ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্মূলের জন্য মিয়ানমার সরকার যা যা করেছে সেটাকে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন ‘টেক্সটবুক এক্সাম্পল অব এথনিক ক্লিনজিং’। বাংলাদেশ-মিয়ানমার এর মধ্যকার রোহিঙ্গা বিষয়ক সমঝোতাকে সেই কর্মকর্তার উক্তিকে ধার করে আপাতদৃষ্টিতে বলাই যায় ‘টেক্সটবুক এক্সাম্পল অব স্টুপিড ডিপ্লোম্যাসি’। ডিপ্লোম্যাসির এই স্টুপিডিটি অবশ্য আপাতভাবে দেখে বলা হলো, কিন্তু অনুমান করি এর পেছনে ভয়ঙ্কর কোনো ‘খেলা’ আছে।

মানুষের কোন কোন বিষয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রভাব রাখে তার একটা ধারণা আমাদের আছে। এগুলো হলো – বক্তার ব্যবহৃত বাক্য-শব্দ, ইনফ্লেশকশন (শব্দের ওপর স্ট্রেস, ইনটোনেশন ইত্যাদি), ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন, বডি ল্যাংগুয়েজ ইত্যাদি। আজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন মিয়ানমারের সাথে ‘এরেঞ্জমেন্ট’ নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন দেখলাম পররাষ্ট্রমন্ত্রী কমিউনিকেশন এর প্রতিটা কম্পোনেন্ট এ একেবারেই যাচ্ছেতাই বিধ্বস্ত। আমরা বিবেচনায় রাখবো পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারাজীবন পেশাগত কূটনীতিক এর চাকুরী করেছিলেন। তার যাবতীয় কূটনৈতিক দক্ষতা দিয়েও তিনি তার ব্যর্থতাজনিত হতাশা ধামাচাপা দিতে পারেননি।

এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর যখন জাতিসংঘসহ পৃথিবীর অনেক প্রভাবশালী দেশ ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে যাচ্ছে, মিয়ানমারের কট্টর সমর্থক দেশগুলোর মধ্যে ভারত যখন সমর্থন কিছুটা হলেও শিথিল করছে, তখনই আমরা উল্টো মিয়ানমারের চাপে এমন একটা সমঝোতা করলাম! কথ্য ভাষায় এটাকে ‘নাকে খত দেয়া’ বলাই যায়।

Arrangement-signing-01

বেশ কিছুদিন থেকেই আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং সচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এর ব্যাপারে কতগুলো সিদ্ধান্ত আমাদের দৃঢ়ভাবে জানাচ্ছিলেন। সিদ্ধান্তগুলো নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য কল্যাণকর হতো। এইসব বিষয়ে স্বাভাবিকভাবেই মিয়ানমারের সাথে আমাদের শক্ত মতদ্বৈততা হয়েছিল। এই তো গত ২ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়ে আলোচনার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে মিয়ানমারের ইউনিয়নমন্ত্রী চ টিন্ট সোয়ের বৈঠকে এসব বিষয়ে আমাদের দুই পক্ষের চিন্তার বিরোধিতা স্পষ্ট ছিল (বিস্তারিত পড়ুন এখানে)। এর মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা কোনোভাবেই চাইনি ১৯৯২ সালের ফ্রেইমওয়ার্কে কোনো চুক্তি হোক। আমরা বুঝেছিলাম ওই ফ্রেইমওয়ার্কের আওতায় নানাভাবে সমস্যায় পড়ে যাবো আমরা।

১৯৯২ সালের চুক্তির কয়েকটি বিষয় এরকম- রোহিঙ্গাদের পরিচয় সনাক্ত করার মতো ডকুমেন্ট থাকতে হবে, আর এটা যাচাই করার একক কর্তৃত্বও মিয়ানমারের হাতে ছিলো। উল্লেখ্য, এমন ডকুমেন্ট এখন দেখাতে পারবে কয়েক হাজার মানুষ (যদি তারা এই হত্যা/আগুন থেকে পালানোর সময় নিয়ে এসে থাকে)। ওই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদেরকে শরণার্থী (আমরা এবার কিন্তু তাদের শরণার্থী বলছি না) হিসাবে সংজ্ঞায়ন করা ছিল; এর মানে হলো তারা না চাইলে তাদেরকে কেউ ফেরত পাঠাতে পারবে না। ওই চুক্তিতে কোনো সময়সীমা ছিলো না। ওই চুক্তির অধীনে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৫ পর্যন্ত এক যুগে রোহিঙ্গা ফেরত গিয়েছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৭৮ সালের চুক্তিতে কিন্তু স্পষ্টভাবেই বলা ছিল ওই বছরের ৩১ আগস্টের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু ও ছয় মাসের মধ্যে গোটা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।

