ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

নীচে দেয়া ছবিটি ফেইসবুকে কয়েকদিন ঘুরে বেড়িয়েছে আমাদের নানা রকম মন্তব্যসহ। ছবিটিতে দেখা যায়নি, কিন্তু খবরে জানা যায়, ক্রন্দনরত চারটি শিশুর সামনে একটি লাশ ছিল, তাদের বাবা হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের ইউনুছ মিয়ার লাশ। এই শিশুগুলোর তীব্র আহাজারি আর সাথে একটা তথ্য আমাদের ভেতরটাকে জাগিয়ে দিয়েছে ছবিটি ভেতরটা ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছে। সেই তথ্যটির কথায় পরে আসছি।

Screenshot_1

এবার একটু নজর দেই আজকের ঘটনায়। নাখালপাড়ায় ঘটা করে ‘জঙ্গি আস্তানা’য় অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং অভিযান শেষে ওই বাসায় তিনটি মৃতদেহ পাওয়া গেছে। (পড়ুন- তিনজন মানুষকে খুন করা হয়েছে)। গতকালও তিনজন মানুষকে গুলি করে খুন করা হয়েছে সুন্দরবনে, গায়ে ‘বনদস্যু’র তকমা লাগিয়ে। পুলিশের বয়ানের বাইরে যেহেতু এখন পর্যন্ত আর কোনো ভিন্ন বয়ান আমাদের সামনে আসেনি, তাই আমাদের প্রায় সবার কাছেই ওরা সত্যিকারের ‘জঙ্গি’ এবং ‘বনদস্যু’-ই থাকছে, আর সে কারণেই এই খুনগুলো ‘জায়েজ’ হয়েছে। অনুমান করি, ‘জঙ্গি’ খুনের ঘটনাটা অনেকের চোখে পড়লেও ‘বনদস্যু’ খুন করার খবর আমাদের অনেকেরই চোখে পড়েনি, কিংবা পড়লেও আমাদের তাতে কিছুই আসে যায়নি।

বন্দুকযুদ্ধের নামে এসব ঠাণ্ডা মাথার খুন আলোচনার বিষয় হিসাবে ন্যূনতম গুরুত্ব হারিয়েছে অনেকদিন আগেই। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টার এর নামে ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন নিয়ে শুরু থেকেই আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষ বেশ খুশি। কিছু মানুষ যাঁরা এই বর্বরতাকে মেনে নেননি তাঁরাও এখন চুপ করে থাকেন এসব ঘটনায়; অসভ্যতা-বর্বরতার সাথে ক্রমাগত বসবাস আমাদের কাছে সবকিছু সহনীয় করে তোলে। কেউ কেউ এই বর্বরতার সাথে অভ্যস্ত হয়েছেন, আর কেউবা ভাবেন এই রাষ্ট্রে কথা বলাটা ‘অ্যাবসার্ড’।

ইউনুছ মিয়ার ঘটনায় ক্রসফায়ার (হালে বন্দুকযুদ্ধ) আমাদের কাছে অনেকদিন পর আলোচনার বিষয় হয়েছে। এর আগে আরেকটা ঘটনা আমাদের মধ্যে খুব আলোচিত হয়েছিল। সেটা অবশ্য মৃত্যুর ঘটনা ছিলো না। হ্যাঁ, লিমনের কথা বলছি। ভোররাতে তথাকথিত অস্ত্র উদ্ধারের গল্প বলে র‍্যাব-পুলিশ বহু মানুষকে ঠান্ডা মাথায় খুন করার পর ন্যূনতম কোনো শব্দ না করলেও র‍্যাবের গুলিতে লিমনের পা হারানোর ঘটনায় আমরা অনেক উচ্চবাচ্চ করেছিলাম। লিমন যেহেতু কোনো অপরাধী ছিল না, তাই র‍্যাবের গুলিতে ‘অন্যায়ভাবে’ লিমনের পা হারানো আমাদের ব্যথিত-ক্রুদ্ধ করেছিলো। লিমন কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হলেই অবশ্য এই পা হারানো তো বটেই তার খুন হয়ে যাওয়াটাও ন্যায়ানুগ হয়ে যেত আমাদের অনেকের নৈতিকতা বোধের কাছে।

