ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

‘সেলেব্রিটি’ হয়ে ওঠার মতো সব শর্তই তো পূর্ণ ছিল রোজিনার, কিন্তু সে হলো না। যে কারণে রাজীব ‘সেলেব্রিটি’ হলো, ঠিক একই কারণগুলো তো রোজিনার ক্ষেত্রেও ছিল, তবুও সে কেন হলো না সেটা? বাসের চাপায় পা হারানোর খবর মিডিয়ায় এসেছিল নয় দিন আগেই। আজ ওর মৃত্যুর সংবাদ এলো। দুজনের ‘চিত্রনাট্য’ প্রায় পুরোটা মিলে গেলেও, রোজিনা সেই অর্থে ‘সেলেব্রিটি’ হয়ে উঠলো না!

রাজীবের ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে এখনও তাজা। দুই বাসের মধ্যে চাপা পড়ে তার হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, আর শেষ পর্যন্ত ওর মারা যাওয়া, সবকিছুই এখনও আমাদের মনে আছে। দুর্ঘটনার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কখনো আংশিক, আবার কখনো পুরো অজ্ঞান রাজীব টের পায়নি সে কতোটা আলোচিত মানুষ হয়ে গেছে।

 

সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো রোজিনা মারা যায় গতকাল (২৯ এপ্রিল)

রাজীবকে দেখতে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন, এমনকি তাকে চাকুরি দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পুরো ফেসবুক তখন একেবারে মেতে ছিল রাজীব আর বাসের গায়ে তার হাতের ছবি দিয়ে। এটা বহুগুণ বেড়ে যায় তার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর। আমরা একেকজন ঝাঁপিয়ে পড়ি রাজীবের হাত আর তার মৃত্যুকে সৃজনশীলভাবে মেটাফোর হিসাবে ব্যবহার করে এই রাষ্ট্র আর সমাজকে তুলোধুনো করার কাজে। সামাজিক মাধ্যমে আমজনতা তো বটেই, ‘তারকা’ কলামিস্ট, টক শো’র আলোচকরাও নানা আবেগী আলোচনায় মেতে ওঠেন রাজীবের হাত আর তার মৃত্যুকে নিয়ে।

এভাবেই হাত হারানোর এবং মৃত্যুর পর রাজীব তার অজান্তেই একজন ‘সেলেব্রিটি’ হয়ে ওঠে। রাজীবের মৃত্যুর পর আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একজন ‘নায়ক’ অনন্ত জলিল ঘোষণা দেন, রাজীবের দুই ভাইয়ের দায়িত্ব নেবেন তিনি। শুধু তাই নয় দুই ভাইকে তার বাসায় এনে ‘ফটোসেশন’ করে ছবিও দেন ফেইসবুকে, যেটা পরে মূলধারার মিডিয়ায়ও আসে (বিস্তারিত পড়ুন)। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেননও জানান তার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার রাজীবের দুই ভাইয়ের দায়িত্ব নেবে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই তাদের এসব পদক্ষেপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন।

পরের অংশে যাবার আগে একটা পরিসংখ্যান জানা যাক- ২০১৭ সালে এই দেশে গড়ে প্রতিদিন ২১ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। এখন সংখ্যাটা আরো বেশি হবারই কথা। এসব নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথা খুব একটা নেই। কয়েক বছর আগে অবশ্য আমরা সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বেশ আলোচনা করেছিলাম, কারণ তখন একজন বিখ্যাত মানুষ তারেক মাসুদ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন।

সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু সামর্থ্যবান মানুষই মারা যায় বা বিকলাঙ্গ হয় না, অনেক হতদরিদ্র মানুষও এর শিকার হয়। কিছু বাস ভাড়া বাঁচাতে গিয়ে ট্রাকের মালের উপরে বসে বাড়ি যাবার সময় ট্রাক উল্টে বস্তায় চাপা পড়ে মানুষের মৃত্যুর খবর আমরা নিয়মিত পাই। বলাবাহুল্য, পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে হতদরিদ্র মানুষগুলো আক্ষরিক অর্থেই পানিতে পড়ে যায়। এদের কারো পরিবারের দায়িত্ব তো নিতে শুনি না একজন অনন্ত জলিল বা সরকারের কোনো মন্ত্রীকে।

আসলে আমরা, শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা রাজীবের প্রতি আমাদের আবেগের ফোয়ারা ছুটিয়ে তাকে যেহেতু মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছি, তাই রাজীবের পরিবারের দায়িত্ব নেবার কথা বলে সেই মনোযোগের আলোর কিছুটা নিজের গায়েও টেনে নিতে চাইতেই পারেন যে কেউ। সত্যিকারের মানবিক মানুষ আর মানবিকতার ভেক ধরা মানুষের পার্থক্য যেহেতু বেশিরভাগ মানুষই করতে পারে না, তাই এসব মানুষ মোটাদাগে প্রশংসিতও হয়ে থাকেন।

