে পারে, এই ‘নোংরা’ মানুষগুলোর হয়ে সাফাই গেয়েছি বলে।