ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পরে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, কেউ হয় তার বন্ধু, না হয় শত্রু। মাঝামাঝি কিছু নেই। বুশ এর প্রেতাত্মা আছর করেছে বাংলাদেশের সরকারকে। আপনি হয় সরকারের সব কর্মকান্ড বিনা শর্তে মেনে নেবেন, না হলে আপনি হয়ে যাবেন সরকারের শত্রু, স্বাধীনতাবিরোধীদের দোসর। কারণ সরকারী দলের বিবেচনায় তারাই স্বাধীনতার চেতনার সোল এজেন্ট। তারা তো বটেই, কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী তাদের হয়ে এই ঢোল বাজিয়ে যায় সব সময়।

কথাগুলো আবার মনে পড়লো, কারণ কোটা-সংস্কার নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আলোচনাটা শুরু করতে যাচ্ছি। ঝুঁকিটা কতটা সেটার একটা প্রদর্শনী কাল ‘মহান’ সংসদে হয়ে গেল। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সেখানে কোটা-সংস্কার নিয়ে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “এই রাজাকারের বাচ্চাদের আমরা দেখে নিব”। কোটা-সংস্কার নিয়ে আমি রাস্তার আন্দোলনে নেই, তবে ফেইসবুকে লিখছি, আজ ব্লগে লিখছি, তাই ‘দেখে নেবার’ হুমকি কিছুটা হয়তো আমার প্রতিও প্রযোজ্য। তবে আমার লিখার একটা বক্তব্য আমাকে আন্দোলনকারীদের চাইতেও ‘বেশি’ রাজাকারের বাচ্চা বানিয়ে দিতে পারে। কেন, সেটা বোঝা যাবে একটু পরেই।

এর মধ্যে আমরা প্রায় সবাই জেনে গেছি, বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা, নারী, জেলা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী শ্রেণীতে যথাক্রমে ৩০, ১০, ১০, ৫, ১ শতাংশ কোটা আছে। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কোন কোটাটি নিয়ে সবচাইতে বেশি কথা হওয়া উচিত?

এ পর্যায়ে সংবিধানের একটা অনুচ্ছেদ সম্পর্কে একটু জানা যাক। ২৮ অনুচ্ছেদ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থানের ভিত্তিতে কারো প্রতি কোনো প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সকল নাগরিকের সাম্যের কথা বলে। তবে এই অনুচ্ছেদের একটা অংশের ওপর ভিত্তি করে কোটা কে যৌক্তিকতা দেয়া যায়। সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদটি হুবহু এরকম – “নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।”

নারীর কথা স্পষ্টভাবেই লিখিত আছে এখানে, কিন্তু ‘নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের’ মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী পড়তে পারে, কিন্তু জেলা কোটা এবং মুক্তিযোদ্ধা কোটা কীভাবে থাকতে পারে? কোনো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কি আমরা বলতে পারি মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবার আমাদের দেশের গড়পড়তা মানুষের তুলনায় ‘অনগ্রসর’?

খুব সাদা চোখেই তো দেখা যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংবিধান স্পষ্টভাবেই বিরোধী।

খুব সাধারণ মানের শিক্ষিত মানুষও জানে সংবিধানই একটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। অন্য কোনো আইনের কোনো অংশ যদি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে সেই আইন বাতিল হবে। তাহলে মুক্তিযোদ্ধা কোটা কেন পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাবে না? মুক্তিযোদ্ধা কোটা কিছুটা যদি রাখতেই হয়, তবে সেটার জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে বলেই আমি আমার সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে বুঝি। একটা রাষ্ট্র চলবে সংবিধান আর তার সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন আইন দিয়ে, ভাবাবেগ দিয়ে নয়। জানি এভাবে বলাটা পলিটিক্যাললি কারেক্ট হয় না, তবুও সত্য কথাটা না বলে পারলাম না।

কোটা কেন অনেক কমে যাওয়া উচিত, থাকলেও কোনটা কতটুকু থাকা উচিত এসবের পক্ষে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে আমাদের সমাজে তাই ওদিকটায় যাচ্ছি না। এর পক্ষে সামাজিক জোয়ার এতটাই যে আমাদের দেশের বিবেক এর ভান করা দুই ‘বুদ্ধিজীবী’ (পাব্লিক ইন্টেলেকচুয়াল নন) মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এবং আনিসুজ্জামান পর্যন্ত কোটা সংস্কারের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন। অবশ্য তাঁদের টাইমিং টা দারুন – গত দুই দিনের প্রবল আন্দোলনের চাপে সরকার যখন কোটা পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করার ঘোষণা দিয়েছে, তখনই তাঁদের বিবৃতি। কী চমৎকার ‘কো-ইনসিডেন্স’! যাক, সে অন্য আলোচনা।

এখন প্রশ্ন, কোটা সংস্কার আন্দোলন কি রোগ না উপসর্গ? একটু ভাবলেই আমরা বুঝবো এটা জাস্ট একটা উপসর্গ। সম্পূরক প্রশ্ন, কোটা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন থেকে থাকলেও গত দুই/তিন বছরে এতো আলোচিত হলো কেন? কেনই বা এখন এটা এতো প্রবল আন্দোলনে রূপ নিয়েছে?

