ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে মারা ইদানিং বার বার মিডিয়ার শিরোনাম হচ্ছে। দুই মাস আগে ঢাকার আমিনবাজারে ছয় ছাত্রকে ‘পিটিয়ে মারা’ হল। মাসখানেক আগে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জেও ‘পিটিয়ে মারা’ হল ছয় জনকে। দু’টি ঘটনায় উল্রেখযোগ্য ব্যাপার হল ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি। আমিনবাজারের ঐ ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একজনের জবানবন্দিতে এটা স্পষ্ট যে সেই ঘটনার পুরোটা সময় জুড়ে পুলিশ উপস্থিত ছিল। কোম্পানীগঞ্জের ঘটনা তো আরো বীভৎস – মিলন নামের এক কিশোরকে পুলিশই জনতার হাতে তুলে দেয় ‘পিটিয়ে মারা’র জন্য।

এই দুইটি ঘটনার পর খেয়াল করলাম – আমাদের প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রিনিক মিডিয়ায় আমিনবাজারের ঘটনাটি অনেক বেশী প্রচার পেল, কারন এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণিত যে ওই ছয় জন ঢাকার বিভিন্ন কলেজের ছাত্র ছিল, ডাকাত নয় (শুরুতেও এটা বোঝা গিয়েছিল, আর কিছুদিন আগে বিচারবিভাগীয় তদন্তেও এটা প্রমাণিত হয়েছে)। সে দিন তারা আমিনবাজারে গিয়েছিল বেড়াতে এবং সম্ভবত নেশা করতে। নিরপরাধ ছাত্রদের পিটিয়ে মারা আমাদের বিবেককে বেশ নাড়া দেয়। এ সময়টায় গভীর মনযোগ অনেকগুলো পত্রিকা পড়েছি, টিভির খবর, টক শো দেখেছি – কথা বলেছি অনেক পরিচিতজনদের সাথে। ভীষণ অবাক হয়ে খেয়াল করলাম প্রায় সব জায়গায় প্রায় সবাই এটা বলতে চাইছেন যে এভাবে নিরীহ ছাত্রদের ‘পিটিয়ে মারা’ অত্যন্ত অমানবিক হয়েছে। নিহতদের স্বজন, সহপাঠী, এমনকি টক শোতে আসা বোদ্ধারা (২/১ জন ব্যতিক্রম ছাড়া) প্রত্যেকেই এটা প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন যে ঐ গণপিটুনিতে নিহতরা ডাকাত ছিল না, এবং বলছেন ‘ডাকাত নয়’ মানুষকে এভাবে ‘পিটিয়ে মারা’ কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এমনকি আমিনবাজারের ঘটনাটির বিচারবিভাগীয় তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পরও পত্রিকাগুলো আবারো জোর গলায় বলতে শুরু করল যে আমিনবাজারে নিরীহ ছাত্রদের ‘পিটিয়ে মারা’ হয়েছে – ওরা ডাকাত ছিল না।

কোম্পানীগঞ্জের ঘটনার মিলনকে নিয়েও অনেক কথা হয়েছে, কারণ সে ‘ডাকাত নয়’ এবং তাকে মারা হয়েছে পুলিশের সহায়তায়। ঐ একই দিনই কোম্পানীগঞ্জের আরো কয়েকটি জায়গায় আরও পাঁচ জনকে ‘পিটিয়ে মারা’ হয়েছে, কিন্তু তাদেরকে নিয়ে কোন উচ্চবাচ্চ হয়নি, কারণ তারা সম্ভবত ‘সত্যি সত্যি ডাকাত’ই ছিল।

ভীষণ আবাক হয়েছি এটা দেখে যে এই ঘটনাগুলোর পর্যালোচনায় আসল কথাটা কেন কেউ বলছে না? কেন কেউ জোর গলায় বলছে না যে, ওরা সব যদি ভয়ঙ্কর ডাকাতও হয়ে থাকে তবে কি ওদের পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে? কই কেউ তো এই প্রশ্ন তুলল না। তবে কি আমাদের সমাজ, আমাদের বিবেক, আমাদের নৈতিকতা এটা মেনে নিয়েছে যে ডাকাত, ছিনতাইকারী বা অন্য অপরাধীদেরকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যাবে?

চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারী ধরা পড়লে তাদের গণপিটুনি দেয়া আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। আমার মনে পড়ে খুব ছোটবেলায় নানাবাড়িতে মামা আমাকে নিয়ে ডাকাত পেটানো দেখতে গিয়েছিলেন। আমার স্মৃতিশক্তি ভাল না – অনেক বেশী বয়সের ঘটনাও আমার মনে নেই। কিন্তু খুব ছোটবেলায় দেখা ঐ ডাকাত পেটানোর দৃশ্য আমার স্মৃতিতে একদম জীবন্ত। ঐ হতভাগা মানুষগুলোর রক্তাক্ত, থেঁতলে যাওয়া মুখ, শরীর, আর পৈশাচিক আনন্দে পেটানোর উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের নৃশংস মুখ আমি আজও ভুলিনি, ভুলব না কোনদিনও। আর এক বার তো ঢাকার এক মসজিদের সামনে মসজিদ থেকে স্যান্ডেল চুরি করা এক কিশোর চোরকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও মার খেতে বসেছিলাম। শুধু একজোড়া স্যান্ডেল চুরির অপরাধে সদ্য নামাজ পড়ে বেরিয়ে আসা মুসল্লীরা কী ভয়ঙ্করভাবে একজন ১৪/১৫ বছরের কিশোরকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করতে পারে সেটা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না।

সমাজের মধ্যে ঘটে যাওয়া খুব বড় কোন নৃশংসতা, বীভৎসতা অনেক সময়ই সেগুলো নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগ করে দেয় – সেসব নৃশংসতা, বীভৎসতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখায়। নৃশংস গণপিটুনির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের সমাজে নীচের প্রশ্নগুলো অনিবার্যভাবেই তুলে দিতে পারত –

একজন চোর, ডাকাত বা ছিনতাইকারী যদি হাতেনাতে ধরাও পড়ে তাকে কি পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়? ডাকাতি বা ছিনতাই এর শাস্তি কি মৃত্যুদন্ড? এমনকি যে অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদন্ড (যেমন হত্যা) সেই অপরাধীকেও কি পিটিয়ে মেরে ফেলা জায়েজ? মেরে না ফেলে ভয়ঙ্কর পিটুনি দিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করা যাবে? একজন অপরাধী, সে যত ভয়ঙ্করই হোক না কেন সে কি এই রাষ্ট্রের নাগরিক নয়? তার কি রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার পাবার অধিকার নেই? অপরাধীর কি মানবাধীকার নেই? যারা গণপিটুনি দিয়ে মানুষকে হত্যা বা আহত করে তাদের কি আইনের আওতায় আনা হবে না? তাদের কি কোন শাস্তি এই রাষ্ট্র দেবে না?

আরও কিছুদিন আগে ফিরে যাই। ক্রসফায়ারের নামে এখন পর্যন্ত বহু অপরাধী (মানুষ) নিহত হলেও সরকার ফেঁসে গেল ‘লিমন’ নামে এক তরুণের পা হারানোর ঘটনায়। কারণ? লিমন অপরাধী ছিল না। আমি অবশ্যই এটা বলতে চাইছি না যে অপরাধীদের ক্রসফায়ার নিয়ে আমাদের সমাজে কথা হয় না – হয়, তবে খুব দায়সারা গোছের। কিন্তু লিমনের ঘটনায় ভিত কেঁপে উঠল পুরো সরকারযন্ত্রের। আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে লিমন যদি নিরপরাধ না হয়ে যদি হত ভয়ঙ্কর কোন অপরাধী তাহলে কিন্তু ঐ একটা পা হারানোর ঘটনা নিয়ে কোন আলোচনাই হত না।

দেশে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা অনেক সময়ই নানা মানবাধিকার লংঘন এর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, বক্তব্য দেয়। কিন্তু এই ‘ডাকাত’ দের পক্ষে নেই কোন মানবাধিকার সংস্থা। লিমনের শয্যাপাশে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। কিন্তু গণপিটুনিতে নিহত কোন ‘সত্যিসত্যি ডাকাত’ এর বাড়িতে গিয়ে চোখের পানি ফেলা তো দূরের কথা, আমাদের মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান গণপিটুনিতে হত্যার বিরুদ্ধে দু’টো কথা বলেন না, হত্যাকারীদের বিচারও চান না। কেনই বা করবেন? মানবাধিকার সংস্থাগুলো তো কাজ করে মানুষের অধিকার রক্ষা করা নিয়ে – কিন্তু ওরা তো মানুষ নয়, ওরা ‘ডাকাত’।