ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

খালেদা জিয়া জেলে গেলেন। জেলে তিনি কেমন আছেন, থাকার কক্ষটি স্যাঁতস্যাঁতে কিনা, ব্যক্তিগত গৃহপরিচারিকা পেয়েছেন কিনা, প্রথম রাতে কী খেয়েছিলেন, রুমে শুধু বিটিভি দেখা যাবে, নাকি ডিস কানেকশন থাকবে, এসব নানা আলোচনায় ব্যস্ত আমাদের মিডিয়াগুলো। অবশ্য মিডিয়া সেটাই খাওয়ানোর কথা যেটা আমরা খেতে চাই। এইসব আলোচনা দেখে আমার ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, কারণ এটা এই ঘটনা সম্পর্কে আমাদের আলোচনার ফোকাস নষ্ট করছে। প্রশ্ন হলো জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা পাওয়ায় আলোচনার ফোকাস হওয়া উচিত কোনটি?

একটা আলোচনা খুব সিরিয়াসলি মাঠে ছাড়া হয়েছে – খালেদা জিয়ার মামলার ‘মেরিট’ কতোটা? সেই আলোচনায় মূলধারার মিডিয়ায় এবং ফেইসবুকে এক পক্ষ নানাভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, খালেদা জিয়া সত্যিই রাষ্ট্রীয় বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। আর এই বিচারের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার নাকি মাইলফলক তৈরি করেছে। এতে নাকি প্রমাণ হয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার অভিযান শুরু করেছে, আইন তার ‘নিজস্ব গতিতে’ চলেছে এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অপরপক্ষ প্রমাণের চেষ্টা করছে তিনি নির্দোষ। সরকার মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে এবং তাঁর দলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চাইছে। নানা রকম তথ্য উপাত্ত নিয়ে তারা হাজির হচ্ছেন, বোঝাতে চাইছেন তিনি ‘গরিবের টাকা মেরে’ খাননি। সাংবাদিক গোলাম মোর্তজা’র এই লিখাটা এই ব্যাপারে আগ্রহীদের আগ্রহ মেটাবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু আমি চাই না, এই আলোচনায় আমরা সময় ‘নষ্ট’ করি। কারণটা পরে বলছি।

বিষয়টা অফটপিক, তবুও মূল আলোচনায় যাবার আগে আরেকটি বিষয়ে কিছু কথা বলা দরকার বলে মনে করি। নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করলেও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভায় বেগম জিয়া আশংকা প্রকাশ করেছেন, “দেশের নিম্ন আদালত ‘সরকারের কব্জায়’ থাকায় সঠিক রায় দেওয়ার ক্ষমতা বিচারকদের নেই”। এমন কথা তিনি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার শুনানিতেও বলেছিলেন। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার রায় হয়েছিল ১৯৯৯ সালে, কিন্তু এরপর পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় সেই রায় বাস্তবায়নের একটা পদক্ষেপও তো বেগম জিয়া নেননি। তাঁর কাছে ওই ফাইল ২৬ বার গিয়েছিল, কিন্তু তিনি সেটা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তখন তিনি ‘সরকারের কব্জায়’ নিম্ন আদালত রেখে মজা নিচ্ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পৃথকীকরণ এর কিছু কিছু কাজ হলেও সংবিধানের ১১৬ ধারার মাধমে নিম্ন আদালতে কার্যত সরকারের অধীনেই আছে।

বেগম জিয়া যদি সত্যিই সরকারের এই প্রবণতা ঘৃণা করতেন, তাহলে তিনি কোর্টে বা আজকের সভায় ঘোষণা করতে পারতেন তিনি যদি আবার ক্ষমতায় যান, তাহলে নিম্ন আদালতকে পরিপূর্ণভাবও সরকারের কব্জামুক্ত করবেন। তিনি সেটা বলেননি, বলবেনও না। তিনি বরং অধীর আগ্রহে বসে আছেন, সরকারে গিয়ে কব্জায় থাকা নিম্ন আদালতকে দিয়ে হাসিনাকে ‘লোয়ার কোর্ট’ দেখিয়ে ছাড়বেন। এভাবেই এই রাষ্ট্রের ‘সেপারেশন অব পাওয়ার’ স্বপ্নই থেকে যায়।

খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের মূল ফোকাস কী হওয়া উচিত আলোচনা শুরু করেছিলাম সেটা নিয়ে। খালেদা জিয়ার মামলার রায় যে একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত রায়, সেটা নেহায়েত অন্ধ আওয়ামী সমর্থকসহ সবাই বুঝেছে। তবে অন্ধ আওয়ামী সমর্থকরা তাদের মতলববাজির কারণে সত্য কথাটি না বলে দলীয় প্রপাগ্যান্ডটি ছড়িয়ে যায়। ফেইসবুকের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ানো নানা আলোচনা, যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়েরকৃত প্রধানমন্ত্রীর মামলা প্রত্যাহার, এরশাদের মামলা একেবারে স্থবির হয়ে থাকা, আর বর্তমান সরকারের সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের হোতাদের বিখ্যাত ‘আইনের হাত’ এর ছুঁতে না পারা এসব দিয়ে এই মামলার মোটিভ বুঝতে খুব সামান্য কাণ্ডজ্ঞানই লাগে।

