ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

বেশ কয়েক বছর আগেও পত্রিকায় নামী কলামিস্টের লেখা, টিভি টক শো’তে নামী বক্তার কথা শুনতাম খুব মন দিয়ে। ওদের কাছ থেকে শিখতে চাইতাম। কয়েক বছর থেকে এই পরিস্থিতি পাল্টেছে। কারণটা হচ্ছে আমি আমাদের প্রায় শতভাগ কলাম লেখক আর টিভি’র টক শো এর আলোচকদের কাছ থেকে শেখার তেমন কিছু পাই না। তবে এখনও কিছু নামী কলামিস্ট এর লেখা, টিভি টক শো’তে নামী বক্তার কথা শুনি – এটা শেখার জন্য না, এটা হচ্ছে কোনো ইস্যুতে নিজের বিশ্লেষণকে তুলনা করে নিজেকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলা।

এইমাত্র যে অনুচ্ছেদটি পড়লেন, সেটির বক্তব্যে আত্মশ্লাঘা আছে। ক্ষমা চাইছি সেজন্য, কিন্তু আমার বিবেচনায় এটা দরকার ছিল একজন মানুষ আর তাঁর লেখা নিয়ে কিছু কথা বলার জন্য। শিরোনামটি এর মধ্যেই নিশ্চয়ই জানিয়ে দিয়েছে ব্যক্তিটি মাহবুব কামাল।

একটু আগে যে বলছিলাম, এখন শেখার জন্য কলাম পড়ি না, এর এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম মাহবুব কামাল। আমি আজও হাতে গোনা যে দুই একজন কলামিস্টের লেখা পড়ি শেখার জন্য, তাঁদের মধ্যে সবচাইতে সবার ওপরের নামটিই হলো মাহবুব কামালের। এই ব্যক্তির কল্যাণে আমার বৃহস্পতিবার দিনটি  দুর্দান্তভাবে শুরু হয়- হ্যাঁ, এ দিনই দৈনিক যুগান্তরে তাঁর সাপ্তাহিক কলামটি ছাপা হয় ‘জাত নিমের পাতা’ নামে। এই কলামগুলোরই তৃতীয় আর চতুর্থ সংকলন বেরিয়েছে এবারের বইমেলায় – একই শিরোনামে।

 

 

কলামটি আসলেই ‘জাত নিমের পাতা’, তবে এর তিক্ততার আস্বাদ আমি পাই না, কারণ এই পাতা দিয়ে যেসব বিষয়কে এবং যাদেরকে তিনি তুলোধুনো করেন, আমি সেই দলে নেই। তাই আমি ‘জাত নিমের পাতা’ ‘খেয়ে’ যাই অমৃতের মতো। কী অসাধরণ বিষয় নির্বাচন, একেবারে সমস্যার গোড়ায় গিয়ে বিশ্লেষণ, অবিশ্বাস্য সব উপমা আর তার ট্রেডমার্ক রচনাশৈলী। রচনাশৈলী দিয়ে মানুষকে সম্মোহিত করে ফেলার তার এই ক্ষমতাকে আমি আমাদের সংস্কৃতির চর্চা অনুযায়ী বলছি ‘ঈর্ষণীয়’। তাকে কি আসলেই ঈর্ষা করি আমি?

কেউ কি কারো লেখা পড়ে সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস, সাহিত্যের চমৎকার জ্ঞান পেতে চান? তাহলে পড়তে হবে ‘জাত নিমের পাতা’। কেউ কি ওসব বিষয়ে এর মধ্যেই অনেক বেশি জ্ঞানার্জন করে ফেলেছেন? তবুও পড়তে হবে, কারণ তাঁর কলাম পাঠ আপনাকে নিখাদ সাহিত্যপাঠের আনন্দ দেবে। কেউ কলাম লিখছেন? তাহলেও তাঁর কলাম অবশ্যপাঠ্য; লিখালিখিতে পাঠককে ‘হুক’ করা বলতে যা বোঝায় তার এক অসাধারণ প্রদর্শনী তাঁর কলাম যেটা শিরোনাম থেকে শুরু হয়ে মিশে থাকে লিখার প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে।

সাপ্তাহিক যায়যায়দিন যেসব লেখকের লেখার মাধ্যমে যৌবন পেয়েছিলো, হতে পেরেছিল আমাদের দেশের শিক্ষিত-মননশীল মধ্যবিত্তের মুখপাত্র, সেসব লেখকদের পুরোধাদের একজন মাহবুব কামাল। বলা বাহুল্য সময় তাঁকে করেছে আরও শাণিত। ‘জাত নিমের পাতা’ আঘাত করে একেবারে সঠিক জায়গায়, দেখায় একেবারে সঠিক পথ, আর বলা বাহুল্য এসব ক্ষেত্রে কোনো কিছুই কেয়ার করেন না তিনি – কথা বলেন ‘যদি’, ‘কিন্তু’ বাদ দিয়েই। তাই তাঁর কলাম হয়ে ওঠে নিম পাতার মতোই উপকারী – সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য।

মাহবুব কামালকে কি ঈর্ষা করি আমি? করি না। করি না, কারণ ঈর্ষা হয় কাছাকাছি থাকা মানুষের প্রতি। রচনাশৈলীকে তিনি এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যে তিনি আমাদের অনেক বড় বড় কলাম লেখকেরও ধরাছোঁয়ার বাইরে, সেখানে আমি কোন ছার? তাই ‘ঈর্ষণীয়’ শব্দটা আমি ব্যবহার করেছি জাস্ট মানের, উচ্চতার একটা বিশেষণ হিসাবেই।

তাঁর একটা কলামে তিনি লিখেছিলেন, অনেক দোকানে যেমন কিছু ‘বান্ধা কাস্টমার’ থাকে, তেমনি তাঁরও কিছু ‘বান্ধা পাঠক’ আছে। একদম ঠিক কথা, যেমন আমি এবং আরও অনেকে। তাঁর ‘বান্ধা পাঠক’ হওয়া আর না হওয়ার মধ্যে পার্থক্য শুধু তাঁর একটা কলাম পড়া আর না পড়া। একবার পড়লে আমি বাজি ধরে বলতে পারি আপনি তাঁর ‘বান্ধা পাঠক’ হবেনই। বইমেলা থেকে তাঁর ‘জাত নিমের পাতা’ ৩ ও ৪ কিনুন, পড়ুন; আপনি আমার কথার সত্যতার প্রমাণ পাবেনই।

 

বইমেলায় মাহবুব কামাল এর বই:

১. জাত নিমের পাতা ৩ ও ৪: পার্ল প্রকাশনী

২. জাত নিমের পাতা ১: জোনাকি প্রকাশনী

৩. প্রবচনগুচ্ছ: পারিজাত প্রকাশনী