কেউ কেউ বলবেন, নির্বাচনের বছরের আন্দোলন সরকারের ওপর বেশি চাপ তৈরি করে। তাহলেও প্রশ্ন আসে এই সরকারের অধীনেই আরেক নির্বাচনের বছর ২০১৪ সালে এই আন্দোলন হয়নি কেন? সরকারি চাকুরীর আকর্ষণ হঠাৎ করে এতটা বেড়ে গেলো কেন? এটা কে বেড়েছে, সেটা কিন্তু নিশ্চিত। ৩৮ তম বিসিএস এ প্রাথমিক আবেদন করেছিল প্রায় ৪ লক্ষ (পদের সংখ্যা ২০২৪), যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। অথচ তার আগের বিসিএস এ ই আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২.৫ লক্ষ।

সরকারি চাকুরীর বেতন হঠাৎ করে বেশ বাড়িয়ে দেয়াটাকে কেউ কেউ একটা কারণ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই দেশে বসবাসকারী একজন মানুষ হিসাবে আমি জানি, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই বেতন বৃদ্ধিতে কারো কিছু আসে যায় না। কারণটা আমরা জানি।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা প্রকৃত কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ। এদেরকে ভাষার মারপ্যাঁচে বেকার বলা হয়নি, কারণ এদের সবাই আইএলও সংজ্ঞা মেনে বেকার নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইএলও এর সংজ্ঞায় বেকারত্ব নির্ধারণ করা একেবারেই অযৌক্তিক, কারণ ওই সংজ্ঞা তৈরি করা হয়েছে সেসব দেশের জন্য যেসব দেশে বেকারদের সরকারি ভাতা দেয়া হয়।

দেখা যাক উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের অবস্থা কেমন। বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট-এর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার। দক্ষিণ এশিয়ায় এর চেয়ে বেশি উচ্চশিক্ষিত বেকার আছেন কেবল আফগানিস্তানে, ৬৫ শতাংশ। এর বাইরে ভারতে এর হার ৩৩ শতাংশ, নেপালে ২০ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বাজারের চাহিদাহীন বিষয়ের শিক্ষা, শিক্ষার নিম্ন মান এসব তো আছেই, সাথে আছে আরও বড় কারণ।

বাংলাদেশে এখন মাথাপিছু আয়, জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে উন্নয়নের ঢোল পেটানো হচ্ছে খুব। ৭ শতাংশ না হলেও ৬ – ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে গত এক দশক। এই পরিমাণ প্রবৃদ্ধির দেশে কেন এতো বেকারত্ব? বিশেষ করে ২০১৪ এর নির্বাচন নামের ফাজলামোটির পর থেকে দেশের ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে। অবশ্য শিল্পায়নের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে অনেকে বিনিয়োগ বাড়ার দাবি করেন। তবে সেটা যে আসলে ওভার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচারের একটা কৌশল সেটা সৎ অর্থনীতিবিদগণ আমাদের জানিয়েছেন।

আসলে দেশের জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি হচ্ছে মূলত সরকারি বিনিয়োগে বড় বড় প্রজেক্ট বানানোর (পড়ুন লুটপাট) ফলে। টাকা খরচ হলেই সেটা জিডিপি তে অবদান রাখে। তবে সেই বিনিয়োগের বিরাট অংশই যেহেতু লোপাট হচ্ছে আর চীন-ভারতের ঋণ যেহেতু সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট (৬৫-৭০ শতাংশ পণ্য ঋণ দানকারী সংস্থা থেকে নেয়ার শর্ত) তাই সেটা প্রত্যাশিত পরিমান কর্মসংস্থান করছে না। তাই আমাদের দেশে এখন যা হচ্ছে সেটাকে অর্থনীতির ভাষায় বলে ‘জবলেস গ্রোথ’।

এবার মিলিয়ে নেয়া যাক। কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন এতটা প্রচন্ড হয়ে ওঠা উপসর্গটির প্রাথমিক রোগ হচ্ছে দেশে ‘জবলেস গ্রোথ’ এর কারণে প্রচণ্ড বেকারত্ব। এর কারণ বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থাহীনতা যেটা ঘটছে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার না থাকার কারণে। হ্যাঁ, জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার না থাকাটাই মূল রোগ। শুধু বেকারত্বই নয় আমাদের রাষ্ট্রের অনেক সমস্যার কারণ এটিই।

ও হ্যাঁ, দেশের অনেক কর্মসংস্থান হলেও কোটা ব্যবস্থাটি স্বাধীনতার খুব গুরুত্বপূর্ণ চেতনা ‘সাম্য’ এর প্রচণ্ড পরিপন্থী। তাই শুধুমাত্র অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ব্যতীত আর সব কোটা বাতিল হওয়া উচিত।