ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

কথ্য প্রবচনে আমরা বলি, ‘গাধা পানি খায় ঘোলা করে’। কোটা-সংস্কার ইস্যুতে ছাত্রদের আন্দোলন এই রকম সর্বব্যাপী হবার আগেই কি রাষ্ট্র তাদের সাথে আলোচনা করে কোটা সংস্কার (বা বাতিল) করতে পারতো না? কিন্তু পরিস্থিতি অনেক ঘোলাটে হয়ে যাবার পর, প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ স্বরে (‘যদিও অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে’ সিদ্ধান্ত নেবার কথা তার) কোটা ব্যবস্থাটিকেই বাতিল ঘোষণা করেছেন।

শুধু এই দেশেই না, পৃথিবীর তাবৎ সব দেশেই যখন বড় আকারের সংগঠিত কিংবা অসংগঠিত কোনো আন্দোলন হয়, তখন সেটা আন্দোলনকারী এবং নাগরিকদের বিভিন্ন শ্রেণির তো বটেই, সরকারেরও নানা দিক উন্মোচন করে। সাম্প্রতিক সময়ে কোটা-সংস্কার আন্দোলন আমাদের দেশের অনেকের অনেক দিক উন্মোচন করেছে।

সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও সবকিছু খুব স্পষ্ট হয়ে যায়নি। কারণ একদিকে তিনি যেমন কোটা পুরো বাতিলের কথা বলেন, আবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সচিবকে পর্যালোচনার কথাও বলেন। এদিকে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার আন্দোলনে সরকারের তিন মন্ত্রী বেশ শক্তভাবে মাঠে নেমেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত না মেনে এসব করার সাহস এই তিন মন্ত্রী কীভাবে পান সেটা খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আর এর পরের  অস্পষ্টতার একটা মোটিভ মোটা দাগে মনে আসতেই পারে। সেটা হচ্ছে উত্তুঙ্গে ওঠা ছাত্র আন্দোলনকে স্বল্পমেয়াদে ‘ঠাণ্ডা’ করা, যেন দীর্ঘমেয়াদে এই আন্দোলনকে ‘হিমশীতল’ করে ফেলার পদক্ষেপ নেয়া যায়। আমরা মনে রাখবো, এর মধ্যেই বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে  আমরা জানতে পেরেছি, কোটা বাতিল করার প্রজ্ঞাপন জারি করার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি নেই, কারণ এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্দেশনা যায়নি।

সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণার সাথে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে আরও বলেছেন, “আর এই ভিসির বাড়ি কারা ভেঙেছে, লুটপাট কারা করেছে, লুটের মাল কোথায় আছে, কার কাছে আছে, ছাত্রদেরই তা খুঁজে বের করে দিতে হবে।”

ছাত্ররা যখন স্পষ্টভাবে জানায়, এই ঘটনার সাথে তারা কোনোভাবেই জড়িত নয়, ভিসি এবং সেখানে উপস্থিত অন্য এক শিক্ষক যখন বলেন সেখানে ‘মুখোশধারী’ বহিরাগতরা হামলা করেছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী কী করে লুটের মাল ছাত্রদের বের করে দিতে বলেন? তিনি কি প্রকারান্তরে আন্দোলনকারীদেরই দায়ি করছেন না?

তার এই বক্তব্যের পরদিনই শাহবাগ থানায় চারটি মামলা হয়। ভিসির প্রাণনাশের চেষ্টা, বাড়ি ভাঙচুর, পুলিশের ওপর হামলা, মোটরসাইকেল পোড়ানো, সরকারি কাজে বাধা দান ইত্যাদি অভিযোগে মামলাগুলো হয়েছে যেগুলোতে ‘অজ্ঞাতনামা বিপুলসংখ্যক’ আন্দোলনকারীকে আসামি করা হয়েছে। পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি এমন মামলার উদ্দেশ্যই থাকে মানুষকে হয়রানি করা। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর আক্রমনাত্মক বক্তব্যের পর যৌক্তিকভাবেই অনুমান করা যায়, এই মামলা দিয়ে বহু আন্দোলনকারীকে হয়রানি করা হবে।

স্বাভাবিকভাবেই আন্দোলনকারীরা এই সব মামলার প্রত্যাহার চেয়েছেন এবং দুই দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন। এরপর সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির তিন যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান, নুরুল হক ও ফারুক হোসেনকে তাদের ভাষায় ‘চোখ বেঁধে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তোলে’ ডিবি পুলিশ।

তারা আরও বলেন, “আমাদের যখন তুলে নেওয়া হয়, তখন আমাদের সঙ্গে থাকা কয়েকজন বিষয়টি দেখে ফেলেছিল। বিষয়টি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়াতে নিউজ হওয়ার ঘটনায় তারা তোপের মুখে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। না হলে হয়তো আজ আমরা পৃথিবীর আলো আর দেখতে পেতাম না।”

শুধু তাই নয় এদের একজন রাশেদ খান জানান, তাদের তুলে নেয়ার সাথে সাথে ঝিনাইদহে তার বাবাকে থানায় তুলে নিয়ে অকথ্য গালিগালাজ করে এই স্বীকৃতি আদায় করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, তিনি জামাত করেন, আর তার সন্তান শিবির করে।

এবারের আন্দোলন যখন অনেকটা তীব্র হয়ে উঠে তখন প্রথম দিন শাহবাগের জমায়েতে পুলিশ হামলা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পালিয়ে গিয়ে আন্দোলনকারীরা যখন টিএসসিতে যায়, তখন তারা পিটুনি খায় ছাত্রলীগের হাতে। এরপর ঘটলো গতকালের ঘটনা। খুব যৌক্তিকভাবেই অনুমান করি, সরকার এরপর আরো আগ্রাসীভাবে এই আন্দোলন দমন করবে এবং আন্দোলনে সামনে থাকা মুখগুলোকে নানাভাবে হয়রানি করবে।

সরকারের নানা গোয়েন্দা সংস্থা আছে, কয়েক মাস আগেই যখন কোটা-সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, তখন তারা সরকারকে নিশ্চয়ই জানিয়েছিল এই আন্দোলনে অসংখ্য সাধারণ ছাত্রের সমর্থন আছে। প্রশ্ন হলো, সরকার কেন তখন প্রাথমিক অবস্থায় আলোচনার মাধ্যমে একটা সমঝোতায় না গিয়ে উল্টো বল প্রয়োগের পথে গেলো?

নির্বাচনের আগেই যখন সরকার গঠনের জন্য আবশ্যক ১৫১ জনের বেশি (১৫৩ জন) সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়ে যান, তখন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যা হয়েছে সেটা প্রহসনের চাইতে বেশি কিছু না। এভাবে সরকার গঠিত হওয়া সংবিধানের ৭(১), ১১ এবং ৬৫(২) ধারার সাথে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। এই ধারাগুলোতে রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়ে নির্বাচন বলতে নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচনকে বোঝানো হয়েছে। তাই এই সরকারটি অবৈধ সরকার।

জনভিত্তিহীন অথোরিটারিয়ান সরকার টিকেই থাকে মানুষের মনে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে। ভীতিটাই তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি হিসাবে কাজ করে। এই ভীতি কেটে যাওয়া মানেই ক্ষমতায় থাকার মূল চাবিটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। মানুষ যদি এটা বুঝে যায় যে, পরাক্রমশালী সরকারটির বাহিনী এবং দলীয় পাণ্ডাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা যায় এবং তাতে দাবি আদায় করা যায় তাহলে সেটা আরও অনেককে অনেক সাহসী করে তুলতেই পারে। এটা সরকারের ভিত্তিমূল ধরেই টান দিতে পারে।

