ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

আমি ‘নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন’ এর কথা বলছি না, বলছি ‘সামাজিক আন্দোলনকারী ইলিয়াস কাঞ্চন’ এর কথা। দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের মাধ্যমে অবহেলাজনিত সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর এই আন্দোলনে নামা নিয়ে আমার কিছু ভিন্ন পর্যবেক্ষন আছে যদিও এই মানুষটির এবং তাঁর আন্দোলনের প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা আছে। বিস্তারিত আলোচনার আগেই বলে নেই এই লিখার লক্ষ্য ব্যাক্তি ইলিয়াস কাঞ্চন নন, বরং আমি তাঁর এই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করে আমাদের চরিত্রের অত্যন্ত অমানবিক একটা দিক তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।

ইলিয়াস কাঞ্চন এই আন্দোলনে নামার একটা পটভূমি আছে – সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত স্ত্রীর মৃত্যুশোক তাঁকে এই আন্দোলনে নামতে অনুপ্রাণিত করেছে। এই দীর্ঘ সময় তিনি সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নিতে সরকারের ওপর চাপ তৈরী করেছেন, জনসাধারনকে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই আন্দোলনে যে খুব বেশী মানুষকে সাথে পেয়েছেন তা কিন্তু নয়। সাধারন মানুষ দূরেই থাকুক, তিনি পাশে পাননি তাঁর নিজের ক্ষেত্রের (চলচ্চিত্রের) মানুষদেরও। তারপরও তিনি না দমে গিয়ে তাঁর কাজ করে গেছেন। কয়েকদিন আগে অবশ্য তাঁর আহ্বানে একটা অনশন ধর্মঘটে বেশ কিছু বিখ্যাত এবং সাধারন মানুষ অংশগ্রহন করেছে। কিন্তু এই অনশন ধর্মঘটের আগে তিনি সবাইকে, বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতদের স্বজনদেরকে আহ্বান জানিয়েছিলেন অনশনে অংশগ্রহন করতে। অর্থাৎ তিনি এটা ধরেই নিয়েছেন যে তাঁর এই অনশনে সড়ক দুর্ঘটনার ভুক্তভোগীদেরই বেশী আসার কথা। তাঁর এই আহ্বানের মধ্যেই আমাদের চরিত্রের সেই অমানবিক দিকটার ইঙ্গিত আছে।

এবার একটা অপ্রিয় প্রশ্ন – যদি সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীর মৃত্যু না হোত তাহলে কি ইলিয়াস কাঞ্চনকে আমরা এভাবে দেখতাম? উত্তর সম্ভবত হবে – ‘না’। কারন আমি নিজেও তাঁর মুখে অনেকবার শুনেছি যে স্ত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুই তাঁকে এই আন্দোলনে নিয়ে এসেছে।

আচ্ছা এবার ধরা যাক আমি এই দেশে ধর্ষনের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই। তো সেই আন্দোলন শুরু করতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যেতে শুরুতেই কি ধর্ষিত হতে হবে আমার বোনকে বা প্রেমিকাকে? তা না হলে কি ধর্ষনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করা, এবং সেটা চালিয়ে যাবার ব্যাপারে আমি যথেষ্ট উৎসাহ এবং প্রনোদনা পাব না? একিভাবে কেউ যদি ক্রসফায়ার, এসিড সন্ত্রাস, ডাকাতি, হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে চায়, তবে তার পূর্বশর্ত কি তাহলে সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তির কোন নিকটজনকে সেই সমস্যায় ভুগতে হবে?

ব্যাপারটা কিন্তু অনেকটা সেইরকমই ঘটছে। এক্ষেত্রে সাবেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী, আর বর্তমানের সাংসদ তারানা হালিমের উদাহরন দেয়া যায়। তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত অনেক মানুষের বাড়িতে যান সান্তনা দিতে – প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু তাঁর এই কাজেরও একটা পটভূমি আছে – সড়ক দুর্ঘটনায় তিনিও তাঁর আদরের ভাগ্নেকে হারিয়েছিলেন। আবার কিছুদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মিশুক মুনীরের ছোট ভাইকেও আমরা দেখেছি সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে।

আশপাশের মানুষদের সাথে বিষয়টা নিয়ে আলাপের সময় অনেকেই আমাকে এটা বলেছেন যে এটাইতো স্বাভাবিক, এবং এভাবেই যদি কাজ হয়, তাহলে সমস্যা কী? কিন্তু আমার মতে সমস্যা আছে, ভীষন সমস্যা আছে।

আসলে এই মানসিকতার কারনেই এই দেশে, এই সমাজে প্রায় সব আন্দোলনই ব্যর্থ হয়। কোন আন্দোলন সফল করতে বেশীরভাগ মানুষই রাস্তায় নামে না। কারন সবাইতো আর সেই সমস্যায় ভুগেনি। আর আমাদের দেশে এটা অত্যন্ত ভীষন অমানবিক ব্যাপার যে আমরা অন্যের দুঃখ বা কষ্ট দেখে সেটা অনুভব করি না, যতক্ষন সেটা আমাদের ওপর না হয়। ছোট বেলায় পাঠ্যবইতে পড়া একটা ছড়ার শেষ কয়েকটা লাইনের কথা মনে পড়ছে –
কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে?
কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে।

মানে কেউ যদি সাপের কামড় না খায়, তবে সে বিষের যন্ত্রনা কোনদিনও বুঝবে না। ছোট বেলায় কথাগুলো অনেক ভাল লাগত, কিন্তু এখন আমার ভীষণ আপত্তি আছে এই ছড়ার বক্তব্য নিয়ে। মানুষ যদি মানুষ হয়েই থাকবে তবে সে কেন নিজে না ভুগেও, অন্যের দুঃখ দেখেই সেটা অনুভব করবে না (পুরোপুরি না হলেও, অনেকটা)। সেটা না পারলে আমরা নিজেদেরকে ‘মানুষ’ দাবী করি কীভাবে?

এবার আসি লিখাটির শিরোনামের প্রসঙ্গে। এই দেশের, এই সমাজের অনেক কিছু নিয়েই আমি বিরক্ত, ক্ষুব্ধ (অনেকেই সম্ভবত তাই)। আমি মনে করি এভাবে চলতে পারে না অনন্তকাল। নিজ সাধ্যের মধ্যে দাঁড়াতে চাই এই সমাজের অন্যায়, অবিচার, অনাচারের বিরুদ্ধে। কিন্তু আমি মনে করিনা যে এই জন্য আমাকে ইলিয়াস কাঞ্চনের মত ওই সব অন্যায়ের শিকার হয়ে তবে কাজ শুরু করতে হবে। সেজন্যই আমি ইলিয়াস কাঞ্চন হতে চাই না। আমি চাই মানুষের কষ্ট দেখেই সেটা অনুভব করে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দিতে। আর একই চিন্তা হওয়া উচিৎ আমাদের সমাজের সব মানুষের। তবেই হয়তো পাল্টাতে শুরু করবে এই সমাজটা। আর এটা না হলে এই সমাজের আরো ভয়ঙ্কর পচন অনিবার্য।