আগের ‘ঘর পোড়া গরু’ আমরা চেয়েছিলাম প্রত্যবাসনের একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকবে। এটা না থাকার ফল আগের অনুচ্ছেদেই উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে যুক্ত করছি, ২০১১ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার সফরের সময় কয়েক হাজার রোহিঙ্গার একটা তালিকা নিজে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন, কিন্তু সেই তালিকার কেউ ফিরে যেতে পারেনি। কিন্তু মিয়ানমার কোনো সর্বোচ্চ সীমা রাখতে রাজি হয়নি।

মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা চেয়েছিলাম জাতিসংঘকে পুরোপুরি সম্পৃক্ত করতে, কিন্তু সমঝোতায় আছে মিয়ানমার ‘প্রয়োজন অনুযায়ী’ ইউএনএইচসিআর (UNHCR) কে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করবে। খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে, এটা জাস্ট একটা শুভঙ্করের ফাঁকি। মোদ্দাকথা মিয়ানমার যেভাবে চেয়েছে সেভাবেই, ১৯৯২ সালের সমঝোতা অনুযায়ী একটা সমঝোতা করে এসেছি আমরা, যেটা পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও সরাসরি স্বীকার করেছেন। পড়ুন – মিয়ানমার চেয়েছে, তাই ‘৯২ সালের চুক্তি অনুসরণ করা হচ্ছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী! সমঝোতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা এই লিংক (রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সমঝোতায় কি আছে) থেকে পড়ে নিলেই বোঝা যাবে দেশের স্বার্থ কীভাবে জলাঞ্জলি দেয়া হলো এই তথাকথিত সমঝোতায়।

দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্মতিপত্র স্বাক্ষর হওয়াকে ‘বিরাট সাফল্য’ হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর অভিধাকে (বিস্তারিত পড়ুন) আমরা এক রকম ‘গায়ের জোরে’ মুখ রক্ষার চেষ্টা বলে বুঝবো। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজে দেখার চেষ্টা করা উচিত, বাংলাদেশ কেন এই তেতো বড়ি গিললো।

এই তথাকথিত সমঝোতা হয়েছে চীনের চাপে, এটা স্পষ্ট। আমরা মনে করতে পারবো চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের সময় সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, তারা চায় এই সমস্যা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে। মিয়ানমারে গিয়ে তিনি সমাধানের ফর্মূলা জানান। ওর পরপরই মিয়ানমারের সেনা প্রধান চীনা প্রেসিডেন্ট এর সাথে দেখা করেন এবং প্রেসিডেন্ট সেনাপ্রধানকে আরও বেশি সমর্থন করার কথা জানান। মিয়ানমারের ওপর আমেরিকা এবং ইউরোপের চাপ বৃদ্ধির ফলে তাদের এই অঞ্চলে ঢোকার একটা মওকা হতে যাচ্ছিল, তাই চীন চেয়েছে মিয়ানমারের শতভাগ স্বার্থ রক্ষা করে খুব দ্রুত একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হোক, যাতে সারা পৃথিবীকে দেখানো যায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে প্রায় (নানা সমালোচনা করা হলেও এই সমঝোতার কথা এর মধ্যেই সারা বিশ্বে চাউর হয়ে গেছে)। হ্যাঁ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি নিয়ে (অন্যান্য ঝুঁকি তো আছেই) আমরা চীনকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটা ‘ব্ল্যাংক চেক’ দিয়েছি। বলেছিলাম এটাকে ‘টেক্সটবুক এক্সাম্পল অব স্টুপিড ডিপ্লোম্যাসি’ বলা যায় আপাতভাবে। আমার যৌক্তিক অনুমান এখানে আমাদের সরকারের অন্য ‘খেলা’ আছে।

কয়েক বছর পেছনে যাওয়া যাক। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি যে নির্বাচন নামের ফাজলামো হয়েছে, সেটা হবার পেছনে এবং তারপর গঠিত সরকারটিকে যে ভারত টিকিয়ে রেখেছে এতে কোনো রাখঢাক ভারত কোনোদিন করেনি। আমরাও দেখেছি সেটা। সমস্যা হচ্ছে ‘অনির্বাচিত’ সরকার হবার পরও পুরো মেয়াদ পার করে দিতে পারার মধ্যে যে অবিশ্বাস্য মজা-আয়েশ আছে সেটা তো সরকার পেয়ে গেছে। ওদিকে আরেকটি নির্বাচন আসছে এক বছরের মধ্যেই। আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মীরাই বলে মোটামুটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন হলেই আওয়ামী লীগের যাচ্ছেতাই ভরাডুবি হবে। ভারত কি এবারও সরকারকে আরেকটা ৫ ই জানুয়ারি ‘উপহার’ দেবে?

