ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

এই লিখার এই রকম শিরোনাম দেবার জন্য আমি দুঃখিত। শুরুতেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সেই দুজন মানুষের কাছে যাদের নাম এই শিরোনামে ব্যবহার করা হয়েছে। আর সবার মতই আমিও বরেন্য চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং এ টি এন নিউজ এর সি ই ও মিশুক মুনিরের মৃত্যুতে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। তেমনি কষ্ট পেয়েছি কিছুদিন আগে বর্বর স্বামীর নির্যাতনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষিকা রুমানা মঞ্জুর এর চিরতরে অন্ধ হয়ে যাওয়া দেখে। প্রশ্ন উঠতে পারে তারপরও এই লিখার এরকম শিরোনাম দিলাম কেন?

RUMANA-MONZUR+2

 

পুরনো ঘটনাটা নিয়ে আগে শুরু করি। কয়েক মাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষিকা রুমানা মঞ্জুর বর্বর স্বামীর নির্যাতনে মারাত্মকভাবে আহত হন। দেশে বিদেশে চিকিৎসা করেও তিনি চিরজীবনের মত অন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে পারেননি। সেই সময় ঘটনাটি হয়ে উঠেছিল ‘টক অফ দা কান্ট্রি’। পত্রপত্রিকা, টিভির খবরে তিনি, টক শো তে তিনি, চায়ের আড্ডায় তিনি। সাধারন মানুষ মানবনন্ধন করেছে, মানবনন্ধন করেছেন আমাদের সব নারী এম পি। হাইকোর্ট এ রুল হল, আমাদের ‘অথর্ব’ পুলিশও হঠাৎ মহা করিৎকর্মা হয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় খুঁজে বের করে সেই বর্বর মানুষটিকে (রুমানা মঞ্জুরের স্বামী)। কত সংবেদনশীল জাতি আমরা!! সাবাস!!

আমি ভেবেছি ভিন্ন কথা। স্বামীর হাতে নির্যাতন তো এই দেশে মোটেও নতুন কোন ঘটনা না – বরং এটা আমাদের ভালই গা সওয়া হয়ে গেছে। তাহলে রুমানা মঞ্জুরকে নিয়ে কেন এত মাতামাতি? এত সংবেদনশীলতা? কই প্রতিদিন সারা দেশে ঘটে যাওয়া এরকম, বা এর চাইতে অনেক বেশী মর্মান্তিক বর্বরতা তো বড় খবর হয় না। কোথায় যায় তখন আমাদের এত সংবেদনশীলতা?

স্বামীর হাতে স্ত্রীর নির্যাতন এই দেশের ইতিহাসের সমান প্রাচীন। আমার জীবনে আমি অসংখ্যবার এমন রিপোর্ট পত্রিকায় পড়েছি যে – নানা কারনে স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হয়েছেন, বিকলাঙ্গ হয়েছেন, এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। কেউ এক দিন কষ্ট করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যান – দেখতে পাবেন অজস্র নারী স্বামীর ছোঁড়া এসিডে অন্ধ তো হয়েছেনই, সাথে ‘বোনাস’ আছে ভয়ঙ্করভাবে বিকৃত মুখ আর শরীর। কই এসব তো বড় খবর হয় না, হলেও আমাদের সংবেদনশীলতা জেগে ওঠে না!

কিন্তু রুমানা মঞ্জুরের ক্ষেত্রে আমরা জেগে উঠলাম ভীষণভাবে। কেন? তিনি ধনী পরিবারের সন্তান তাই? তিনি উচ্চ শিক্ষিত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব ভাল একটা বিষয়ের শিক্ষিকা তাই? নাকি তিনি সুন্দরী তাই? (অবাক শোনালেও সত্য যে, আমার পরিচিত দুইজনকে এই বলে আক্ষেপ করতে শুনেছি যে – আহারে ওই পাষণ্ড লোকটা এত সুন্দর মুখটাকে এভাবে বিকৃত করে দিল!)।

এবার আসি তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনিরের প্রসঙ্গে। ভীষণ গুণী এই দুই জন মানুষের মৃত্যুও আমাদের আরেকবার কাঁপিয়ে দিয়ে যায় ভীষণভাবে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই শোকে আপ্লুত হয়। অবহেলাজনিত সড়ক দুর্ঘটনাকে ‘হত্যা’ দাবী করে মানুষ ফুঁসে ওঠে, প্রতিবাদ করে ওই ‘হত্যাকাণ্ডের’। এই ঘটনার সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল – আমাদের বুদ্ধিজিবী, শিল্পসাহিত্য আর সংস্কৃতির মানুষদের ‘অসাধারণ প্রতিবাদী’ হয়ে ওঠা। টিভি কামেরার সামনে সবার শোকের মধ্যেও ছাপিয়ে উঠল যোগাযোগ মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবী। আবারো মিডিয়ায় অনেক খবর, অনেক আলোচনা, অনেক প্রতিবাদ, অনেক ধিক্কার। সারাদেশে মানব বন্ধন হল, এমনকি ঈদের দিন শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচী হল। সরকার নড়েচড়ে বসলো, পদক্ষেপ নেয়া হল সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য। ক্রমাগত চাপের মুখে আমাদের ‘বেচারা’ যোগাযোগ মন্ত্রী ঈদের শপিং বাদ দিয়ে সরেজমিনে ভাঙ্গা রাস্তা ঠিক করার তদারকি করলেন।

