ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

কিছুদিন আগে প্রধান বিচারপতিকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের নৈরাজ্যের কথা লিখতে গিয়ে একবার অন্তত পাকিস্তান হতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম ওই রকম পরিস্থিতিতে অন্তত পাকিস্তান যা করেছিলো, আমরাও সেটা করি। এই দেশে পজিটিভভাবে পাকিস্তানের নাম নেয়া এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার। এমনকি ওই দেশের নাম না নিয়েও বর্তমান সরকারের কোনো বিষয়ে যৌক্তিক সমালোচনা করলেও পাকিস্তান চলে যাবার পরামর্শ পাওয়া যায়। আজও আবার একই ঝুঁকি নিলাম পাকিস্তানের নাম নিয়ে।

কোনো ক্ষেত্রে আমাদের পিছিয়ে থাকার কথা বলতে গিয়ে আমরা যদি ভারতের নাম নেই, তখন এক ভাঙা রেকর্ড বাজানো হয় আমাদের সামনে – ভারতের তো দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য আছে, তার সাথে দীর্ঘদিন  সামরিক শাসনের অধীনে থাকা বাংলাদেশের তুলনা চলে না। এটা বাজে যুক্তি, কেন বাজে সেই আলোচনা আজকের পোস্টে করছি না। বরং আমি ইদানিং নতুন কৌশল নিয়েছি, তুলনা করার ক্ষেত্রে আমি খুঁজে বের করি, তেমন সব দেশকে যেগুলো নানা সূচকে আমাদের দেশের চাইতে অনেক নিচুতে অবস্থান করে।

তিন দিন আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর বিশ্বের দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশিত হয়েছে। এই সূচকটি সম্পর্কে আমরা প্রথম জানতে পারি ১৯৯৬ এর আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছর। সেবারই প্রথম বাংলাদেশ দুর্নীতিতে ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’ এর মুকুট পায়। যা হয় আর কি আমাদের দেশে – ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তখন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করেছিল। তখন বগল বাজিয়েছিলো বিএনপি। আমরা অনেকেই জানি, তাদের কপালে সেই সুখ আর সয়নি – এরপর পর পর চার বছর বাংলাদেশ দুর্নীতির ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’ হলো তাদের শাসনামলে। বলা বাহুল্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কে তেতো লাগা আওয়ামী লীগের কাছে ওদেরকে মিঠা লাগতে শুরু করলো। হওয়া ভবনের খাওয়া প্রমাণ করার জন্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর র‍্যাংকিং তখন আওয়ামী লীগের হাতে এক দুর্দান্ত অস্ত্র। সেই অস্ত্রে ঘায়েল বিএনপি তখন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালকে মনে করছিলো জাতশত্রু।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যথারীতি ক্ষমতাসীন দল, আওয়ামী লীগের শত্রুতে পরিণত হয়েছে।  দুর্নীতির ধারণা সূচক ছাড়াও তারা প্রতি বছর পার্লামেন্ট নিয়ে নানা রকম পরিসংখ্যান (যেমন – কোরাম না থাকার কারণে কতটা সময় নষ্ট হয়েছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি সরকার কতবার গালাগাল করেছিল ইত্যাদি) প্রকাশ করে। আর এসব রিপোর্টের পর প্রতিবছর সরকারি দলের বিষোদগার কেমন হতো সেটা আমাদের অনেকেরই মনে আছে; মনে না থাকলে পড়তে পারেন – লিংক ১, লিংক ২

আজকের বিষয়ের একটু বাইরে চলে গেল, তবে আশা করি এটা ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ হয়ে যায়নি। ফিরে আসা যাক এই বছরের দুর্নীতির ধারণাসূচক রিপোর্টে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ পত্রিকা বলেছে, এবার দুর্নীতির ক্ষেত্রে দুই ধাপ উন্নতি করেছে বাংলাদেশ (গত বছর আমরা ছিলাম ১৪৫ এ আর এই বছর আমাদের অবস্থান ১৪৩)। মানে তুলনামূলকভাবে আমাদের দুর্নীতি কিছুটা কমেছে। কোনো কোনো পত্রিকা এটাও উল্লেখ করেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ শুধুমাত্র আফগানিস্তান এর চাইতে ওপরে আছে, আর সব দেশের দুর্নীতি বাংলাদেশের চাইতে কম।

