ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

১.

টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী
হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।
২.

ভবণই গহণগম্ভীরা বেগেঁ বাহী
দুআন্তে চিখিল মাঝেঁ ন ঠাহী।
৩.

দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই
রুখের তেন্তুলি কুম্ভীরে খাঅ।

বোঝা গেল ‘বাংলা ভাষা’য় রচিত এই পঙক্তিগুলোর মানে? কেউ কেউ হয়তো বুঝে ফেলেছেন, এগুলো চর্যাপদ থেকে নেয়া। চর্যাপদ এর ভাষা আদতে বাংলা কিনা সেই তর্ক কখনো কখনো হলেও দীর্ঘকাল হয়েছে এই তর্ক শেষ হয়েছে, এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে, চর্যাপদ এর ভাষা বাংলা। এটা বাংলা সাহিত্যের আদিতম নমুনা। হাজার খানেক বছরের বিবর্তনে বাংলা ভাষা আজ কোথায় চলে এসেছে! হাজার বছর বাদ দেই কয়েকশ বছর পরে বাংলাভাষীরা আজকের দিনের বাংলা সম্পর্কে কী ভাববে?

প্রায় শত বছর বেঁচে থেকে আমার দাদি মারা যান ১৯৯৯ সালে। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন তিনি। ছোটবেলায় তাঁর মুখে শোনা একটা শব্দ আমি আমাদের গ্রামের বাড়ির (আক্ষরিক অর্থেই অজপাড়াগাঁ) ‘খাছ নোয়াখাইল্যা’ দের মুখেও শুনিনি। শব্দটা হলো ‘ক্যাবার’। কেউ অনুমান করতে পারছেন শব্দটির মানে? এমনকি ‘নোয়াখাইল্যা’ ভাষা ভালোভাবে জানা কেউ কি জানেন এই শব্দের মানে? এর মানে হলো ‘দরজা’। বহু যুগ ধরেই ওই শব্দ ব্যবহৃত হয় না, পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় ‘দুয়ার’।

কিছুকাল আগে দেশের মন্ত্রিসভার রদবদলের পর তারানা হালিম তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়াটাকে অবনমন বলে মনে করে রীতিমত প্রকাশ্য ক্ষোভ দেখিয়েছিলেন ফেইসবুকে। তারপর ‘প্রাথমিক শোক’ কাটিয়ে উঠে তিনি যে নতুন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে মন দিচ্ছেন সেটা জানান দিলেন এক ফরমান জারি করে – দেশের এফএম রেডিও চ্যানেল গুলোকে ‘শুদ্ধ বাংলা’ ব্যবহার করে অনুষ্ঠান প্রচার করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। রেডিও চ্যানেলের ভাষা বোঝাতে তিনি বহুল প্রচলিত একটা শব্দ ব্যবহার করেছেন – ‘বাংরেজি’। আমাদের অনেকের মতো তিনিও ভীষণ ক্ষুব্ধ ‘বাংরেজি’ নিয়ে। তিনি ‘শুদ্ধ বাংলা’ শব্দ দু’টিও ব্যবহার করেছেন। কাকে বলে ‘শুদ্ধ বাংলা’?

ছোটবেলায় আমরা যখন উৎপত্তিগতভাবে বাংলা শব্দের শ্রেণিবিভাগ পড়তাম তখন খুব অবাক হয়ে দেখতাম, ‘খাঁটি বাংলা’ শব্দের সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। বাংলা ভাষার মূল শব্দসম্ভার এসেছে মূলত সংস্কৃত (তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব) আর বিদেশি ভাষা থেকে। যথেষ্ট খোঁজাখুঁজি করলে ‘খাঁটি বাংলা’ শব্দের যে তালিকা পাওয়া যায় সেটা কমবেশি এমন – ‘ঢেঁকি, ঢোল, কাঁটা, খোঁপা, ডিঙি, কুলা, টোপর, খোকা, খুকি, বাখারি, কড়ি, ঝিঙা, কয়লা, কাকা, খবর, খাতা, কামড়, কলা, গয়লা, চঙ্গ, চাউল, ছাই, ঝাল, ঝোল, ঠাটা, ডাগর, ডাহা, ঢিল, পয়লা, চুলা,আড্ডা, ঝানু, ঝোঁপ, ডাঁসা, ডাব, ডাঙর, খোঁড়া, চোঙা, ছাল, ঢিল, ঝিঙা, মাঠ, মুড়ি, কালা, বউ, চাটাই, খোঁজ, চিংড়ি, কাতলা, ঝিনুক, মেকি, নেড়া, কুলা, ঝাটা, মই, বাদুর, বক, কুকুর, তেঁতুল, গাঁদা, শিকড়, খেয়া, লাঠি, ডাল, কলাকে, ঝাপসা, কচি, ছুটি, ঘুম, দর, গোড়া, ইতি, যাঁতা, চোঙা, খড়, পেট, কুড়ি, দোয়েল, খবর, খোঁচা, গলা, গোড়া, গঞ্জ, ধুতি, নেকা, বোবা’।