এই ‘রাজনৈতিক মামলা’র রায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ঠিক কী প্রভাব ফেলবে সেটা আলোচনা করা এক ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করে। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলটি তার বিরুদ্ধে যাওয়া কোনো ধরণের বক্তব্যের প্রতি ন্যূনতম সহনশীল নয়। যে মানুষগুলো এটা করে, তাদের গায়ে একটা ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে তার মুখ বন্ধ করিয়ে দেবার চেষ্টা করা চলে বহু বছর থেকেই। যেমন ইসরাইল এর বর্বরতার সমালোচনাকারীর গায়ে অনেক সময়ই ‘এন্টি-সেমেটিক’ ট্যাগ লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়। বর্তমান বাংলাদেশে আওয়ামী বয়ানের বিরুদ্ধে কথা বললে খেতাব জুটতে পারে, ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের দোসর’।

রায়ের পর প্রথম আলোর ‘রায়ের পরের রাজনীতি’ শিরোনামের রিপোর্টটিতে কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের মন্তব্য ছাপা হয়েছে। সবার মন্তব্যের কথা বাদই দেই, আসুন দেখে নেয়া যাক শ্রদ্ধেয় ডঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মন্তব্য –

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আদালতের রায়ে কারাগারে যাওয়ায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। নির্বাচন আসছে। নির্বাচনটা তো অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। সে রকম একটি নির্বাচনের জন্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বেগম জিয়ার মামলাটা সেই পরিবেশ তৈরির সহায়ক হয়নি।

 

দেশে কত শত শত কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা বা সাজা হওয়ার কথা কমই শোনা যায়। সে তুলনায় বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, টাকার পরিমাণ বিবেচনায় তেমন বড় নয়।

 

তবে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন এমন একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুতর। কিন্তু সেই মামলার নিষ্পত্তি নির্বাচনের আগেই করে ফেলা অনিবার্য ছিল না। সেটাই জরুরি করে তোলা হলো। এর ফলে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণমূলক যে নির্বাচনের কথা আমরা বলছি, তাও অনিশ্চিত করে ফেলা হলো।

 

এটা সব সময়ই দেখা গেছে, যে নেতারা কারাগারে যান, তাঁদের প্রতি মানুষের একটু আলাদা সহানুভূতি তৈরি হয়। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও যে সেটা হবে না, তা তো বলা যায় না। তবে তার পাশাপাশি নির্বাচনের আগের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে, সে বিষয়ে মানুষের মধ্যে একটা উৎকণ্ঠা তৈরি হলো। একটা শঙ্কাও সৃষ্টি হলো, যা নির্বাচনের আগে এই সময়ে না হলেই ভালো হতো।

হ্যাঁ, তিনি কোথাও ইংগিতেও বলার চেষ্টা করেননি সরকার এই কাজটি ঠিক করেছে এবং এটা এই রাষ্ট্রের আইনের শাসনের এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। ধরুন এই শ্রদ্ধেয় মানুষটির বক্তব্য না, এটা এমন একটা বক্তব্য আমি দিয়েছি। তো কী হতো ফলাফল? আমার গায়ে নিশ্চয়ই ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের দোসর’ ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হতো। তো সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারকে কি বলা হবে না, নব্য ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের দোসর’?

সঠিক সময়ে সঠিক কথাটি বলেন, এমন পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল আমাদের সমাজে প্রায় শূন্যের কোঠায়। এই অতি বিরল প্রজাতিটির মধ্যে জ্বলজ্বলে নামগুলোর একটি প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তাই তাঁর এই বিবৃতি আমার কাছে একদমই অপ্রত্যাশিত ছিলো না। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই মানুষটির দলটি খুব ছোট। বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তথাকথিত রক্ষক (আদতে সেই চেতনার সবচাইতে বড় হরণকারী) আওয়ামী লীগকে নানা ইস্যুতে ব্ল্যাংক চেক দিয়ে দেয়া ‘বুদ্ধিজীবী’র (এরা কোনোভাবেই পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল নয়) সংখ্যাই অগণিত। আমি নিশ্চিত এসব মানুষ খুব দ্রুতই বর্তমানের অথোরিটারিয়ান সরকারটিকে পুরোপুরি টোটালিটারিয়ান সরকারে পরিণত করে ছাড়বে।

এমন একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা কি মেনে নিতে প্রস্তুত আমরা? যদি না হয় তবে এর বিরুদ্ধে সামষ্টিক লড়াই করার জন্য কি আমরা প্রস্তুত?