ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

 

অনেক ধন্যবাদ নারায়নগঞ্জবাসী। ভোটের মাধ্যমে আপনারা বিপ্লব ঘটিয়েছেন – ‘গো হারা’ হারিয়েছেন সন্ত্রাস আর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে। আপনারা বুঝিয়ে দিয়েছেন সাধারন মানুষকে আর যাচ্ছেতাই গেলানো যাবে না। সাধারন মানুষকে ভয় দেখিয়ে, টাকা খাইয়ে নির্বাচনে জেতার দিন শেষ হল বলে। রাজনীতিতে গডফাদারদের সময়ও শেষ প্রায়। সব কিছুর ওপরে উঠে আপনারা আপনাদের প্রিয় মানুষটির পাশে থেকেছেন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। সারা দেশের মানুষকে আপনারা পথ দেখালেন, সাহস দিলেন, দেখিয়ে দিলেন যে স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও টিকে থাকা যায়, জেতা যায়।

আপনাকে অভিনন্দন আইভি, নির্বাচনে জেতার জন্য, দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়েও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য, সাধারণ মানুষের ওপর আস্থা রাখার জন্য, হুমকি, ভীতির মধ্যেও দমে না যাবার জন্য, সব ষড়যন্ত্রের (সেনাবাহিনী মোতায়েন না হওয়া সহ) মধ্যেও অবিচল থাকার জন্য, আর সুস্থ রাজনীতির জয় নিয়ে প্রায় নিভে যাওয়া আশার সলতেটা আমাদের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

আপনার জন্য অনেক শুভকামনা – আপনি গত আট বছর যেভাবে মানুষের পাশে থেকে তাদের সেবা করেছেন, সামনের দিনগুলোতে যেন সেটা আরো ভালভাবে করতে পারেন। একি সাথে এটাও চাই স্রোতের বিরুদ্ধে পাওয়া এই জয় আপনাকে যেন অহংকারী না করে ফেলে, জনবিচ্ছিন্ন না করে ফেলে। সর্বোচ্চ পদের একটা ঝুঁকি তো থাকেই সবসময় – চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে যাওয়া, যেমন হয়েছেন আপনার নেত্রী (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী), যেমন হয়েছিলেন তাঁর বাবাও। এর পরিনতি আশা করি জানেন আপনি।

আমরা, সাধারন মানুষ কি ম্যাসেজ পেলাম এই নির্বাচন থেকে? নারায়নগঞ্জবাসী আমাদেরকে দেখিয়ে দিলেন মানুষের সন্মিলিত শক্তি কতোটা হতে পারে। যে শক্তির কাছে এমনকি হেরে যেতে পারে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রও। নির্বাচনের আগে যখন দেখা গেল যে, নির্বাচন কমিশনের পরিপত্র জারী করা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হোল না, তখনি এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল যে সরকার যেভাবেই হউক শামীম ওসমানকে জেতাতে চাইছে। কিন্তু না, সেটা হোল না জনগনের সন্মিলিত শক্তির কাছে হেরে।

যে দুই দলের পালাক্রমিক শাসনে (এবং শোষনে) আমাদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে, তাদের দিয়ে এদেশে সুশাসন কায়েম হবে এটা মনে করার কোন কারন নেই – আমরা দুই দলকেই ২ বার করে ক্ষমতায় দেখেছি, এবং প্রচণ্ড হতাশ হয়েছি। আমি বিশ্বাস করি যে এদেশে সুস্থ রাজনৈতিক ধারার অনুসারী নতুন কোন রাজনৈতিক শক্তি আসবেই, এবং আমরা মুক্ত হবোই এই দুই দলের হাত থেকে। কিন্তু তাদের হাত থেকে আমাদের মুক্তি সহসা হবে বলে মনে হয় না। অর্থাৎ আরো কিছু কাল আমরা এই দুই দলের একটিকে দিয়ে শাসিত (এবং শোষিত) হব। তাই, আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে এই সময়টাকেও যতোটা সম্ভব ভাল (বা কম খারাপ) করে তোলা।