কৌতুহল নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর এই বছরের রিপোর্টটি দেখলাম। এরপর আরও কিছু কৌতূহল তৈরি হলো, এবং পেছনে গিয়ে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেখলাম। তুলনা করার জন্য বেছে নিলাম পাকিস্তানকে। পাকিস্তান ব্যর্থ রাষ্ট্র কিনা, সেটা তর্কসপেক্ষ ব্যাপার। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যর্থ রাষ্ট্রের মাপকাঠি দিয়ে বিচার করলে এই রাষ্ট্রটিকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলা যাবে না (আগ্রহীরা দেখুন এখানে)। তবে ভারতের এক ধরণের প্রপাগ্যান্ডা আছে পাকিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর। বলা বাহুল্য, এই দেশেও বেশ কিছু মানুষ আছে সেই মন্তব্যের ‘ইকো’ করেন। তাই আমাদের দেশে অনেক ‘শিক্ষিত’ মানুষ পাকিস্তানকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ই মনে করেন। তর্কের খাতিরে সেটাকে সত্যি বলে ধরে নেই (সাবধান থাকুন, এটা আমাদের লজ্জা বাড়াবে)।

গত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মূল অভিযোগ ছিলো দুর্নীতি। তারেক জিয়ার ‘হওয়া ভবন’ একটা সমান্তরাল সরকার কায়েম করে দেশে দুর্নীতিকে এক ধরণের প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনটিতে বিএনপি’র ‘গো-হারা’ হারার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দুর্নীতি।

এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালটিকে আমার আলোচনায় ভিত্তি বছর ধরা হয়েছে। ওই সালে বাংলাদেশ আর পাকিস্তান ছিল ঠিক একই জায়গায় – ১৩৯ তম অবস্থানে। এরপর এই বছর আমরা ১৪৩ তম, আর পাকিস্তান আমাদের চাইতে ২৬ ধাপ ওপরে – ১১৭ তম তারা। এই নয় বছরে পাকিস্তান দুর্নীতি দমনে যথেষ্ট উন্নতি করেছে; আমাদের হয়েছে অবনমন। নীচের ছকটি বছর অনুযায়ী দুই দেশের অবস্থান আমাদের সামনে স্পষ্ট করবে (সব রিপোর্ট এখানে)।

‘বেশি উন্নয়ন, কম গণতন্ত্র’ স্লোগান দিয়ে আমাদের ‘উন্নয়ন’ দেখানোর চেষ্টা করছে সরকার। সরকার যা করছে এগুলো আদৌ উন্নয়ন কিনা, সেটা নিয়ে দ্রুতই বিস্তারিত লিখবো। বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর তথাকথিত উন্নয়ন এর নামে স্রেফ লুটপাট হয়েছে। আমরা এর মধ্যেই জানি, সেতু, সড়ক, রেলপথ, ফ্লাইওভার বানানোর খরচ এই দেশে পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ; আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় তিন/চার গুন। এই লুটের টাকা দেশ ছেড়ে পালায় – গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির রিপোর্ট অনুযায়ী গত দশ বছরে দেশ থেকে ছয় লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছিলো।

‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’ এবার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো দুর্নীতি দমনে আমরা ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ পাকিস্তানের চাইতে অনেক ব্যর্থ। অবশ্য কেউ বলতেই পারেন, আরও অনেক ক্ষেত্রের মতো দুর্নীতিতেও আমরা পাকিস্তানকে বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছি। আমাদের এটা উদযাপন করা উচিত।

পুনশ্চঃ এই সূচকে আমাদের দক্ষিন এশিয়ায় সবচাইতে ভালো অবস্থানে আছে ভুটান। তাদের অবস্থান অবিশ্বাস্য – ২৬! গত দশকে তাদের অবস্থান এর আশপাশেই ছিলো। এই অসাধারণ দেশটির কাছে শুধু এই বিষয়ই না, শেখার আছে জিএনএইচ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস) সহ আরও অনেক কিছু। এটা নিয়েও লিখবার আশা রাখছি ভবিষ্যতে।