সড়ক দুর্ঘটনা কি এই দেশে খুব কম হয়? সরকারি পরিসংখ্যানেই দেখা যায় গত দশ বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে প্রায় ৩০,০০০ জন, আর আহত হয়েছে এর কয়েক গুন (প্রকৃত সংখ্যাটা নিশ্চয়ই এর চাইতে অনেক বেশি হবে)। অর্থাৎ প্রতি দিন গড়ে প্রায় ১০ জন মানুষ মারা যায়। ‘মজার’ ব্যাপার হল এই সংখ্যাগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না, জাগিয়ে তোলে না। আমাদের কাছে অগুলো ‘নিছকই কতগুলো সংখ্যা, পরিসংখ্যান’। তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনিরের সাথে একি দুর্ঘটনায় আরও তিন জন মানুষ মারা গিয়েছিল, কিন্তু তাদের কথা কেউ বলেনি কারন তারা বিখ্যাত ছিলেন না। এই ঘটনার কিছুদিন আগে মীরশরাই এ শুধুমাত্র একটি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩ জন কিশোরের মৃত্যুতে বড় খবর হল কিন্তু আমাদের বুদ্ধিজিবী, শিল্পসাহিত্য আর সংস্কৃতির মানুষ, বা সাধারণ মানুষ কেউ ‘অসাধারণ প্রতিবাদী’ হয়ে রাস্তায় নামলেন না, সরকারের ও ঘুম ভাঙ্গল না। কারণ? এরা দরিদ্র, এবং এরা ‘বিখ্যাত কেউ’ নয়।

অথচ তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনির তো এক দিক থেকে অনেক ভাগ্যবান – তারা যেহেতু ধনী পরিবারের মানুষ, তাদের মৃত্যুতে তাদের পরিবার আর যাই হউক ‘পথে বসে’ যাবে না। তারেক আর মিশুকের সন্তানরা বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে, কিন্তু জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু পেয়ে যাবে না চাইতেই। আর খবর নিলেই দেখব ওই দরিদ্র মানুষ গুলোর অকালমৃত্যুতে ‘পথে বসে’ যায় একটা পুরো পরিবার। প্রিয়জন হারাবার দুঃখ কি করবে, সামনের দিনগুলোতে না খেয়ে থাকার কষ্টই প্রধান চিন্তা হয়ে দাঁড়ায়।

আসুন, এবার সবাই সাহস করে নিজেদের দিকে তাকাই। আমরা কি দেখতে পাচ্ছি না যে আমাদের বিবেক নামের বস্তুটা পচে গেছে – আমার বিবেক, আপনার বিবেক, সাধারন মানুষের বিবেক, ‘অসাধারন’ মানুষের বিবেক, বিখ্যাতদের বিবেক, ধার্মিকদের বিবেক, অধার্মিকদের বিবেক, ‘বিবেকের সবক’ যারা দেয় তাদের বিবেক? শুধু ধনীদের, বিখ্যাতদের, ‘স্টার’ দের কষ্ট/মৃত্যু দেখলেই আমরা কাতর হই, সংবেদনশীল হই, প্রতিবাদী হই। আর মেনে নেই যে অকালে মরে যাওয়া, অত্যাচারিত হওয়াই গরিবের নিয়তি। তবে কি চারদিকের পুঁজিবাদের জোয়ারে আমাদের বিবেক ও হয়ে উঠেছে ‘পুঁজিবাদী’?

এ পর্যায়ে কি মনে মনে হাসলেন, বিরক্ত হলেন এটা ভেবে যে এই মাত্র ‘বাংলা সিনেমার ডায়লগ’ পড়লেন?

‘বাংলা সিনেমার ডায়লগ’ মনে হলেও স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে দিন আমরা সব জীবনকে সমান মূল্যবান মনে করব, যে দিন সব মানুষের ওপর অন্যায় আমাদেরকে সমানভাবে স্পর্শ করবে, প্রতিবাদী করবে সেই দিনই সমাজ থেকে এসব অন্যায় দূর হবে। আর সেটা যদি না হয় তবে আমি চেয়েই যাব যেন আরো অনেক বিখ্যাত মানুষ অপঘাতে মারা যাক, নির্যাতিত হোক। কারন আজ এটা এই সমাজে, এই দেশে স্পষ্ট যে আমাদের নোংরা ‘পুঁজিবাদী বিবেককে’ জাগাতে হলে, রাষ্ট্র, সরকারকে জাগাতে হলে বিখ্যাত, ধনী, শিক্ষিত মানুষকে মরতে এবং নির্যাতিত হতে হয়।