আমরা খেয়াল করবো, এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করার জন্য চীন আর ভারত এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে যে, এটা এখন শত্রুতায় পরিণত হয়েছে। কয়েক মাস আগে ভুটানের দোকলাম উপত্যকাকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে রীতিমত যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল। এছাড়াও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশে নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছে দুই দেশ। বলাই যায়, এই অঞ্চলের নানা দেশ এই দুই শক্তিমান দেশের প্রক্সি ডিপ্লোম্যাটিক ওয়ার এর ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঝামেলার প্রধান বিষয় হয়েছে চীনের কানেক্টিভিটির মেগা প্রকল্প ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর)। এই প্রকল্পের একটি অংশ, যা চায়না-পাকিস্তান ইকনোমিক করিডোর (সিপিইসি) নামে পরিচিত, পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরের ওপর দিয়ে বেলুচিস্তানের গোয়েদার বন্দর এর সাথে যুক্ত হয়েছে। আজাদ কাশ্মীরকে যেহেতু ভারত তার নিজের অংশ বলে মনে করে, তাই ওবিওআর ভারতের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করছে, এই অভিযোগে ভারত ওই প্রকল্পে যোগ দেয়নি। ভারতকে ইতোপূর্বে সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছাড় দেয়াটা ভারতকে আরও আগ্রাসী করে তোলে এবং ভারত চায় বাংলাদেশ ওবিওআর থেকে বেরিয়ে আসুক। কিন্তু অক্টোবরে পররাষ্ট্র সচিব দিল্লি গিয়ে জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ ওবিওআর এ থাকছে (বিস্তারিত পড়ুন)। এটা ভারতকে ভীষণ নাখোশ করেছে।

ভারত আরও নানা কারণে নাখোশ আমাদের ওপরে। আমরা মনে করতে পারবো বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কেনার পরও তারা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। সাম্প্রতিককালে ‘হিন্দু’ প্রধান বিচারপতি ইস্যুতেও ভারত ক্ষুব্ধ বলে নানা ফিসফাস আছে। বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচন নিয়ে সথে আরও কিছু ইস্যু মিলে এটা বোঝা যায়, ভারত আওয়ামী লীগ সরকারকে ২০১৪ সালের মতো অন্ধ সমর্থন দিচ্ছে না।

অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ শক্তিশালী হবার আগে পর্যন্ত বহু বছর চীনের ঘোষিত নীতি ছিল, তারা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু শি জিনপিং এর সময় থেকে অর্থনৈতিকভাবে ভীষণ শক্তিশালী চীন এখন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করছে নানা দেশে। নেপাল, শ্রীলংকা, কম্বোডিয়া, উত্তর কোরিয়া তো আছেই, সর্বশেষ উদাহরণটি দেয়া যাক। জিম্বাবুয়ের সাম্প্রতিক সেনা অভ্যুত্থান এর পেছনে চীনের সরাসরি হাত ছিল এটা গার্ডিয়ান এর এই রিপোর্টে (Zimbabwe: was Mugabe’s fall a result of China flexing its muscle?) বেশ স্পষ্ট। হ্যাঁ চীন এখন সরাসরি খেলছে।

এবার দুইয়ে দুইয়ে চার মেলালে কী দাঁড়ায়? বিনা নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকার মজা পেয়ে যাওয়া বর্তমান সরকার কি এবার চীনকে পাশে রেখে আরেকটি ৫ ই জানুয়ারির খোয়াব দেখছে? কিংবা চীনের দিকে হেলে যাবার ভাব দেখিয়ে ভারতকে আবার পাশে পাবার চেষ্টা করছে? আমরা যাকে সরকারের ব্যর্থতা/বোকামি মনে করছি, সেটা কি তবে সরকারের ‘অতি চালাকি’?