ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

দেশের বর্তমান সরকার কি আদৌ মানুষকে কেয়ার করে? এই প্রশ্নের জবাবে সমাজ-রাজনীতি সচেতন কোনো মানুষ হয়তো জবাব দেবে পাল্টা প্রশ্ন করে – কেয়ার করার কি কোনো কারণ আছে? আসলেই তাই, কেয়ার করার কোনো কারণ নেই। কেন সেটা নেই, সেই আলোচনায় আসছি পরে। কিন্তু এই কারণ না থাকার ফলাফল হলো আমরা যা ই করি না কেন, যা ই বলি না কেন তাতে সরকারের কিছুই আসে যায় না। হ্যাঁ, এটাই অথরিটারিয়ান সরকার ব্যবস্থা। আমরা, এই দেশের জনগণ তো এই অথরিটারিয়ানইজম হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিই, এর একটা আন্তর্জাতিক ‘স্বীকৃতি’ ও পাওয়া গেছে – দ্য ইকোনমিস্ট এর ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এর এই বছরের রিপোর্টের ‘ডেমোক্রেসি ইনডেক্স’ এ দেখা যায় গত দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচাইতে খারাপ পর্যায়ে আছে, এবং এই এক বছরে বাংলাদেশের আট ধাপ অবনমন হয়েছে (৮৪ থেকে ৯২)। এই রিপোর্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় পরে আসছি।

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সম্পর্কে জানি আমরা প্রায় সবাই। বিস্তারিত খুঁটিনাটি না জানলেও এটা আমরা প্রায় সবাই জানি অত্যন্ত অস্পষ্ট ভাষায় নানা ‘অপরাধের’ বর্ণনা, জামিন না হওয়া, এবং ‘লঘু পাপে গুরুদণ্ড’ ছিল এর মূল বৈশিষ্ট্য। এই ধারার বিরোধিতা করেছিল সবাই, এমনকি সরকার সমর্থক সুশীলগণসহ, তবে তাদের ভাষা ছিলো খুব ডিপ্লোম্যাটিক। তারা বলতেন, আইনের অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে নাকি সেটার অপব্যবহার হতে পারে। অথচ খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে আইনে অপরাধের ব্যাখ্যা অস্পষ্ট রাখা একটা মতলববাজি। এটা করাই হয়, যেন ইচ্ছামত যে কাউকে অভিযুক্ত করে হয়রানি করা যায়। মানুষের সামষ্টিক ‘হাউকাউ’ সরকারের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে বলে যারা আশা করেছিলেন, তাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করছিলেন।

এবার আইসিটি অ্যাক্টের জায়গায় এসেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮। এক তৃতীয় শ্রেণীর ভাঁওতাবাজি করেছে সরকার। শিশুকে বুঝ দেবার মত করে ৫৭ ধারা বাদ দিয়েছে তারা, যেন সেটা দেখেই সবাই খুশি হয়ে যাবে। দুই একটা ক্ষেত্রে সাজার পরিমাণ সামান্য এদিক-সেদিক করে ৫৭ ধারার সবকিছু ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে ২৫, ২৮, ২৯ আর ৩১ ধারায়। এতে সরকারের দারুণ মজা হয়েছে – এখন কেউ মুখস্ত ৫৭ ধারার কথা বলে ফেলতে পারবে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে ফেইসবুকে একজন লিখেছেন ‘নতুন বোতলে পুরোনো বিষ’। কথাটা আসলে পুরোপুরি ঠিক নয় – নতুন বোতলে ‘পুরনো বিষ’ নয় বর্তমান বিষ আগের চাইতে আরও ভয়ঙ্কর।

নতুন আইনে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে ৩২ ধারাটি, যেটায় বলা হয়েছে –  ‘যদি কোনো ব্যক্তি বে-আইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কোনো ধরনের অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন, বা করিতে সহয়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ।’ অনুমিত কারণেই বিশেষ করে সাংবাদিক সমাজ এই ধারাটির বিরুদ্ধে প্রচন্ড বিক্ষোভ করছে।