এসব ‘খাঁটি বাংলা’ শব্দ আসলেই ‘খাঁটি বাংলা’ কিনা সেই প্রশ্নও যে নেই তা না। আসলে এসব শব্দের অন্য কোনো নিশ্চিত উৎস পাওয়া যায়নি, তাই…..। ভাষা তো আসলেই এরকম। নানা ভাষা থেকে শব্দ নিয়ে, প্রকাশভঙ্গি নিয়ে একটা ভাষা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। সময় যায়, একটা ভাষা তার ব্যবহৃত কিছু শব্দ বাতিল করে, গ্রহণ করে নতুন শব্দ। এই শব্দ গ্রহণ বর্জন সব সময় যে বিকল্প শব্দ থাকা বা না থাকার কারণে হয়, তা নয়; হয় ব্যবহারের আরামের জন্য। ভাষার শব্দ শুধু মনের ভাব প্রকাশ করলেই হয় না, সেটা ব্যবহারে আরাম হয় কিনা, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি শব্দগুলোর ভালো বিকল্প বাংলা শব্দ আছে, যথাক্রমে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু খুব কম ‘খাঁটি বাংলা-প্রেমিক’ এই বাংলা শব্দগুলো বলেন। তেমনি চেয়ার এর বদলে বলেন না কেদারা। এরকম অনেক ভুরি ভুরি উদাহরণ দেয়া যায়। অনেকেই বলবেন ওই শব্দগুলোর উৎপত্তি ইংরেজি থেকে হলেও এগুলো তো এখন বাংলা শব্দ। কথা ঠিক। তাহলে এখন যখন বিকল্প বাংলা শব্দ থাকার পরও একটা ইংরেজি শব্দ বা বাক্যাংশ বাংলায় খুব ব্যবহার করা হয়, তখন সেটাকে কেন আমরা বাংলা বলছি না?

কয়েক বছর আগে নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে অনেকের সাথে নানা বিষয়ে আলাপ করছিলাম। যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ ধান চাষের সাথে যুক্ত, স্বাভাবিকভাবেই তাদের সাথে আলোচনা শুরু করতাম ধানের ফলনের খবর নিয়ে। সে বছর ধানে পোকার আক্রমণ বেশি হবার কারণে ফলন কম হয়েছিলাম। আমি অবাক হয়ে দেখলাম অনেকেই বলছে ‘ধানে এইবার টাবল অইছে’। পরে খেয়াল করে দেখেছিলাম একেবারে অশিক্ষিত মানুষদের মধ্যেও ‘টাবল’ শব্দটার ব্যবহার আছে। এই শব্দটা কি বাংলা নয়? বা নোয়াখাইল্যা শব্দ নয়?

আমরা আজ যখন ‘বাংরেজি’ নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন তখন আরেক নতুন ফেনোমেনোন (আমি ‘প্রপঞ্চ’ বললাম না) আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে – বাংলায় হিন্দি শব্দের প্রবেশ। কিছুদিন আগেই ভারতের হাই কমিশনার স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন বাংলাদেশে হিন্দির উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখেন। হিন্দি ভীষণভাবেই আছে আমাদের সমাজে, থাকবে। তো কি হবে এই প্রবণতার পারিভাষিক নাম? ‘বাংদি’ কিংবা ‘হিংলা’? আজকের বাংলাদেশে অনেক শিশু এবং টিন তাদের ব্যবহৃত বাংলায় হিন্দি ব্যবহার করছে। তো অনেক মানুষ যদি নিয়মিতভাবে ‘নেহি’ (বা অন্য কোনো শব্দ) বলে, তো সেটা কেন বাংলা হবে না? তখনকার কোনো মন্ত্রী (কিংবা প্রতিমন্ত্রী) কি ফরমান জারি করবেন, সবাই যেন ‘বাংদি’ বাদ দিয়ে ‘শুদ্ধ বাংলায়’ কথা বলে?

‘শুদ্ধ ভাষা’ বলে আসলে কিছু নেই। তবে এই ক্ষেত্রে এক ধরণের মান নির্ধারণ করে সেটার সাথে তুলনা করার চেষ্টা সমাজে রয়েছে। আবার ইতিহাস বলে, এসব চর্চা কখনও সাফল্য পায়নি। ভাষা তার আপন গতিতেই তার পথ তৈরি করে নিয়েছে। এই সত্য শুধু বাংলার ক্ষেত্রে না, প্রযোজ্য সব ভাষার ক্ষেত্রেই। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো এই পরিবর্তনগুলোর সাথে নিজকে মানিয়ে নেয়া। অথচ আমরা দেখি এক বহুজাতিক কোম্পানির উদ্যোগে ‘নিখোঁজ শব্দ’ খুঁজে বের করা হচ্ছে। ব্যবহারিক উপযোগিতা হারিয়ে যে কোনো ভাষা অনেক শব্দই বর্জন করে; সেগুলো খুঁজে আনার চেষ্টা করা অকাট মূর্খতা। তথাকথিত ‘ভাষার মাস’কে (ইদানিং আমাদের আবার দিবসে ‘রোচে না’, মাস লাগে) বেচে টাকা কমানোর জন্য এসব ফাজলামো দেখে আমরা ইদানিং কথাও বলি না!

