ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অফটপিক লিখার শেষে থাকলেও আমি শুরুই করলাম অফটপিক দিয়েই। ‘কসাই’ শব্দটি নিষ্ঠুরতা, বর্বরতাকে বোঝানোর জন্য আমরা খুব ব্যবহার করি। আমরা এটা কখনও হয়তো ভেবে দেখি না, এই শব্দ দিয়ে কাউকে গালি দিয়ে একটা খুব গুরুত্বপূর্ন পেশার মানুষকে আমরা অপমান করি। এটাও ভেবে দেখি না, কেউ যদি গবাদি পশুর মাংস বিক্রি করেই কেউ নির্দয়-নিষ্ঠুর হয়ে যায়, তবে আমরা সেই মাংস খেয়ে যে নিষ্ঠুরতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছি, সেই হিসাব আমরা করি না। যাক, আমাদের দেশের বেশ কিছু ডাক্তার এর নানা পেশাগত অসদাচরণের কারণে আমরা পুরো ডাক্তার সমাজকেই ‘কসাই’ শব্দটি দিয়ে অনেকেই সম্বোধন করি। আজ দেখলাম অবিশ্বাস্যভাবে হাইকোর্টও একজনকে ভৎসনা করার জন্য এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন (বিস্তারিত পড়ুন এখানে)।

এই গৌরচন্দ্রিকার কারণ কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া একটা আপাত ছোট (আসলে এটা এই রাষ্ট্রের জন্য ভয়ঙ্কর) ঘটনা নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি। ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে প্রাক্তন সিভিল সার্জনকে তিন মাসের সাজা দিলেন লক্ষীপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক। অবশ্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বলাটা সম্পূর্ণ সঠিক হল না। কারণ, মোবাইল কোর্টের বিচারক তিনি ছিলেন না, দিয়েছেন ইউএনও। আর সাজার সিদ্ধান্তটি কিন্তু অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা ইউএনওর মাধ্যমেও বাস্তবে আসেনি। সেটা এসেছিল স্বয়ং জেলা প্রশাসকের মারফত। কারণ যেখানে কোর্ট বসেছিল, সেটা আসলে ছিল জেলা প্রশাসকেরই অফিস ভবন।

আমাদের মূলধারার মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে তোমন কোনো উচ্চবাচ্চ যেমন দেখিনি তেমনি ফেইসবুকেও খুব একটা কথা হয়নি। ঘটনার ভুক্তভোগী যেহেতু একজন ‘কসাই’ ডাক্তার, তাই অনুমান করি অনেকেই বিষয়টাতে শঙ্কিত তো বোধ করেননি বরং খুশিই হয়েছেন – যেভাবেই হোক একজন ‘কসাই’ ডাক্তার তো সাইজ হয়েছেন। তবে হ্যাঁ, যার ওপর দিয়ে ঝড়টা গেল, তাঁর পেশার মানুষগণ এটার প্রতিবাদে নানা কথা বলেছেন।

সামাজিক চাপ জারি রাখার জন্য সঠিক সময়ে সঠিক কথাটি না বলে এভাবেই আমরা একটা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি করতে ব্যর্থ হই।

ফিরে আসি সেই মোবাইল কোর্টে সাজার ঘটনায়। সাজাটা কিন্তু বেশ বড়ই। কারণ,যে আইনের যে ধারায়(পেনাল কোড,১৮৪ ধারা) সাজা দেয়া হয়েছে সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তিই হল তিন মাসের জেল। তবে আদালত চাইলে তাকে জরিমানাও করতে পারতেন কিন্তু ‘উদার’ কোর্ট তা করেননি। কর্তব্য পালনে সরকারি কর্মচারীকে বাধা দানের জন্য এদেশে কত জনের সাজা হয়েছে সেটা অবশ্য আমরা জানি না। তবে চারিদিকে চাউর হওয়া ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে এ সংখ্যা নিতান্তই সীমিত। কার্যক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয় সাধারণত পুলিশ। কিন্তু পুলিশ এসল্ট মামলাগুলোর পরিসংখ্যান বলে, এ জন্য আসামীদের সাজা হওয়ার ঘটনা নিতান্তই ব্যতিক্রম।

আলোচ্য ঘটনাটি ছিল একটি স্কুলে প্রবেশকে কেন্দ্র করে। কার চেয়ে. কে বেশি গুরুত্ব গুরুত্ব পাবে, কার আগে কে ঢুকবে – এসব নিয়েই মূল ঘটনা। হয়তো প্রাক্তন সিভিল সার্জন স্থানীয় ব্যক্তি হওয়ায় একটু বেশি সুবিধা চেয়েছিলেন। আর ডিসি সাহেবের স্কুল বলে এবং তার সাথে সাথে একজন প্রশাসক হওয়ায় এডিসি সাহেব বেশি সুবিধা চেয়েছিলেন । কিন্তু ক্ষমতার অধিষ্ঠিত থাকলে যে এডিসি চামচিকার মতো হাতিকেও লাথি মারবেন, চিকিৎসা ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদে একদা আসীন ঐ চিকিৎসক সেটা বুঝতে পারেননি। তাইতো জীবনের শেষ দিকে এসে তাকে হাজতবাস করতে হল।

একটি স্কুলে অভিভাবক হিসেবে বাচ্চা দিতে গিয়ে এডিসি সাহেব কী ধরনের সরকারি কাজ করছিলেন তা অবশ্য আমাদের বোধগম্য নয় । তাই হাতাহাতির বিষয়টি নিতান্তই ব্যক্তিগত। কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয়কে সরকারি রং লাগিয়ে একজন প্রাক্তন ও প্রবীণ সরকারি কর্মকর্তাকে আর একজন কর্মকর্তা রীতিমত জেলে ঢুকিয়ে দিলেন! ক্ষমতার অপব্যবহার এখন এতদূর পর্যন্তই গড়িয়েছে!

ভ্রাম্যমাণ আদালত বসবে ঘটনা স্থলে। কিন্তু এ ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো ডিসি অফিসে। যেখানে আদালতের বিচারক, মানে সদরের ইউওনওকে ডেকে আনা হল। এরপর অভিযোগকারীর নিদের্শনায় সাজা দেয়া হল। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে আদালত ভ্রাম্যমাণই ছিল, কিন্তু তাই বলে আদালতের বিচারককে ঊধ্বর্তন কর্মকর্তার রীতিমত সমন পাঠিয়ে অন্যখানে নিয়ে এলন, সেটা ব্যাখ্যা করি কীভাবে? এখানে বোঝার বাঁকি থাকে না যে এই আদালত বসেছে ডিসি সাহেবের অফিসে। ডিসি ফোন করে পুলিশ দিয়ে প্রাক্তন সিভিল সার্জনকে গ্রেফতার করিয়ে তার কার্যালয়ে এনেছেন। এরপর যা হবার তাই হয়েছে।

মোবাইল কোর্ট আইনের ৬(১) ধারায় স্পষ্ঠ বলা আছে ম্যাজিস্ট্রেট ‘তাহার সম্মুখে সংঘটিত বা উদঘাটিত হইয়া থাকিলে তিনি উক্ত অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে গ্রহণ করিয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিকে, স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে, দোষী সাব্যস্ত করিয়া, এই আইনের নির্ধারিত দণ্ড আরোপ করিতে পারিবেন।

কিন্তু প্রাক্তন সিভিল সার্জনের সাথে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের হাতাহাতি (ধরেই নিলাম তা সরকারি কর্তব্য পালনে বাধাদান) বিচারকের সম্মুখে সংঘটিতও হয়নি, উদঘাটিতও হয়নি। তিনি ঘটনাস্থলে অভিযোগটি আমলে না নিয়ে ডিসি অফিসে গিয়ে আমলে নিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হল অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে এ সাজা দিতে হবে। যদি ঘটনাস্থল, তাৎক্ষণিকতা ইত্যাদি সব ঠিকও থাকে, আর আসামী যদি দোষ স্বীকার না করেন, তবে তাকে সাজা দেবার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু এখানে সব কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে, কেবল গায়ের জোরেই একজন প্রাক্তন সিভিল সার্জন তথা অভিজ্ঞ চিকিৎসককে সাজা দেয়া হয়েছে।

মোবাইল কোর্টের আইন অনুসারে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি জেলা প্রশাসক বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তার সাজার বিরুদ্ধে আপীল করবেন। কিন্তু যে সাজা দানের প্রাথমিক পর্যায়েই জেলা প্রশাসক জড়িত এবং খোলাভাবে বললে বলতে হয় ইউএনওর মাধ্যমে জেলা প্রশাসক নিজেই সে সাজা দিয়েছেন তাহলে তার কাছে আপিল করে কোন লাভ হবে কি?

হাইকোর্টের রায় অনুসারে(যদি তা কিছু সময়ের জন্য স্থগিত করে আপিলের পর্যায়ে আছে) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা অবৈধ। কিন্তু এটা কেন অবৈধ তা আমজনতার পক্ষে বোঝা কঠিন। সাধারণ মানুষ বোঝে যে বিচার করতে পারে সেই বিচারক। তারা মিনে করে তারা যদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ওয়ার্ডের মেম্বার এমনকি গ্রামের মাতব্বরের বিচারও মেনে নিতে পারি, তবে প্রশাসন ক্যাডারের একজন ম্যাজিস্ট্রেটের বিচার মানতে কোন অসুবিধা নেই।

কিন্তু লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে ঐ জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি যা দেখালেন তাতে আমাদের বুঝতে নিশ্চয়ই সমস্যা হবার কথা না, কেন তাদেরকে দিয়ে আদালত পরিচালনা উচিৎ না। একজন সাবেক উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, একজন প্রবীন ডাক্তার আবার একটি শক্তিশালী পেশাজীবী সংগঠনেরও সদস্য, তার ক্ষেত্রে যদি ব্যক্তিগত আক্রশে এমন জেলে ঢোকানোর ঘটনা ঘটে, তবে আমাদের মতো চুনোপুটিদের ভাগ্যে কী ঘটবে?

পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারে আমি যতদূর জানি থানা হাজতবাস হয়, কিন্তু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতার অপব্যবহারে যে সরাসরি জেলহাজতে যেতে হয়, সেটা আবার দেখলাম আমরা। প্রমান হলো, প্রশাসনের হাতে মোবাইল কোর্ট থাকা ‘বানরের গলায় মুক্তোর মালা’র সাথেই তুলনীয়। এই মালা অবশ্যই খুলে নিতে হবে। তবে সার্বিক পরিস্থিতিতে যদি মনে হয় আরও কিছুদিন মোবাইল কোর্ট থাকা উচিত, তাহলে সেটা পরিচালনা করবেন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এর সংখ্যা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার তুলনায় অপর্যাপ্ত হলে, সেই সংখ্যা বাড়ানো হোক।

আমরা যা ই বলি না কেন, আমাদের সংবিধানের রক্ষক সর্বোচ্চ আদালত যতই বলুক না কেন, প্রশাসনের হাতে মোবাইল কোর্ট থাকা বিচার বিভাগের প্রথকীকরণের পথে বড় অন্তরায়, সেটা আমাদের প্রশাসনের পছন্দ হয় না। এজন্যই আমরা দেখি প্রতি বছর জেলা প্রশাসক সম্মেলনের সময় তাঁদের দাবিদাওয়ার খুব ওপরের দিকেই থাকে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা হাতে রাখা।

কিছুদিন আগে ষোড়শ সংশোধনী করে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিশংসন সংসদের (পড়ুন প্রধানমন্ত্রীর) হাতে নেবার চেষ্টা হয়েছিল। একজন সাহসী প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা’র নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট সেই চেষ্টাকে নস্যাৎ করেছে। কিন্তু সেটার প্রতিক্রিয়ায় জনাব সিনহার জীবনে কী ঘটেছে, সেটাও আমরা জানি। সাথে মিলিয়ে নিন দেশের সিভিল প্রশাসন মোবাইল কোর্ট নামের বর্বর বিচার ব্যবস্থাটিকে যে কোন মূল্যে টিকিয়ে তাদের হাতে রাখতে চায়। এবার স্পষ্টভাবেই বোঝা গেল এই দেশে শুরু থেকেই খুঁড়িয়ে চলা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে ধ্বংস করে মধ্যযুগীয় সাম্রাজ্য বানানোর চেষ্টা হচ্ছে।

আজ থেকে ঠিক ৮০০ বছর আগে ব্রিটেনে ম্যাগনাকার্টার মাধ্যমে রাজার সর্বময় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে ক্ষমতার পৃথকীকরণের যে চর্চা শুরু হয়েছিল, ফরাসি বিপ্লব হয়ে সেই পথ অনেকটা পাড়ি দিয়ে একটা আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ছোটখাটো কিছু ত্রুটি থাকলেও এই ব্যবস্থা মানুষের জন্য কল্যাণকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। নানা লক্ষণ প্রমান করে, আমাদের রাষ্ট্রটি ম্যাগনাকার্টার পূর্ববর্তী সেই মধ্যযুগে ফেরত নিয়ে যাবার চেষ্টা হচ্ছে।

এই রাষ্ট্রের মালিক হিসাবে সেই চেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলা উচিত আমাদের, আর সেটা শুরু হোক মোবাইল কোর্ট নামের বর্বর বিচার ব্যবস্থাটিকে নির্মূল করার মাধ্যমে।