ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

 

ব্লগে লিখতে শুরু করেছি বেশী দিন হয় না, এক মাসের মত হবে। কাছের ২/১ জন ব্লগার নানা বিষয়ে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে আলচনার সময় অনুরোধ করতো ব্লগে লিখতে। ব্লগে না লিখতে চাওয়া নিয়ে বলতাম (কিছুটা ব্যাঙ্গ করেই), কী হবে লিখে? কী হয় লিখে? বলতাম, ব্লগার হিসাবে পরিচিতি হয়, খ্যাতিও হয় হয়তো খানিকটা – ওসব আমি চাই না।

লিখতে শুরু করে এবং অন্য পোস্টগুলোর লিখা, মন্তব্য পড়তে পড়তে এখন ভাবি, কত ভুল ছিলাম আমি! ব্লগগুলো অন্য কিছু না হোক মানুষের মধ্যে দারুন সচেতনতা তৈরি করছে। নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব আর বিতর্কে মানুষরা জানছে, শিখছে পরস্পরের কাছে। ইদানিং বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে কিছু মত পার্থক্য থাকা এই মানুষগুলো একদিন একত্রিত হবেই, এবং আমাদের পচে যাওয়া সমাজটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলবে।

আমার এই এক মাসের অভিজ্ঞতায় একটা ব্যাপার নিয়েই আমার খারাপ লাগা আছে, সেটা হল আমি দেখছি ব্লগ এর অনেক লিখাতে এবং মন্তব্যের মধ্যে আমরা খুব অসহনশীলতা দেখাই। গত ২ দিন এই ব্লগে সৌদিআরবে ৮ বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ নিয়ে আলোচনার সময় দেখলাম অনেকেই অনেকের মতের ব্যাপারে ভীষণ অসহনশীলতা দেখাচ্ছেন। কিছু দিন আগে এই ব্লগের একটা ধর্ম বিষয়ক একটা লিখায় আমার মন্তব্য নিয়ে অনেক কিছু হয়ে গেল – ভয়ঙ্কর সব বিশেষনে আমাকে ভূষিত করা হল। ২ দিন আগেও আমার একটা লিখাতে একজন মন্তব্যকারী তো থুতুও দিয়েছেন। এমনকি আমার লিখায় আসন্তুষ্ট হয়ে কেউ গালাগালও করতে পারেন, আমি কিছু মনে করবো না। কারন আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি যে কোন লিখায় যদি কারো মনে হয় লেখককে বাক্তিগতভাবে আক্রমন করবেন, সেই অধিকারও তার আছে। তবে আমি চাইব আমরা বাক্তিগতভাবে আক্রমন না করে বক্তব্যের গঠনমূলক করবো। কারন আমি দেখছি অনেক ক্ষেত্রেই অনেকেই বাক্তিগতভাবে আক্রমনের প্রত্যুত্তরে আরও ভয়ঙ্করভাবে বাক্তিগতভাবে আক্রমন করছেন এবং এক পর্যায়ে ওটা আর যৌক্তিক বিতর্কের পর্যায়ে না থেকে নিছক খগড়াঝাটিতে পরিনত হচ্ছে।

আমার সবচেয়ে বেশী মন খারাপ হয়েছে অন্য একটা কারণে — দেখছি কোন কোন পোস্টের মন্তব্যকারী ব্লগ কতৃপক্ষের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছেন এবং দাবী করছেন যেন এই ধরনের লিখা যেন আর না প্রকাশ করা হয়। এটা কেমন কথা হল? আমরা কেন চাইব কোন ভিন্নমত (সেটা আমার চোখে যতই হাস্যকর বা অযৌক্তিক হোক না কেন) প্রকাশিত হবে না? বরং এটা কি চাওয়া উচিত না যে আমি ওই মত যৌক্তিকভাবে খণ্ডন করে মন্তব্য দেব যাতে যিনি লিখেছেন তিনি এবং পাঠক সেই লিখার অসারতা বোঝেন। বরং আমি ব্লগ কতৃপক্ষকে দৃঢ়ভাবে অনুরোধ করব তারা যেন সব ধরনের, সব বিষয়ের, সব মতের লিখা প্রকাশ করেন। এমনকি প্রকাশ করেন সব ধরনের মন্তব্যও – মডারেশন ছাড়াই। এই দেশে এই অস্থির সময়ে ব্লগগুলো হয়ে থাকুক মানুষের মুক্তভাবে নিঃশ্বাস ফেলার স্থান হয়ে।

এই ব্লগের অনেক লিখা, অনেক মন্তব্য আমার কাছে অযৌক্তিক, এমনকি কোন কোন লিখা হাস্যকরও মনে হয়েছে, কিন্তু আমিতো চাই না যে ওই ধরনের লিখা প্রকাশিত না হউক। এমনকি আমি এই ব্লগের সঞ্চালক হলেও এসব লিখা অবশ্যই প্রকাশ করতাম।

একটা সুস্থ, সুন্দর সমাজে সব বিতর্কিত ব্যাপার নিয়েও আলচনার অধিকার থাকা উচিত – হউক সেটা ধর্ম, নারীর অবস্থান, রাজনীতি, সমাজ বা কোন নতুন দার্শনিক চিন্তা। এক্ষেত্রে বক্তা বা লেখক কেমন ভাষা ব্যবহার করবেন সেটা একান্তই তার বাক্তিগত অভিরুচি। সমাজের খুব ক্ষুদ্র একটা অংশের মতকেও হেলাফেলা করা উচিত নয়। কোন মতের যদি টিকে থাকার মত শক্তি, যুক্তি না থাকে তবে সেটা যৌক্তিক আলোচনায়, সমালোচনায়, বিতর্কে বাতিল হয়েই যাবে। কিন্তু ওই মতের গলা টিপে ধরার চিন্তা অত্যন্ত অযৌক্তিক, অমানবিক, এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির অধিকার পরিপন্থি। আবার এটা মনে করে রাখার কিছু নেই যে কোন মতের কতজন অনুসারী আছে সেটা দিয়ে মতের শক্তি নির্ণীত হবে। শক্তি থাকলেই যদি ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করা যায় তাহলে তো এই সরকার চরম বিতর্কিত ‘সম্প্রচার নীতিমালা’ করে গনমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চেয়ে অপরাধ করছে না। এই ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা সবাই একত্র হয়ে একে বর্বর আইন বলে এটাকে বাতিল করতে বলছি। তাহলে ব্লগে যে কোন মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে না কেন? কারো ইচ্ছে হলে পড়বে, ইচ্ছে হলে পড়বে না, ইচ্ছে হলে প্রশংসা করে মন্তব্য করবে, ইচ্ছে হলে সমালোচনা করবে বা উগ্র আক্রমন করবে, ইচ্ছে হলে সেই মতামত গ্রহন করবে, ইচ্ছে হলে সেই মতামত তাচ্ছিল্যের সাথে প্রত্যাখ্যান করবে। সব স্বাধীনতাই তো আছে এখানে। কেউ তো কাউকে জোর করে কোন লিখা পড়াচ্ছে না, বা মন্তব্য করাচ্ছে না।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সেই বিখ্যাত উক্তিটি দিয়ে শেষ করছি – “তোমার মতের সাথে আমি একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার সেই মত প্রকাশের অধিকারের জন্য আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত”।
আমরা কি হতে পারি না এমন?