ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

হুমায়ূন আহমেদ ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসা নিচ্ছেন আমেরিকায়। কিছু দিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমেরিকা সফরকালে তাঁকে দেখতে যান এবং দশ হাজার ডলার অনুদান দেন। তাঁকে দেখতে যাওয়া প্রশংসনীয়, কিন্তু অনুদান দেয়া নিয়ে আমার কিছু ভিন্নমত আছে। লিখার শুরুতেই বলে নেই, ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদের প্রতি আমার কোন বিরাগ নেই। বরং আমার একটা বয়সে তাঁর উপন্যাস, নাটক অসাধারন বিনোদন দিয়েছিল। আমার উদ্দেশ্য হুমায়ূন আহমেদের এই ঘটনাটা পর্যালোচনা করে আমাদের চিন্তার অত্যন্ত বড় একটা ভুল নিয়ে আলোকপাত করা।

কয়েক মাস আগে তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনিরের সাথে আহত চিত্রশিল্পী ঢালী আল মামুনের থাইল্যান্ডে চিকিৎসার খরচের অনেকটাই সরকার বহন করেছে। মনে করলেই দেখবেন এর আগেও অনেক বিখ্যাত মানুষদের জন্য সরকার এমন অনেক আর্থিক অনুদান দিয়েছে। যদি প্রশ্ন করা হয় এই অর্থসাহায্য কেন? জানি অনেকেই কতগুলো মুখস্ত উত্তর দিয়ে দেবেন, যেগুলো ছোট বেলা থেকে আমাদের চারপাশ আমাদেরকে শিখিয়ে দেয়। উত্তরগুলো আমিও জানি, সবাই জানে, তাই আর পুনরুল্লেখ করছি না।

হুমায়ূন আহমেদ কে? অর্থনীতির বিচারে তিনি নেহায়েতই আর দশটি পন্য বিক্রেতার মতোই একজন বিক্রেতা, যিনি বিক্রি করেন তাঁর উপন্যাস, নাটক, সিনেমা – আমরা সেটা কিনে উপভোগ করি, যেমন আমরা কিনি ইলিশ মাছ, বা রসগোল্লা। তাঁর পন্য তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে, তাই অনেক দামে বিক্রিও হয়েছে। এবং তার ফলাফল তিনি পেয়ে গেছেন হাতে হাতেই – অঢেল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন তিনি। সাথে তো অসম্ভব জনপ্রিয়তা, পরিচিতিও পেয়েছেন, যেটা সব শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সঙ্গীতের মানুষ টাকার সাথে ‘ফাও’ পান। একটা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকই কিছু না কিছু বিক্রি করছেনই – কেউ পন্য, আর কেউ সেবা। এবং যারা এই পন্য বা সেবাগুলো কিনছেন এগুলো তাদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে। তাহলে রাষ্ট্র কেন কিছু বিখ্যাত (এবং ধনী) মানুষের জন্য আলাদা করে ভাববে? তবে হ্যাঁ, এর মধ্যেও কেউ যদি কখনো কোন আর্থিক বিনিময়/বৈষয়িক লাভ ছাড়াই সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে থাকেন (নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান) তবে তাকে নিয়ে রাষ্ট্রের হয়তো আলাদাভাবে ভাবার দরকার আছে। হুমায়ূন আহমেদেরই ছোট ভাই জাফর ইকবালের কথা এক্ষেত্রে বলা যায়। তিনিও উপন্যাস বিক্রেতা (এর জন্য কোন বাড়তি কদর তাকে রাষ্ট্রের করা উচিত না), কিন্তু এই মানুষটি বিনিময়/বৈষয়িক লাভ ছাড়াই বহু সামাজিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই রাষ্ট্রকে আরেকটু বাসযোগ্য করে যেতে। আমার মতে এমন ক্ষেত্রে রাষ্ট্র হয়তো কারো প্রতি বেশী মনযোগী হতে পারে।

অনেকের কাছেই ভয়ঙ্কর স্পর্ধা মনে হতে পারে, তারপরও বলে ফেলছি — এই ব্লগেই যারা দীর্ঘ সময় ধরে লিখালিখি করে (আর্থিক বিনিময়/বৈষয়িক লাভ ছাড়াই) মানুষের চেতনার পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাদের স্বাস্থ্যগত বা অন্য কোন সমস্যায় তারা রাষ্ট্রের মনযোগ হুমায়ূন আহমেদের চাইতেও বেশী দাবী করেন।

হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত ধনী একজন মানুষ। তাকে আর্থিক সাহায্য দেয়া কি ‘তেলা মাথায় তেল’ দেয়া হয়ে গেল না? এই ‘তেলা মাথায় তেল’ দিলেন এমন এক দেশের প্রধানমন্ত্রী যে দেশের বেশীরভাগ মানুষের ন্যুনতম স্বাস্থ্যসেবা দূরেই থাকুক, অর্ধেকের বেশী মানুষ দিনে তিন বেলা পেটপুরেও খেতে পারে না। কেউ একজন কোন একটা সরকারী হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখুন মাত্র ৫/১০ হাজার টাকার অভাবে কত মানুষ সহজে নিরাময়যোগ্য রোগে মারা যায়, বা পঙ্গু হয়ে যায়। বরং এই মানুষগুলো রাষ্ট্রের সম্পদের সবচাইতে বেশী দাবীদার। কিন্তু না, এই অমানবিক রাষ্ট্রে এটা হয় না, এই রাষ্ট্রে ‘জন্মই ওদের আজন্ম পাপ’।

আচ্ছা আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি এসব বোঝেন না? তিনি কি বোকা? না, তিনি সব জানেন, বোঝেন – বরং তিনি জানেন যে জনগনই বোকা, ভীষন বোকা। আর সব ঝানু রাজনীতিবিদদের মতোই এটা তাঁর অজানা নয় যে, জনগণ কী ‘খায়’। তিনি এটা ভাল করেই জানেন যে হুমায়ূন আহমেদ আর্থিক অনুদান দেয়াটা এই দেশে তাঁর অগণিত ভক্তকে আহ্লাদে আটখানা করেছে। অনেকে নিশ্চয়ই মনে মনে ধন্য ধন্য করেছেন – কী মহানুভব আমাদের প্রধানমন্ত্রী! মজার ব্যাপার আমাদের ঔপন্যাসিক মহোদয়ও কিন্তু এই অনুদান ফিরিয়ে দিয়ে বলতে পারতেন এই টাকা গরীব মানুষের চিকিৎসায় খরচ করতে, কিন্তু তিনি সেটা করলেন না। কেউ আবার ভাববেন না যে আমি শুধু এই প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনাই করছি, এই চর্চা সব সময়ই ছিল, আগের প্রধানমন্ত্রীও এসব সস্তা বাহবা পাওয়ার কাজ করেছেন। কিন্তু সময় এসেছে দেশের নাগরিক হিসাবে, করদাতা হিসাবে আমাদের সবারএই হিসেব চাওয়ার যে, আমাদের করের টাকা কোথায়, কীভাবে খরচ হচ্ছে বা লুটপাট/অপচয় হচ্ছে কিনা।

আগেই বলেছি এই লিখাটা ব্যাক্তি হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে না। আমি এটাই দেখাতে চেয়েছি আমাদের রাষ্ট্র অত্যন্ত অনৈতিক, অযৌক্তিক কারনে কাউকে কাউকে অন্যায় সুবিধা দেয়। আমার কোন প্রিয় মানুষ সেটা পেয়ে থাকলেও এর প্রতিবাদ করতে হবে (আহ্লাদে গদগদ না হয়ে)। রাষ্ট্রের উচিত এসব ফালতু হাততালি পাবার কাজ না করে দেশেই চমৎকার একটা চিকিৎসা ব্যাবস্থা গড়ে তোলা যেখানে রাষ্ট্রের ধনী-গরিব, বিখ্যাত-অবিখ্যাত সব মানুষ ভাল চিকিৎসা সুবিধা পাবে।

আর সেটা না হলে আমাদের যে কেউ যে কোন দিন কোন ভয়ঙ্কর রোগে আক্রান্ত হব। তারপর বিদেশে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করাতে সরকারী সাহায্য না পেয়ে (কারন আমরা কেউকেটা কেউ নই) নিশ্চিতভাবেই মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকবো। আর মনে মনে এটা ভেবে আফসোস করতে থাকবো যে –
হায়!! আমি হুমায়ূন আহমেদ নই।