বিশেষ করে ২০১৪ সালের পরের সরকারটির ক্ষেত্রে আমরা দেখবো তারা নাগরিকদের সাথে খুব একটা আলাপ-আলোচনায় যায়নি, বরং সবকিছু বল প্রয়োগ করার মাধ্যমেই সমাধান করেছে। বল প্রয়োগ করে যতবারই সরকার সফল হয়, ততবারই তার ক্ষমতার ভিত্তি শক্ত হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সরকার যথেষ্ট সফলই ছিলো। বাতাসে কান পাতলে আমরা আশপাশেই ফিসফাস শুনবো – ‘এই সরকারকে কি কেউ সরাতে পারবে?’, ‘নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ জোর করেই প্রায় সব আসন নিয়ে নেবে’ ইত্যাদি।

এই আলোচনা চারদিকে আছে যে, এবার সরকার ২০১৪ সালের মতো ফাঁকা মাঠ পাচ্ছে না। এমনকি যে দেশটি প্রকাশ্যে ২০১৪ সালের সরকারটিকে টিকে যেতে শতভাগ সমর্থন দিয়েছিল, সেটিও আগের মতো ‘ব্ল্যাংক চেক’ দিচ্ছে না বর্তমান সরকারকে। নির্বাচনের বছরে এর মধ্যেই প্রধান বিরোধী দল নানাভাবে মাঠে নামার চেষ্টা করছে। আমাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘মাঠ দখলে রাখা’ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রবল পরাক্রমশালী সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামা যায় এবং সরকারের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করে দাবিও আদায় করা যায় – এমন ‘ভুল’ বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছুক সেটা সরকার কোনোভাবেই চাইবে না।

সাত বছর আগের ঘটনা, আমাদের স্মৃতিতে আছে সম্ভবত এখনও। তিউনিসিয়ায় মোহাম্মদ বোয়াজিজি নামের এক রাস্তায় ফল বিক্রেতাকে পুলিশের বাধা দেয়া, তার মালামাল থানায় নিয়ে যাওয়া, এরপর সেটা ফেরৎ না পেয়ে বোয়াজিজির নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করা। এরপর রাস্তায় নেমে আসে সর্বস্তরের জনগণ। বলা বাহুল্য, সবাই রাস্তায় ফল বিক্রি করতে বাধাপ্রাপ্ত হকার নয়। পতন ঘটে পরাক্রমশালী বেন আলী সরকারের।

বাংলাদেশকে আরেকটি তিউনিসিয়া হয়ে ওঠা থেকে ‘রক্ষা করার’ একমাত্র উপায় হচ্ছে রাস্তায় জমায়েত হতে না দেয়া, মানুষকে সাহস সঞ্চয় করতে না দেয়া। তাই সরকার তার দিক থেকে একেবারে সঠিক পদক্ষেপটিই নিচ্ছে- স্বল্প মেয়াদে পিটিয়েছে ছাত্রদের, আর মধ্য মেয়াদে হবে আইনি হয়রানি। সেটার আলামত গতকাল তিন জনকে ধরে নিয়ে যাওয়ায় দেখা গেছে, সাথে এর আওতা অনেক বাড়তে যাচ্ছে।

প্রশ্ন আসতেই পারে, সরকার কি অনেক বেশি ঝুঁকি নিচ্ছে না? উত্তর হলো, নিচ্ছে। হতেই পারে, এই আন্দোলন কোনো এক সময় সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেবে। তবে এই ঝুঁকি নেয়া ছাড়া সরকারের কোনো উপায়ও নেই। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ যখন যেনতেন উপায়ে সরকারে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই নির্ধারিত হয়ে যায় সরকারকে এমন অতি উচ্চ ঝুঁকির খেলায় নামতে হবে। খেলায় জিতলে অনেক বড় প্রাপ্তি, আর হারলে হারানোর পরিমাণও ভীষণ।