সারা পৃথিবীর প্রায় সবার চোখে হিরো হুইসেল ব্লোয়ার (সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি ফাঁসকারী), জুলিয়ান এসঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেন, ম্যানিং এই ৩২ ধারার দৃষ্টিতে ভয়ঙ্কর অপরাধী হিসাবে বিবেচিত হবেন। অথচ আমরা অনেকেই জানি না, এভাবে ‘গুপ্তচর’ বানিয়ে হুইসেল ব্লোয়ারদের পথ বন্ধ করা দূরেই থাকুক অনেক দেশেই তাদের সুরক্ষা দেবার জন্য আইনি ব্যবস্থা আছে। এটা শুনে কেউ যদি মনে মনে বুঝে নেন ওসব তো পশ্চিমা দেশে হয়, আমাদের এসব হতে অনেক দেরি হবে, তারা ভুল করছেন। পশ্চিমা দেশগুলোতে তো আছেই, ভারতে ২০১৪ সালে হুইসেল ব্লোয়ার প্রটেকশন এক্ট করা হয়েছে। কেউ এবার হয়তো বলবেন ভারতের তো দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ইতিহাস আছে…. তাহলে এটাও আমরা জেনে রাখবো ঘানা, উগান্ডায় পূর্ণাঙ্গ হুইসেল ব্লোয়ার প্রটেকশন এক্ট, নাইজেরিয়ায় হুইসেল ব্লোয়িং পলিসি আছে, আর কেনিয়া, রুয়ান্ডার মতো দেশে এই আইনের খসড়া তৈরি হয়ে গেছে।

বোধগম্য কারণেই ৩২ ধারা নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে। কিন্তু আমি খেয়াল করছি সেই আলোচনা করতে গিয়ে আমরা আগের তীব্র সমালোচনার শিকার ৫৭ ধারার বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলছি না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ওই ধারার বিষয়বস্তু প্রায় অবিকৃত রেখে নতুন আইনের ৪টি ধারায় সন্নিবেশিত হয়েছে।

এখন সরকার যদি ৩২ ধারার কিছুটা পরিবর্তন করে আইনটি পাস করে দেয়, তখন আমাদের অনেকেই হয়তো সেটাকে মেনে নেব। এতে হয়তো আমরা সাবেক ৫৭ ধারার নিপীড়নমূলক বিষয়গুলো এড়িয়ে যাবো। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে ৩২ ধারা থাকার আগেও আমরা আইসিটি এক্ট এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলাম। তাই এর সাথে নিবর্তনমূলক ২৫, ২৮, ২৯ আর ৩১ ধারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও জারি থাকুক। মানুষের বাক স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করতে এই চারটি ধারার বিষয়বস্তুই যথেষ্ট। সব নিপীড়ণকারী ধারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হতে হবে জোর গলায়।

এটা স্বীকার করতেই হবে, এখন যখন ডিজিটাল প্রযুক্তি সর্বব্যাপী হয়ে পড়েছে, তখন এই মাধ্যম ব্যবহার করে নানা রকম অপরাধ সংগঠিত হবে। তাই ডিজিটাল মাধ্যমকে রেগুলেট করার জন্য কিছু আইন এবং নীতিমালা থাকতেই হবে। সমস্যা হচ্ছে এটার নামে যখন সরকার এমন সব অস্পষ্ট সংজ্ঞার অপরাধ এর শাস্তির বিধান করে, তখন আমরা বুঝি এতে সরকারের লাভ হলেও ক্ষতি জনগণের। সরকারের লাভ আমরা বুঝতেই পারি, তবে সরকারি দলের একজন খুব প্রভাবশালী সদস্যের ভেতর থেকে বেরিয়ে যাওয়া কথা আমাদের বোঝাটাকে প্রমাণ করে।

