ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

৩ দিন আগে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার ওয়াংচুকের বিয়ে নিয়ে মিডিয়ায় খুব মাতামাতি হল, সেগুলো পড়েছি/দেখেছি কি আমরা? পরিচিত অনেকের মুখে রাজার নিজের এবং তার নবপরিণীতা স্ত্রীর দারুণ সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনেছি (দুজনই আসলেই অনেক সুন্দর)। শুনেছি বিয়ের জাঁকজমকের কথা। অনেকে চোখ কপালে তুলে বলছে ‘উনি অক্সফোর্ড শিক্ষিত’! মিডিয়া মাতামাতি করছে এগুলো নিয়েই, কারণ আমরা এসব ‘রাবিশ’ অনেক বেশী ‘খাই’। অথচ মাত্র ৩১ বছর বয়সের এই মানুষটি কেন এই পৃথিবীর কাছে গুরুত্বপূর্ন, কেন এই একজন ওয়াংচুকের সামনে তাবৎ পৃথিবীর প্রায় সব দেশের শাসক মানুষ হিসাবে অনেক ছোট মাপের সেই কথা জানি কয়জন? সেই আলোচনায় আসছি একটু পরে।

অবাক হচ্ছেন ওয়াংচুকের সাথে তারেক জিয়া আর সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম দেখে? কেন, এখন আসছি সেই কথায়। আসলে যতবারই শ্রদ্ধায় ওয়াংচুকের নাম মনে আসে ততোবারই এই দুই জনের নামও আমার মনে পড়ে যায় ঠিক উল্টো কারণে।

এই দেশ রাজতন্ত্রের দেশ নয় – তথাকথিত ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। তথাকথিত ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ বলেছি এজন্য যে আমাদের দুই মাননীয়া নেত্রী কি এটাকে গণপ্রজাতন্ত্র রেখেছেন? গনতন্ত্রের একটা মুখোশ ছাড়া কি পার্থক্য আছে রাজতন্ত্রের সাথে? ২ রাজবংশ পালা করে শাসন করে যাবে এই দেশ – এটা যেন আমাদের নয়তিই হয়ে গেছে। ২ নেত্রী বৃদ্ধ হয়েছেন, তাই ভবিষ্যতে রাজত্ব করার জন্য প্রস্তুত করছেন দুই রাজপুত্রকে। এক রাজপুত্র গত সরকারের সময় এই দেশে থেকে কি করেছিল সেটা আমরা ভুলে যাইনি এখনো, আর আরেক রাজপুত্র বিদেশে থেকেই অনেক কিছুরই কলকাঠি নাড়ছেন বলেই শোনা যায়। এই দুই রাজপুত্রই যে ভবিষ্যতে আমাদেরকে পালা করে শাসন (না শোষন?) করে যাবেন, এই দেশকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে যাচ্ছে তাই করে যাবেন তাতে আর সন্দেহ কি? শুধু এই দেশের নামটাই পরিবর্তিত হয়ে ‘কিংডম অফ বাংলাদেশ’ হয়ে যাবে না হয়তো।

এবার আসি রাজা জিগমে খেসার ওয়াংচুকের কথায়। ওয়াংচুক বংশের ৫ম রাজা তিনি (৫ম ড্রাগন রাজা)। তিনি তো বটেই, তাঁর পূর্বসূরী সব রাজাও অত্যন্ত প্রজাবাৎসল্যের সাথে রাজ্য শাসন করেছিলেন। সুখে-শান্তিতে বসবাস করে ভূটানের মানুষেরা তাদের রাজাদেরকে দেবতাজ্ঞান করেছে বরাবরই। চাইলে জিগমে খেসার ওয়াংচুকও তার রাজ্য শাসন করে যেতে পারতেন আমৃত্যু। কিন্তু তিনি তো তারেক/জয় নন, তিনি গেলেন ভিন্ন পথে। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না যে তিনি সাংবিধানিক রাজা, যার কোন নির্বাহী ক্ষমতা নেই (নির্বাহী ক্ষমতা এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে)। তবে তিনি সেটা করেছেন একদমই নিজের ইচ্ছায়।

রাজার ওপর কোন চাপ দূরে থাকুক, দেশে কারো প্রত্যাশাও ছিল না যে দেশে গনতন্ত্র চালু করতে হবে। তাই রাজা দেশে গনতন্ত্র চালু করতে চান এটা শুনে সাধারন মানুষ মেনে নেয়নি, তারা চেয়েছিল তাদের অসাধারণ রাজাই তাদের দেখাশোনা করুক। কিন্তু রাজা ভাবলেন ভিন্ন কথা – রাজা যত ভালই হউক না কেন, রাজতন্ত্র কখনো কোন সভ্য দেশের শাসনপদ্ধতি হতে পারেনা। তাই তিনি দীর্ঘ সময় সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন তার বাবাকে সাথে নিয়ে, সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে কথা বলেছেন, বুঝিয়েছেন গনতন্ত্র কী এবং গনতন্ত্র কেন দরকার। ভুটানের এমন প্রত্যন্ত এলাকা আছে যেখানে কোন যান্ত্রিক যানবাহন যায় না, সেসব এলাকাতেও তিনি ঘোড়া, গাধার পিঠে চড়ে মানুষের কাছে গেছেন একি উদ্দেশ্যে। তারপর ২০০৮ সালে ভুটানের প্রথম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেখানে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে ইনিই সম্ভবত একমাত্র রাজা যিনি বাধ্য না হয়ে বা কোন রকম চাপের মুখোমুখি না হয়ে, স্বেচ্ছায় দেশকে গনতান্ত্রিক করেছেন।

ভুটান আরেকটা কারনে পৃথিবীতে আলোচিত হচ্ছে, সেটা হল এই দেশের সরকার শুধু দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিই না সাথে সাথে জনগনের মনের শান্তিও পরিমাপ করে। তারা বিশ্বাস করেন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নতি মানুষকে সুখী করে না। তাই জি এন পি (গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাক্ট) এর সাথে তারা পরিমাপ করেন জি এন এইচ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস)। জনগণ কতোটা সুখে আছে প্রতি বছর তারা সেটা পরিমাপ করে দেখেন, এবং কোন সমস্যা পেলে তা নিয়ে তাৎক্ষনিক ব্যাবস্থা নেন। জিগমে খেসার ওয়াংচুকের বাবা জিগমে সিংঘে ওয়াংচুক প্রথম এটা চালু করেন, আর এখন তা খেসার ওয়াংচুক আরো ভালভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। খেসার ওয়াংচুক এটাকে আন্তর্জাতিকভাবেও পরিচিত করেছেন। শুনলে অনেকেই অবাক হবেন, কিছুদিন আগে স্বয়ং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী একটা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিদল ভূটানে পাঠিয়েছিলেন জি এন এইচ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস) সম্পর্কে ধারনা নেয়ার জন্য, কারন তারাও ভাবছেন এটা তাদের দেশেও চালু করা যায় কিনা। তার আরো অনেক কল্যাণকর কাজ আছে, লিখা আর দীর্ঘ করতে চাইছিনা বলে আর উল্লেখ করছিনা।

এবার কি মনে হচ্ছে না, মাত্র ৩১ বছরের এই তরুনের কাছে তাবৎ পৃথিবীর প্রায় সব দেশের শাসক মানুষ হিসাবে অনেক ছোট মাপের? আসুন সবাই অসীম সন্মান জানাই এই রাজাকে, আর ঠিক ততোটাই ঘৃণা আমাদের ২ রাজপুত্রকে (হবু রাজা)।