যৌক্তিক প্রশ্ন আসতেই পারে, ভাষার সব পরিবর্তন কি মেনে নিতেই হবে? ভাষা কি শুধুই মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম? এর মধ্যে কি কোনো রাজনীতি নেই? নেই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পরিকল্পনা? আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সেগুলো থেকে জাতিকে রক্ষা করার পথ কোনো সরকারি ফরমান নয়; সেটা কী, সেই আলোচনা হবে আরেকদিন। সরকারি ফরমান জারির পেছনে আসলে আছে অন্য উদ্দেশ্য।

ধর্মকে ব্যক্তির একেবারে নিজস্ব পর্যায়ে না রেখে সেটাকে রাষ্ট্র তার নিজ এখতিয়ারে নিয়ে সেটার অনুশাসন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়াটা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মানদন্ডে চরম ফ্যাসিবাদী আচরণ। আমরা অনেকেই জানি, এই একবিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীতে এটা আছে – ‘নীতি-পুণ্য প্রচার এবং পাপ রোধ’ করার জন্য ধর্মীয় পুলিশ সেই ফ্যাসিবাদী আচরণ করে জনগণের সাথে। কয়েকটি দেশে থাকলেও সৌদি আরবের ধর্মীয় পুলিশ ‘মুতাউইন’ খুব আলোচিত, কুখ্যাত (কিংবা বিখ্যাত)। একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতার চৌহদ্দি কতটা হবে, নাগরিকদের কোনো কোন বিষয়ে রাষ্ট্র ‘নাক গলাতে’ পারবে, কিংবা গলালে সেটার পরিমাণ কতটা এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ডিসকোর্স ছিল স্মরণাতীত কাল থেকেই। এটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে রাষ্ট্রের মতো একটা জাগতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ধর্মতত্ত্ব প্রভাব রাখতে চেয়েছে। এটা মানতেই হবে এই ডিসকোর্স নানাভাবে নানা মাত্রার সংঘাত তৈরি করেছে, কিন্তু এটাই ধাপে ধাপে মানুষকে একটা আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে নিয়ে গেছে।

রাষ্ট্র তার নাগরিকের ওপর ভাষা চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে সংঘটিত আন্দোলনের স্মরণে আমরা আজ ২১ শে ফেব্রুয়ারি পালন করছি। আজ আমাদের সরকার আমাদের ওপরও ‘ভাষা চাপিয়ে’ দিতে চাইছে। সরকার তো খুশি হবে ‘মুতাউইন’ এর আদলে পুলিশ বানিয়ে আমাদের ভাষার শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে। মানি ‘মুতাউইন’ এর কথা বলাটায় এক ধরণের অতিরঞ্জন আছে, কিন্তু সরকার সেটা না করলেও সরকারের এরকম নির্দেশ কি প্রমাণ করে না, রাষ্ট্র আমার এমন কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে যার এখতিয়ার তার নেই? আমরা সমস্বরে এর প্রতিবাদ করছি না তো!

এটুকু বোঝার কাণ্ডজ্ঞান আমার আছে, এফএম রেডিও তে প্রতিমন্ত্রী তারানা’র নির্দেশ আমাদের ওপর পাকিস্তান সরকারের আদেশ এর তুলনায় কিছুই না। কিন্তু এই দুই আদেশের ধরণে আমি সাদৃশ্য দেখি। মাত্রাগত বিশাল পার্থক্য থাকলেও দুই ক্ষেত্রেই সরকার একই আচরণ করছে। মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ঢুকে যাবার প্রবণতাকে ইংরেজিতে বলে ‘টোটালিটারিয়ানিজম’। কারো কারো কাছে এই শব্দ কম পরিচিত মনে হলে জেনে নিন এর কাছাকাছি একটা শব্দ যেটা আমাদের পরিচিত – ‘ফ্যাসিজম’।

আমাদের দেশের সরকারটি একেবারে পুরো মাত্রার একটা টোটালিটারিয়ান সরকার, সেটা বলছি না। তবে অনেক বিপজ্জনক লক্ষণ আছে আমাদের সামনে যেগুলো এই ভীতি তৈরি করে খুব যৌক্তিকভাবেই। আসুন এর বিরুদ্ধে আমাদের সামষ্টিক প্রতিবাদ জারি রাখি। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে (হোক সেটা ‘শুদ্ধ বাংলা’) সরকারের যে কোনো নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করি।