‘‘আপনারা (সাংবাদিকরা) গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন, তাতে তাদের মান-ইজ্জত থাকে না। তাদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। তারা তো জনপ্রতিনিধি। তাই এগুলো ঠেকাতেই এ আইন করা হয়েছে।” জনাব তোফায়েল এই মন্তব্য করে নিশ্চয়ই দলের ভেতরে তোপের মুখে পড়েছেন। তবে তাঁর কপাল ভালো, তাঁর এখন অন্তত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা নেই। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন বলে জনাব তোফায়েল পেশাগত সাংবাদিকদেরকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু তিনি আর তাঁর সরকার খুব ভালো করেই জানেন এই ডিজিটাল যুগে একটা ক্যামেরা থাকা মোবাইল প্রত্যেকটি নাগরিককে এক একজন সাংবাদিক বানিয়ে দিয়েছে। চারদিকে গিজগিজ করতে থাকে ‘সাংবাদিক’দের ভিড়ে ভীত হওয়াই স্বাভাবিক।

এই ডামাডোলের মধ্যে ইকনোমিস্ট পত্রিকার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশ্ব গণতন্ত্র সূচক প্রকাশিত হলো কয়েকদিন আগে। আমাদের অনেকেই জানি, এবারের সূচকে বাংলাদেশ ৮৪ থেকে ৮ ধাপ নীচে নেমে ৯২ তে এসেছে। গণতন্ত্রের বিচারে দেশগুলোকে পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, হাইব্রিড গণতন্ত্র, আর স্বৈরতন্ত্র এই চার শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ আছে তৃতীয় শ্রেণি, ‘হাইব্রিড গণতন্ত্র’ এ। কিছুকাল আগে সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক দলে অনুপ্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত ‘হাইব্রিড’ শব্দটির পরিবর্তে ‘কাউয়া’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। তার কাছ থেকে ধার করে আমাদের দেশে বিদ্যমান ‘হাইব্রিড গণতন্ত্র’ কে বলাই যায় ‘কাউয়া গণতন্ত্র’।

এই শ্রেণীতে সেসব দেশ আছে যেখানে প্রায়ই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। বিরোধী দল এবং বিরোধী প্রার্থীদের ওপর সরকারের চাপ নৈমিত্তিক ব্যাপার। দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার এবং দুর্বল আইনের শাসন। নাগরিক সমাজ দুর্বল। বিচারব্যবস্থা স্বাধীন নয় এবং সাংবাদিকদের হয়রানি এবং চাপ দেওয়া হয়।

অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো এই বছর আমাদের দেশের গণতন্ত্রের মান সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, ২০০৭ সালের তুলনায়ও অনেকটা কমে গেছে। এবার আমাদের অবস্থান ৯২ তে, আর স্কোর ৫.৪৩, অথচ ২০০৭ সালে আমাদের স্কোর ছিল ৬.১১ আর অবস্থান ৭৫। আমরা তখন ছিলাম এখনকার চাইতে অনেক ভালো ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ এর শ্রেণিতে।

এই সরকার জনগণকে কেয়ার না করার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। একটা সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে যখন জনগণের সমর্থন লাগে না, প্রত্যক্ষ ভোট ছাড়াই ‘নির্বাচিত’ হয়ে পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়, তখন সেই সরকার জনগণকে বিদুমাত্র তোয়াক্কা না করারই তো কথা। আগামি নির্বাচনকে ঘিরে আগের মতো ঘোলাটে পরিস্থিতি আবার তৈরি হচ্ছে, তাই আবারও সরকারের সামনে ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি প্রহসন ঘটানোর সুযোগ আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে জনসমর্থন নয়, বরং জন-নিবর্তন করার অস্ত্র দরকার সরকারের, যাতে সেটা দিয়ে ভীতি তৈরি করে মানুষকে সেলফ সেন্সরে বাধ্য করা যায়।

নির্বাচনের বছরে সরকারের মারমুখী আচরণে পুরোনো সব অস্ত্রের সাথে যুক্ত হচ্ছে নতুন অস্ত্র – ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮। এর ফল হবে এখন কিছুটা গণতন্ত্র আর অনেকটা স্বৈরতন্ত্রের মিশেল ‘কাউয়া গণতন্ত্র’ থেকে পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় চলে যাওয়া। এর বিরুদ্ধে সামষ্টিকভাবে রুখে দাঁড়ানোর জন্য আমরা প্রস্তুত তো?