কোন দলকে ক্ষমতায় নেয়ার চেষ্টা করে দুই শ্রেণীর মানুষ – একটা শ্রেনী মনে করে তাঁর পছন্দের দল ক্ষমতায় এসে দেশের এবং দেশের মানুষের কল্যান করবে, তাদের নিজ এলাকার উন্নয়ন করবে; আরেকটা শ্রেণী চায় ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে চাঁদাবাজী, টেণ্ডারবাজী করে, চাল-গম-ঢেউটিন চুরি করে ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ পেতে। সাধারণ জনগন বলতে আমি বোঝাচ্ছি ১ম শ্রেনীটার কথা; ২য় শ্রেনীটাকে আমি আমার সাধারণ জনগনের হিসাবের মধ্যে রাখছি না, কারন ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ পেতে চাওয়া এই মানুষগুলো কোনদিন চাইবে না রাজনীতি সুস্থ ধারায় আসুক।

আমরা যে যেই পার্টিই সমর্থন করিনা কেন, আমরা যারা মনে করি রাজনীতির উদ্দেশ্য হোল জনগনের কল্যান সাধন করা, দেশে সুশাসন কায়েম করা, তাদের উচিত এক হওয়া। উচিৎ হবে যার যার দলের মধ্যে তুলনামুলকভাবে ভাল (বা কম খারাপ) মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো, তাঁদেরকে সামনে নিয়ে আসার এবং মনোনয়ন/সমর্থন পাইয়ে দেবার চেষ্টা করা। এমনকি দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যদি এতে বাধা হয়ে ওঠে, তবুও। দলের প্রতি শর্তহীন আনুগত্যের মানসিকতা ত্যাগ করে, ভাল নেতা-কর্মীদের পক্ষে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরী করতে হবে। যেমন করলেন আইভী, আর তাঁর সাথে নারায়ণগঞ্জবাসী। এই চাপ সফলতার সাথে তৈরি করতে পারলে আমাদের দেশের রাজনৈতিক সন্ত্রাস আর দুর্বৃত্তায়নের গতি কিছুটা হলেও কমে আসবে। আর হ্যাঁ, এটা হবে স্বল্পমেয়াদে নেয়ার মত একটা ব্যাবস্থা। মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অন্য রাজনৈতিক বিকল্পের কথা ভাবতেই হবে।

গত ২৫ অক্টোবর ‘নারায়ণগঞ্জ শিক্ষা হয়ে থাকুক দুই নেত্রীর কাছেই’ শিরোনামে একটা লিখা লিখেছিলাম, যেখানে বলেছিলাম যে আইভির জয় থেকে দুই নেত্রী যেন শিক্ষা নেন, এবং ভবিষ্যতে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে যেন এটা মাথায় রাখেন যে মাস্তানীর রাজনীতির দিন শেষ, গডফাদারদের দিন শেষ। আবার ওই লিখার শেষেই এই সংশয় ছিল যে দুই নেত্রী আদৌ জনগনের মনের কথা শোনেন কিনা। আমি আসলে মোটামুটি নিশ্চিত শামীম ওসমানের ‘গো-হারা’ হারার পরও তাঁরা জনগনের মনের কথা শুনবেন না, শিক্ষাও নেবেন না।

কেউ যখন কোন বিষয়ে নিজে থেকে সঠিক শিক্ষা নেয় না, তখন তাকে শিক্ষা দিতে হয়। আমরা, সাধারণ জনগন যদি এক হতে পারি তবে দুই নেত্রীকে অবশ্যই সঠিক শিক্ষা দেয়া সম্ভব। আমি বলছি না এখনি দল ত্যাগ করতে হবে, বরং আসুন প্রত্যেকেই যার যার নিজ দলের মধ্যে থেকেই এই নোংরা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়াই, রাজনীতি ফিরিয়ে দেই ভাল, সৎ, ‘মানবিক’ মানুষের হাতে।

নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে বিশাল ব্যাবধানে আইভিকে জিতিয়ে নারায়ণগঞ্জবাসী সারা দেশের মানুষকে দিয়েছেন জেগে ওঠার ডাক। আমরা, সারা দেশবাসী কি শুনতে পাচ্ছি না সে ডাক?

***
ফিচার ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম