ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

শুরুর দিকে যেমন হতো, এখন আবার সেই আলোচনা আমাদের সমাজে শুরু হয়েছে – বিনা বিচারে হত্যাকান্ড ‘জায়েজ’, নাকি ‘না-জায়েজ’। উপলক্ষ্য ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ স্লোগান দিয়ে ধরে ধরে মানুষকে খুনের চলমান উৎসব। ২৪ মে এই লিখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত খুনের শিকার মানুষের (ওদেরকে সরকার মানুষ মনে করে তো?) সংখ্যা ৫০। রাত পোহালেই এই সংখ্যার সাথে যুক্ত হবে আরও ১০ জনের মতো মানুষ।

নানা আলোচনা হচ্ছে এসব নিয়ে – এভাবে মানুষ খুন করাটা আদৌ কতটা ফলপ্রসূ হবে, ফলপ্রসূ হলেও সেটা করা যৌক্তিক কিনা, একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের ‘চুনোপুঁটি’ মাদক ব্যবসায়ীরাই শুধু কেন খুনের টার্গেট, রাঘব বোয়ালরা (বিশেষ করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকার প্রথম নাম, এমপি বদি) ধরা ছোঁয়ার বাইরে কেন থাকছে, মাদক নিয়ন্ত্রনে সরকারের আন্তরিকতা আছে, নাকি নেই ইত্যাদি।

এই হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে আলোচনায় আমাদের দেশের সনাতন মিডিয়ার সাম্প্রতিক চরিত্র আমাদের সামনে আবার যেভাবে উন্মোচিত হলো, মূল আলোচনায় যাবার আগে সেটা নিয়ে কয়েকটি কথা বলা যাক। মিডিয়ায় যেসব বিশ্লেষণ এসেছে সেখানে প্রায় সবাইকে বলতে দেখেছি তাঁরা মনে করেন সরকারের উদেশ্য সৎ/মহৎ, কিন্তু প্রক্রিয়াটি বেআইনি। মানে তাঁদের কথা ঠিক হলে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে সরকার সত্যিই চাইছে দেশকে মাদকমুক্ত করতে। আসলেই কি তাই?

আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে সরকার একটা ‘সর্বাত্মক’ মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য কি সৎ? মাদক নিয়ে সরকারের ঘুম ভাঙলো হঠাৎ ই। মনে হচ্ছে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই সারা দেশ মাদকে (বিশেষতঃ ইয়াবায়) ছেয়ে গেছে। সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর তার অধীনস্ত বাহিনীগুলো হঠাৎ ই সেটা জানতে পারলো এবং নেমেছে যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে। অথচ এই রাষ্ট্রের নাগরিকরা খুব ভালো করেই জানেন একটা পুরো প্রজন্ম কীভাবে ইয়াবার নেশায় ঢুকে গেছে বহু বছর আগেই। শহর-মফস্বল-গ্রামের আনাচে কানাচে ইয়াবা-গাঁজা কতোটা সহজলভ্য সেটা বছরের পর বছর এই রাষ্ট্রের নাগরিকরা জানতো, কিন্তু জানতোনা নানা গোয়েন্দা সংস্থা থাকা সরকার, এটা বিশ্বাস করতে হবে আমাদের?

তাহলে কেন এই তথাকথিত অভিযান? এটা নির্বাচনের বছর। এবার আরেকটা ২০১৪ সালের ৫ ই জানুয়ারির নির্বাচন হচ্ছে না, এটা প্রায় নিশ্চিত। তাই সরকার জনমতের কিছুটা হলেও তোয়াক্কা না করে পারছে না। তাই দেশের খুব বড় একটা সমস্যা, মাদক নিয়ে সরকার খুব সিরিয়াস হয়েছে, এটা দেখাতে চাইছে। তাই তো মূল হোতাদের বাদ দিয়ে একেবারে চুনোপুঁটি কিছু মানুষকে খুন করে মাদক নিয়ন্ত্রণের ভেক ধরা হচ্ছে। আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি এটা তৃতীয় শ্রেণীর একটা পলিটিক্যাল স্টান্ট এর বেশি কিছু না। এই যুক্তিতেই বলা যায় নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্য কোনো সেক্টরে এই ধরণের স্টান্ট আরও আসবে অচিরেই।

এবার আসা যাক আমার এই পোস্টের মূল বক্তব্যে। এবারকার এই হত্যাকান্ডগুলো আমাদের অনেকের বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড বিরোধী মানসিকতাকে সামনে এনেছে। আমাদের অনেকেরই ‘বিবেক’ জেগেছে। তবে কি আমরা ভাবছিলাম, ক্রসফায়ার/এনকাউন্টার/বন্দুকযুদ্ধের নামে ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করার বর্বর চর্চা সাম্প্রতিককালে হচ্ছিল না? বা খুব কম হচ্ছিল?

বেশি অতীতে না ই বা গেলাম, এই বছরের আলোচনাতেই থাকি। এই বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ, এই তিন মাসে বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ৪৬ জন। মানে গড়ে প্রতি দুই দিনে একজন মানুষ খুন হয়েছে। এবার আসুন আমাদের ‘বিবেক’ জাগ্রত হবার আগের মাস এপ্রিলে। এই মাসে খুন হয়েছেন ২৮ জন মানুষ – গড়ে প্রতিদিন একজন ।

শুরু হবার পর থেকে একদিনের জন্যও বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারিনি। তাই ফেইসবুকে নিয়মিতই লিখি এর বিরুদ্ধে। একই সাথে খেয়াল রাখি আমার ফ্রেন্ড লিস্টের আর কেউ এটা নিয়ে লিখে কিনা। গত বেশ কয়েক মাসেও এমন কোনো স্ট্যাটাস আমার চোখে পড়েনি। অথচ এবারকার ঘটনা নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়নি, এই সংখ্যাটা বরং খুব কম।

সাধারণ মানুষদের বাদ দিয়ে এবার একটু ‘অসাধারণ’ প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকাই। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবারকার হত্যাকান্ডগুলো নিয়ে বেশ সোচ্চার। তৃতীয় দিনের পর, যখন ১৮ জন মানুষ খুন হয়, তখন তারা এর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে শুরু করে । আমরা স্মরণ রাখবো, বেশ কিছুদিন থেকেই আইন ও সালিশ কেন্দ্র বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্চ করছিলো না। অথচ এই আইন ও সালিশ কেন্দ্র বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকেই এর বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার ছিল; একটা মানবাধিকার সংগঠনের সেটাই হবার কথা অবশ্য।

কী মানবাধিকার সংগঠন, কী ফেইসবুকীয় ‘সচেতন’ মানুষ, কী আমজনতা সবাই দেখছি বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের প্রতি অসংবেদনশীল হয়ে পড়েছেন। এবারকার ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ প্রথম দিকে দিনে চার-পাঁচ জন আর এখন দিনে ৯-১০ খুন হবার পর আমাদের ‘বিবেক’ জাগ্রত হয়ে গেল? এতে কি আমরা সরকারকে গড়ে দিনে একটি-দু’টি করে বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের লাইসেন্স দিচ্ছি?

এই সীমার মধ্যে থাকলে আমরা আর শোরগোল করবো না? নিয়মিত দেখে যদি গড়ে দুই দিনে একটা বা দিনে একটা হত্যাকাণ্ড আমাদের গা-সওয়া হয়ে যায়, তখন নিয়মিত দেখে দিনে পাঁচ-দশটা হত্যাকাণ্ড কি আমাদের গা-সওয়া হয়ে যাবে না? তখন কি আমাদের ‘বিবেক’ জাগ্রত হবার জন্য দিনে ২০-২৫ জনকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হবে? এরপর আরও বেশি?

বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে পূর্বে লিখা একাধিক লিখায় আমি বলেছি প্রতিটা হত্যাকাণ্ড মূলত আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাটির প্রতিই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। রাষ্ট্রের বিচার করার ক্ষমতা আর নাগরিকের সুবিচার পাবার অধিকার (এতে যদি তার মৃত্যুদণ্ডও হয়) রাষ্ট্র ব্যবস্থার একেবারেই ব্যাসিক বিষয়। বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড এই বিষয়টিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। তাই দিনে দশটা বা দিনে একটা কিংবা বছরে একটা হত্যাকাণ্ড হয়তো মৃত মানুষের সংখ্যার হেরফের করে, কিন্তু বছরে একটিমাত্র হত্যাকাণ্ডও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্নের প্রাবল্যের কোনো হেরফের করে না।

বদি কি ইয়াবার সর্বোচ্চ হোতা? হাজার হাজার কোটি টাকার ইয়াবা ব্যবসার মূল সুফলভোগী কি বদি? গুলি খেয়ে মরা চুনোপুঁটিদের তুলনায় বদি হয়তো রাঘব বোয়াল, কিন্তু আমি তো মনে করি এইসব ব্যবসার মূল সুফলভোগীদের তুলনায় বদিই বরং চুনোপুঁটি। এই কুখ্যাত বদি কিংবা তারও অনেক ওপরের অজানা (কিংবা জানা, কিন্তু না জানার ভান করা) গডফাদারদের কাউকেও কোনোদিন সুবহে সাদেকের সময় অস্ত্র উদ্ধারে নিয়ে গিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণের দাবি তো করবোই না, বরং সেটা করা হলেও (জানি হবে না সেটা) তার বিরুদ্ধে আজকের মতোই প্রতিবাদ করবো।