ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

গতকাল “কেন আমি ইলিয়াস কাঞ্চন হতে চাই না” শিরোনামে একটি লিখা লিখেছিলাম। লিখাটি আপলোড করার পরই একটা পত্রিকায় হুমায়ূন আহমেদের একটা লিখা পড়লাম – যেখানে তিনি আমেরিকায় তাঁর চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে লিখেছেন। কিন্তু আমার মনোযোগ আকর্ষন করলো লিখাটার শেষ অংশটা। পাদটিকা অংশের শেষে তিনি তাঁর স্বপ্নের কথা বললেন – এই দেশে সর্বাধুনিক একটা ক্যান্সার হাসপাতাল তিনি তৈরি করতে চান, এবং সেজন্য তিনি সাধারণ মানুষের কাছে হাত পাতবেন। তাঁর এই স্বপ্ন দেখাটা আমার গতকালের লিখাটার (কেউ না পড়ে থাকলে পড়ে নিতে পারেন) বক্তব্যের সাথে একেবারেই মিলে যায়। সেই পটভূমিতেই লিখছি আজকের এই লিখাটা।

জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীকে হারিয়ে সেই শোক থেকে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন শুরু করেন। ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনকে উদাহরন হিসেবে নিয়ে আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে নিজে বা নিজের কোন আপনজন ভুক্তভোগী না হলে আমরা প্রায় সবাই অন্য মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে সেটা অনুভব করি না, এবং তার বিরুদ্ধে আন্দলনেও নামি না। এবং আমি মনে করি আমাদের দেশের প্রায় সব মানুষদের এই মানসিকতার কারনেই আজ আমাদের এই দেশ, এই সমাজ দিনে দিনে ক্রমবর্ধমানভাবে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

আসি হুমায়ূন আহমেদের কথায়। লেখক, নির্মাতা হিসেবে তিনি কতোটা জনপ্রিয় সেটা আমরা জানি। এই জনপ্রিয়তা ব্যাবহার করে তিনি এই সমাজের জন্য অনেক কাজ করতে পারতেন। তিনি লিখতে পারতেন, নানা রকম সামাজিক আন্দোলনের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে পারতেন। তাঁর নামের এতোটাই যাদু যে তাঁর নাম যুক্ত হলে যে কোন সামাজিক আন্দোলন এগিয়ে যেতে পারতো অনেক দূর। কিন্তু না, তিনি সেটা করলেন না। দূর ইউরোপ-আমেরিকায় যাবার দরকার নেই, পাশের দেশেও এর চমৎকার উদাহরন আছে। লেখকদের মধ্যে ভারতেই মহশ্বেতা দেবী আর অরুন্ধতি রায়ের নাম বলা যায়। আমরা অনেকেই জানি (যাঁরা জানিনা, ইন্টারনেটে খুঁজলেই পেয়ে যাব) তাঁরা তাঁদের দেশ এবং সমাজের জন্য কি করেছেন, করে যাচ্ছেন এখনো। কিন্তু না ওই কষ্টকর পথে আমাদের হুমায়ূন আহমেদ যাননি। গত ১৫ বছরে আমি যথেষ্ট সচেতনভাবে তাঁকে অনুসরন করেছি, আমি মাত্র কয়েকটি ঘটনা ছাড়া দেশ এবং জাতির কোন সঙ্কটে, সমস্যায় তাঁকে রাস্তায় নামতে দেখা দূরে থাকুক, কলম ধরতেও দেখিনি। সুস্থ অবস্থায় তিনি কিছু করননি, এখন তিনি নিজে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে, ক্যান্সারে হাসপাতাল তৈরি করতে চাইছেন।

হুমায়ূন আহমেদ এই দেশেই জন্মেছেন, বেড়ে উঠেছেন। তিনি কি এই দেশের অবস্থা জানেন না? তিনি আজ ক্যান্সার হাসপাতাল বানাতে চান, কিন্তু তিনি কি জানতেন না, অতি সাধারণ রোগে ভুগে কত মানুষ এই দেশে মরে যায়? আর তিনি কি দেখেননি এই দেশে আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরি করার জন্য দীর্ঘদিন অর্থ যোগাড় করার চেষ্টা করে যাচ্ছে? কই তাঁকে তো এই টাকা জোগাড়ের পক্ষে সরসরি নামতে দেখলাম না। আর কাজ করার মত আরও কত সমস্যা আছে আমাদের চারপাশে তার ফিরিস্তি আর নাইবা দিলাম – আমরা সবাই এই দেশে বসবাস করি, আমরা ভালভাবেই জানি কত রকম অন্যায়, অবিচার আর অনাচারে আমরা আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাঁর মত কিছু অতি বিখ্যাত মানুষ যদি কাজে নামতেন তবে আজকের বাংলাদেশের চেহারা এরকম হোত না।