রাজীবের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রায় একই রকম রোজিনার ঘটনা আমাদের সামনে এলো। রোজিনাকে মন্ত্রী দেখতে যাননি, চাকরি দেবার কথা বলেননি। রোজিনার পরিবারকে সাহায্য করার কথা বলেননি কোনো ফিল্মস্টার বা মন্ত্রী। কারণ, আমরা ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্তরা রোজিনাকে নিয়ে রাজীবের মতো মেতে উঠিনি ফেইসবুকে কিংবা মূলধারার মিডিয়ায়। মানুষের মনোযোগ পেয়ে ‘পণ্য’ হয়ে উঠতে পারে না যে ঘটনা, সেটাকে ভিত্তি করে কারো পক্ষে মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টায় কাজ না হবারই কথা। তাই ‘এটেনশন সিকার’গণ রোজিনার ক্ষেত্রে চুপ। প্রশ্ন হলো, একই রকম ঘটনা হওয়া সত্ত্বেও রোজিনার জীবনের মর্মান্তিকতা শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে তেমন একটা স্পর্শ করল না কেন?

মন দিয়ে পত্রিকা পড়লে আমরা নিয়মিতই দেখতাম নির্যাতন করে শিশু হত্যা আমাদের সমাজে হামেশাই ঘটেছে। নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী শিশুদের মৃত্যুর সংবাদ ছোটবেলা থেকেই পত্রিকায় নিয়মিত দেখেছি। একেবারে শিশু বাচ্চাকে ধর্ষণ করে হত্যার খবরও পত্রিকায় খুব নিয়মিতভাবে আসে। এসব মৃত্যু আমাদের গা-সওয়া হলেও আমরা আবেগে, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলাম রাজন নামের শিশুটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনায়। এটা আমাদের সহজাত আবেগ নয়, এই আবেগ তৈরি হয়েছিল রাজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ভিডিওটি দেখে।

আত্মকেন্দ্রিকতার এমন পর্যায়ে আমরা নেমে গেছি যে, কোনো জানা তথ্য আমাদের আবেগকে স্পর্শ করে না। কোনো কিছু দেখলে আমাদের ‘আবেগ’ জাগ্রত হয়। রাজীবের কাটা হাতের ছবি আমাদের ‘আবেগ’ জাগিয়েছে, তাই তার মৃত্যু আমাদের আবেগাপ্লুত করে। রোজিনার বিচ্ছিন্ন পা এর কোনো ছবি আমাদের সামনে আসেনি আমাদের আবেগকে উস্কে দিতে।

হাইপোথেটিক্যাললি ধরে নেই রোজিনার বিচ্ছিন্ন পা এর ছবি আছে, তাহলে কি রোজিনা রাজীবের মতো মনোযোগ পেতো? বিচ্ছিন্ন পায়ের ছবি রোজিনাকে আরও বেশি মনোযোগ পাইয়ে দিতো, কিন্তু সেটা রাজীবকে নিয়ে যা হয়েছে সেটার তুলনায় তেমন কিছুই হতো না, এটা বোঝা যায় সহজেই।

রাজন এর ঘটনার পরপরই আরেকটা ঘটনা নিয়ে আমরা আবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। হ্যাঁ, রাকিবের ঘটনার কথা বলছি। ভিডিও না থাকলেও একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা আমাদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। পায়ুপথে কম্প্রেসড বাতাস ঢুকিয়ে রাকিবকে মেরে ফেলা হয়। রাকিবের ঘটনার পর ঠিক একইভাবে আরও অন্তত চারটি শিশুকে মেরে ফেলার খবর মিডিয়ায় এসেছে, কিন্তু আমরা আর আবেগাপ্লুত হইনি। এটা প্রমাণ করে একই রকম ঘটনাও একবারের পরে আমাদের মনোযোগ আর আকর্ষণ করে না। একটা ঘটনায় অনেক ‘আবেগ’ প্রকাশ করে আমরা হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এজন্যই বলেছিলাম, রোজিনার বিচ্ছিন্ন পায়ের ছবি থাকলেও আমরা রাজীবের ঘটনার মতো আর আলোড়িত হতাম ‘না’।

আবার কখনো একেবারে ভিন্ন ধরনের অবিশ্বাস্য কোনো বর্বরতা আমাদের ‘আবেগ’কে হয়তো আবার জাগাবে, আর আমরা সেটা নিয়ে তুমুল আলোচনা করে ভুক্তভোগী মানুষটিকে মনোযোগের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসবো। আর তখনই কোনো ফিল্মস্টার, শিল্পপতি বা মন্ত্রী আমাদের সামনে ‘মানুষ’ হয়ে উঠবেন, আর আমরা হাততালি দেবো মুগ্ধ হয়ে।