ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

“হায়! আমি হুমায়ূন আহমেদ নই” শিরোনামে একটা লিখা লিখেছিলাম কয়েক দিন আগে। মন্তব্যের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। কেউ সমর্থন করেছেন, কেউবা প্রচন্ড সমালোচনা করেছেন। প্রচন্ড সমালোচনাকেও (এমনকি ব্যাক্তিগত আক্রমণকেও) আমি আমার প্রাপ্তি বলে মনে করি – কারন এটা আমাকে আমাদের সমাজের মানুষদের মুল্যবোধ, চিন্তার ধরন সম্পর্কে ধারনা দেয়। উল্লেখিত লিখার প্রচণ্ড সমালচনাগুলো আমাকে অনেক ভাবিয়েছে, আমি গভীরভাবে এর কারন তলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। সেই ভাবনা থেকেই এই লিখাটা লিখছি।

এই পৃথিবীর অত্যন্ত দরিদ্র একটা দেশের মানুষ আমরা। রাস্তায় বেরোলেই চারদিকে চোখে পড়ে নানা রকম দরিদ্র মানুষের মিছিল। আমাদের বেশীরভাগ ‘দরিদ্র না’ মানুষেরই হয়তো এই দেশের মানুষের দারিদ্র্যের প্রচন্ডতা সম্পর্কে কিছুটা ধারনা আছে। কিন্তু আসলে আমরা অনেকেই এই দেশের দারিদ্র্যের প্রচন্ডতা সম্পর্কে ভালভাবে জানিই না, কারন আমরা অনেকেই এই দেশের দারিদ্র্যেকে আমরা কাছে থেকে দেখিইনি। সেটা দেখে থাকলে আমরা হয়তো আমাদের রাষ্ট্রের আপাতদৃষ্টিতে প্রশংসনীয় অনেক কাজকে সমর্থন করতে তো পারতামই না, উপরন্তু ঘৃণাই হয়ত করতাম।

হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসায় সরকারি অনুদান নিয়েই যেহেতু কথার সুত্রপাত, তাই আসুন দারিদ্র্য দেখতে আমরা একটা সরকারী হাসপাতালেই যাই (যারা ঢাকায় আছেন, তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই যাই)। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সাথে আমার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল, অজস্র দরিদ্র রোগীর সাথে আমার কথা বলার অভিজ্ঞতা আছে। তাই দারিদ্র্যকে খুব কাছে থেকে আমি দেখেছি। আমি এখানে অজস্র উদাহরন দিতে পারি। কিন্তু লিখা অত দীর্ঘ না করে আমি আমার দেখা তিনটি ঘটনা নিয়ে লিখছি।

ঘটনা একঃ
টাইফয়েড এখন খুব সহজে নিরাময়যোগ্য একটা রোগ। কিন্তু এক রোগী টাইফয়েডে ভুগে অনেক জটিলতা নিয়ে শেষ মুহূর্তে এসে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে মারা যায়। তাঁর আত্মীয়-স্বজনের সাথে কথা বলে জানা যায় তাকে ডাক্তার প্রথমে মুখে খাওয়ার এন্টিবায়োটিক দিয়েছিলো, তাতে কাজ না হওয়ায় এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন দিতে বলা হয়, যার প্রতিটির দাম ৩৫০ টাকা। সর্বোচ্চ ১৫ দিন চিকিৎসা নিতে হবে, ১৫ টা ইঞ্জেকশন লাগবে। দাম ৫২৫০ টাকা। ওই লোকের কাছে ওই টাকা ছিলনা, তাই ডাক্তারি চিকিৎসা বাদ দিয়ে গিয়েছিলো গ্রাম্য কবিরাজের কাছে। তারপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে মৃত্যু। এই ইঞ্জেকশন সরকারী হাসপাতালে থাকলে (থাকারই কথা ছিল) বা এই ৫২৫০ টাকা পেলেই এই মানুষটা পুরোপুরি সেরে যেত, অর্থাৎ এই মানুষটার জীবনের মুল্য ছিল ৫২৫০ টাকা, হ্যাঁ ঠিক তাই। ভদ্রলোকের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর কান্নাটা আমার কানে বাজে এখোনো “হায় তুমি মইরা গেলা, আমি অহন খামু কেমনে?”। স্বামী হারানোর কষ্টের চাইতে, নিজে অভুক্ত থাকার কষ্টই প্রধান হয়ে ওঠে এদের কাছে। দেখেছেন কখনো?

ঘটনা দুইঃ
একটা বাচ্চা ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসার জন্য ওষুধটা তার বাব-মাকে কিনতে হচ্ছে, ব্যয়বহুল অষুধ। তাঁরা জানতে পারেন এসব করেও তাঁদের বাচ্চা বেশী দিন বেঁচে থাকবে না – হয়তো আর কয়েক মাস। তাদের কিছু জমানো টাকা আর কিছু ধার করা টাকা নিয়ে এসেছিলেন। এক পর্যায়ে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন বাচ্চাকে আর চিকিৎসা করাবেন না। যুক্তি – যেহেতু বাচ্চা পুরোপুরি সেরে উঠবে না, তাই তার চিকিৎসার জন্য টাকা খরচ করে তাঁদের বাঁকি তিন সন্তানকে ভবিষ্যতে অভুক্ত রাখার এবং নিজেরা অভুক্ত থাকার ঝুঁকি তাঁরা নেবেন না। ডাক্তাররা অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, তাঁরা শুনলেন না। অবশেষে এক দিন খুব ভোরে তাঁরা ডিসচার্জ অর্ডার ছাড়াই পালিয়ে যান হাসপাতাল থেকে।

ঘটনা তিনঃ
শীতের রাত। একজন রিকশাচালকের সন্তান হয়েছে, কিন্তু বাচ্চাটা প্রিম্যাচিওর এবং অনেক কম ওজন নিয়ে জন্মেছে। তাকে ইনকিউবেটারে রাখা জরুরী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যে কয়টা ইনকিউবেটার ছিল সবগুলো ভর্তি – এমনকি একেকটায় কয়েকটা করে বাচ্চা রাখা। তাই বাবাকে বলা হল বাচ্চাটাকে আজিমপুর ম্যাটার্নিটিতে নিয়ে যাবার জন্য। অনেকগুলো তুলা, কাপড় দিয়ে বাচ্চাটাকে তিনি নিয়ে গেলেন, কিন্তু সেখানেও কোন ইনকিউবেটার খালি না পেয়ে আবার ফিরে আসেন। ফেরার পর ডাক্তাররা দেখেন (দেখেন বাবাও) শিশুটি মৃত।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা এক জার্মান ভদ্রলোক একটা এন জি ওর হয়ে বাংলাদেশে এসে বস্তিবাসীদের নিয়ে কাজ করেছিলেন। যাবার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেছিলেন, যে দেশে মানুষের এতো অবর্ণনীয় দারিদ্র্য সেই দেশের মানুষ কীভাবে এতো গাড়ি চড়ে, এত দামী ফ্ল্যাটে থাকে? তাদের লজ্জা করে না? এক জন মানুষ (ভিনদেশী হলেও) হয়ে তাঁর কিন্তু ঠিকই লজ্জা লেগেছিল এবং তিনি এর পর থেকে প্রতি বছর তাঁর দেশ থেকে টাকা যোগাড় করে এই দেশে আসতেন এদেশের দরিদ্রদের জন্য কাজ করতে।

আসলে দীর্ঘদিন কোন বীভৎসতা নিয়মিত দেখতে থাকলে সেটা আমাদেরকে আর স্পর্শ করে না, আমাদের গা সওয়া হয়ে যায়। দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে ঠিক এই ব্যাপারটিই ঘটেছে। তারপরও সবাইকে বলছি, প্লীজ যেখানেই হউক না কেন, যেভাবেই হোক না কেন আরেকবার কাছ থেকে দারিদ্র্য দেখুন। রাষ্ট্রের ওপর তো বটেই, নিজেদের জীবনযাপন পদ্ধতির ওপরই হয়তো বিরক্ত বোধ করবেন। জীবনের দর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে আমূল।