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর লিখাটায় আমেরিকার ক্যান্সার হাসপাতালটার পেছনে দুই ধনী আমেরিকানের দানের কথা তুলে আমাদের দেশের ধনীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “বিত্তবানদের মনে রাখা উচিত, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যাংকে জমা রেখে তাঁদের এক দিন শুন্য হাতেই চলে যেতে হবে। বাংলাদেশের কেউ তাঁদের নামও উচ্চারন করবে না”। হুমায়ূন আহমেদ ধনী, তবে এতোটা ধনী নন যে নিজের টাকা দিয়ে আস্ত একটা বড় হাসপাতাল তৈরি করতে পারবেন। তাই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে হাত পাতবেন। ভাল কথা। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই হাত তিনি আগে পাতেননি কেন? যে কোন মহৎ কাজ করার প্রয়োজনে আপনি এদেশের মানুষের কাছে হাত পাতলে তারা তাদের ভালবাসার মানুষটির হাত কি ভরিয়ে দিতো না? রাস্তায় এসে দাঁড়াতে বললে কি তাঁর পাশে রাস্তায় দাঁড়াতো না? কিন্তু না, তিনি আগে করেননি।

আমি মনে-প্রানে কামনা করি হুমায়ূন আহমেদ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসুন। এসে তাঁর স্বপ্নের ক্যান্সার হাসপাতালের কাজ শুরু করুন। ধরা যাক মানুষের কাছে এই মহৎ কাজটির জন্য তিনি হাত পাতলেন। যদি সাধারণ মানুষ বলে ওঠে যে আমরা টাকা দেব না, কারন আমরা নিজেরা বা আমাদের কোন নিকটজন ক্যান্সারে ভোগেনি – তাহলে কেমন হবে? সেতাকে কি তিনি অন্তত অযৌক্তিক বলতে পারবেন? তবে আমি নিশ্চিতভাবেই জানি মানুষ সেটা বলবে না, এদেশের মানুষ অবশ্যই তাঁর দু’হাত পুর্ন করে দেবে। এদেশে হুমায়ূন আহমেদ এমনই একটা নাম, এমনই একটা জাদু।

কিছুদিন আগে হুমায়ূন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান দেয়ার বিরোধীতা করে ‘হায়! আমি হুমায়ূন আহমেদ নই!’ শীরোনামে একটা লিখা লিখেছিলাম। অনেকে ওই লিখায় আমার চিন্তা অনেকটা ভুল বুঝে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। আমি জানি না, এই লিখাটাও অনেকে ভুল বোঝেন কিনা। আসলে তাঁর প্রতি আমার কোন রাগ/ক্ষোভ নেই তবে প্রচণ্ড অভিমান আছে। এই মানুষটার লিখা ‘হিমু’ চরিত্রের উপন্যাস পড়ে ঢাকা শহরের অজস্র তরুন হলুদ পাঞ্জাবী পরে রাত বিরাতে রাস্তায় ঘুরে পুলিশের হাতে ধরা পড়ত। যাদের বয়স একটু বেশি তাঁদের হয়ত মনে আছে তাঁর ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের চরিত্র ‘বাকের ভাই’ এর যেন ফাঁসি না হয় সেই দাবিতে সারা দেশের অনেক জায়গায় মিছিল হয়েছিল; আর নাটকের শেষ পর্বে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়ে যাবার পর দেশের অনেক জায়গায় বাকের ভাইয়ের গায়েবানা জানাজা হয়েছিল। অভিমান এজন্য যে এই ‘জাদুকর’ চাইলে সাহিত্যের বাইরেও সমাজের জন্য অনেক জাদু দেখিয়ে দিতে পারতেন।

অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত এই দেশ আজ ডুবন্ত প্রায়। আমরা, ডুবন্ত দেশবাসী ডুবতে ডুবতে প্রানপনে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে হলেও বাঁচতে চাইছি। হুমায়ূন আহমেদের মত মানুষ আমাদের জন্য বিশাল জাহাজ না হলেও চমৎকার একটা ভেলা হতে পারতেন। কিন্তু না, আমাদের কপালে সেটা নেই। তাঁর দিকে তাকিয়ে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারতাম, যেমন শিখি অরুন্ধতি রায়ের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু আমরা দেখলাম আমাদের অতি প্রিয় মানুষটি নিজে ব্যাক্তিগতভাবে না ভুগে সমাজের বড় কোন কাজে আসেননি (সাহিত্য রচনা ছাড়া) – তিনিও হলেন ইলিয়াস কাঞ্চনেরই মত। (এই লিখাটা এই দেশের সব বিখ্যাত মানুষদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত)

পুনশ্চঃ আমার ক্যান্সার হয়নি, কোন আত্মীয় বা বন্ধুও ক্যান্সারে মারা যায়নি। তারপরও হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার হাসপাতালের কাজে সাহায্য করার জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।