ফিরে আসি ইউনুছ মিয়ার ঘটনায়। কোনো কোনো পত্রিকায় শুরুতে তাঁকে ‘মাদক সম্রাট’ অভিধায় আখ্যায়িত করেছিলো (বিস্তারিত পড়ুন)। কিন্তু পরে জানা গেল একেবারেই ভিন্ন এক বয়ান – চাঁদার জন্য পুলিশের হয়রানির শিকার ইউনুছ মিয়ার স্ত্রী পুলিশের বিরুদ্ধেই মামলা করেছিলেন, আর সেই মামলা তুলে নেয়ার চাপে সাড়া না দেবার ফল এই খুন (বিস্তারিত পড়ুন)। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ইউনুছ মিয়া সত্যি সত্যি ‘মাদক সম্রাট’ হলে ফেইসবুকে এই সহানুভূতি আর ক্ষোভের বন্যা বয়ে যেতো না। এটা মানি, ক্রন্দনরত সন্তানগুলোর ছবি হয়তো বন্দুকযুদ্ধ নামের অন্য খুনগুলোর তুলনায় কিঞ্চিৎ বেশি সহানুভূতি তৈরি করতো, কিন্তু সেটা একজন ‘নিরপরাধ’ মানুষকে খুন করার সমান প্রতিক্রিয়া তৈরি করতো না কোনোভাবেই।

বছরের পর বছর এই বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড চলছে, অথচ আমরা ঘুণাক্ষরেও ভেবে দেখি না, এভাবে মানুষকে ধরে নিয়ে খুন করে ফেলাটা কোনোভাবেই একটা সভ্য রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। রাষ্ট্র স্বভাবজাতভাবেই নিপীড়ক, কিন্তু এভাবে মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করার ক্ষমতা মেনে নিয়ে আমরা রাষ্ট্রকে আরও ভয়ঙ্কর নিপীড়নের সুযোগ করে দেই। সেই ধারাবাহিকতায় এখন বন্দুকযুদ্ধের সাথে যুক্ত হয়েছে এনফোর্সড ডিসএপিয়ারেন্স বা গুম।

একটা রাষ্ট্র তার নাগরিকের বিচার পাবার অধিকার যখন রক্ষা করে না, তখন সেটা রাষ্ট্র নামের সংগঠন তৈরি হবার আদি চুক্তির বরখেলাপ। সেই চুক্তির একটা পক্ষ, নাগরিকদের সবার মধ্যে এই বোধ থাকা উচিত। তাই এই অধিকার যদি ভঙ্গ হয়, সেটা যতো ভয়ঙ্কর অপরাধে অভিযুক্ত মানুষের ক্ষেত্রেই হোক না কেন, সেটার তীব্র প্রতিবাদ করা সব নাগরিকের অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু আমরা করছি না। আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না, এমন ইস্যুর ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবাদহীনতাই প্রধান বিচারপতির মতো পদধারীকে যাচ্ছেতাইভাবে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিতে সাহস যোগায়।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি অন্য অনেক বিষয় থাকলেও বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদহীনতা আমাদের দেশের সরকারের ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার বড় ভিত্তি তৈরি করেছে। তাই আজ যখন নানা দিকে আমাদের অধিকার হৃত হয়, যখন সরকার পরিচালনায় জনগণের মতামতের ন্যূনতম তোয়াক্কা করা হয় না, যখন একটা অনির্বাচিত সরকার তার ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে স্রেফ ধ্বংস করে ফেলছে তখন আয়নায় আমাদের নিজেদের চেহারা দেখা উচিত। হ্যাঁ, বিনা বিচারে মানুষ খুন করে ফেলার নৈতিক সমর্থন দিয়ে আমরা সরকারের এই প্রবণতায় ইন্ধন যুগিয়েছি, যোগাচ্ছি এখনও।