ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

কাল রাতের খবরে গরুর হাটের ওপর রিপোর্ট দেখছিলাম – গরুর দাম কেমন, যোগান কেমন ইত্যাদি। রিপোর্টের মূল আকর্ষন হিসাবে তো থাকেই বাজারের সবচাইতে বড় আর দামি গরুটা। জানলাম ওই হাটের সবচাইতে বড় গরুটার দাম হাঁকা হচ্ছে ১৭ লাখ টাকা। এটাও জানলাম এবার উটের যোগান একটু কম হওয়াতে উটের দাম গতবারের চাইতে বেশীই চাওয়া হচ্ছে – ৫/৭ লাখ টাকা। কি নোংরাভাবেই না মিডিয়া মানুষের মধ্যে একটা নোংরা প্রবৃত্তি উস্কে দিয়ে যাচ্ছে। নোংরা প্রবৃত্তি কেন বলছি সে কথায় আসছি পরে।

কাল সকালেই অফিসে আসার সময় পথেই পড়লো ও,এম,এস এর চালের ট্রাক – আজো দেখলাম দীর্ঘ লাইন, আগের চাইতেও দীর্ঘ। খুব দ্রুত চাল শেষ না হয়ে গেলে জীর্ন-শীর্ন মানুষগুলো হয়তো পারবে কয়টা টাকা বাঁচাতে। লিখার সাথে একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও ও,এম,এস এর চাল বিক্রির লাইন নিয়ে আমার একটা ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। বেশ ধনীর সন্তান এক কিশোর আমার কাছে জানতে চাইল রাস্তায় সে গাড়ি থেকে মাঝে মাঝে দেখে অনেক লোক একটা ট্রাকের পেছনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এটা কেন? আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম। শুনে সে ভীষন অবাক হয়ে বললো, লোকগুলো এতো কিপটে! এই কয়টা টাকা বাঁচানোর জন্য এত রোদের মধ্যে তারা দাঁড়িয়ে থাকে!

যাই হোক আসল আলচনায় আসি। মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আযহা আর কয়েকদিন পরই। সামর্থ্যবান মুসলিমরা কোরবানী করবেন। কোরবানীর তাৎপর্য নিয়ে ইসলাম ধর্মে অনেক কিছুই বলা আছে। সেই বক্তব্যগুলো নিয়ে অনেকেই অনেক যৌক্তিক বিতর্ক করেন। কিন্তু আমার আজকের লিখার উদ্দেশ্য কোরবানীর প্রাক্কালে ওই তর্কটা তুলে দিয়ে, এবং তার কোন পক্ষ নিয়ে তর্কে অংশগ্রহন করা নয়। বরং আজ আমি ইসলামে যা আছে সেটা নিয়েই কিছু কথা বলছি।

আমাদের দেশের প্রায় সব মুসলিম জানেন যার ওপর যাকাত ফরজ, তার ওপর কোরবানীর ওয়াজিব। মজার কথা এদেশের অনেক মুসলমানই জানেন না যে, কোরবানী করা কিন্তু সর্বজনীন ওয়াজিব না। শুধুমাত্র হানাফী মাযহাবে এটা ওয়াজিব, আর অন্য তিন মাযহাবে কিন্তু এটা সুন্নত। এটাকে ওয়াজিব ধরে যদি নেইও, তারপরও চারদিকে তাকিয়ে দেখি তো, একটা ওয়াজিব নিয়ে কী করছে এদেশের মানুষ, যখন অজস্র ফরজের কোন খোঁজ নেই এদেশের মুসলিমদের জীবনে?

কুরআনে সালাতের সাথে সাথে প্রায় সব যায়গায় এসেছে যাকাতের কথা। অর্থাৎ একজন সামর্থ্যবান মানুষের কাছে ইসলামের মূল কাজগুলোর মধ্যে সালাতের পরই যাকাতের স্থান। যে মানুষগুলো কুরবানীর হাটে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন গরু কেনার জন্য, সেই মানুষগুলোর ওপরই কিন্তু যাকাত ফরয। আপনি এখন এই লিখাটা পড়ছেন, এই দেশের খবর আপনি নিশ্চয়ই ভালভাবে জানেন। বলুনতো কোরবানীর হাটে যাওয়া মানুষগুলোর মধ্যে কত পার্সেন্ট মানুষ ঠিকমতো যাকাত দেয়? ঠিকমত যাকাত দেয়া বলতে আমি বোঝাচ্ছি পাই পাই করে হিসাব করে যাকাত দেয়ার কথা; কিছু ‘যাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি’ কয়েকজন গরীবকে দিয়ে দেয়াকে বোঝাচ্ছি না। ঠিকমত যাকাত দেয়ার হার কি ৫% এর বেশী হবে? আমি মনে করি না। কোরবানীর গরু কেনার সময় টাকার কোন অভাব হয় না এদেশের মানুষের, মনে হয় কী দারুন মুসলিম সব্বাই! কিন্তু টাকা থাকে না কেবল যাকাত দেবার সময়। আচ্ছা, মানুষ কুরবানি দেয়া নিয়ে এতো উৎসাহী কেন?

কুরবানী নিয়ে একটু ভিন্নভাবে ভাবলেই কারণটা বোঝা যাবে। ধরে নেই কুরবানীর নিয়মটা এরকম না, একটু ভিন্ন। কল্পনা করি কুরবানীর নিয়মটা এরকম যে, কোরবানীর জন্য যে গরুটা কেনা হবে সেটা জবাই করা হবে না, সেটা কোন গরীব মানুষকে দিয়ে দিতে হবে। তাহলে কি হোত কোরবানীর চেহারাটা? কয় জন মানুষ কোরবানী দিত? দিলেও লাখ টাকার গরু কোরবানী কয়জন দিত? এটা আমি বলতেই পারি তখন বেশীরভাগ মানুষ একা কোরবানি দিত না (সাতজনে মিলে দিত), আর গরুটা হোত মোটামুটি বাছুর। তাহলে বিষয়টা হোল এই – প্রানী জবাই করে ভুরিভোজের নিয়মটা আছে বলেই এই দেশের মুসলমানদের কাছে কোরবানীর এতো তাৎপর্য।

ইসলামে কোরবানির প্রাণীর আকার নিয়ে কোন শর্ত নেই, এমনকি এমন কোন তথ্যও নেই যে বড় প্রাণী কোরবানি দিলে বেশি পূণ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রানীর আকার বড় করার প্রতিযোগীতায় মত্ত পুরো দেশ, পুরো মুসলিম সমাজ। কিন্তু যাকাতের ক্ষেত্রে বেশীর কথা বাদই দেই, শরীয়তের বিধান ২.৫% ও বাদ দেই, ১% ও কি দেয় কেউ?

প্রতি বছর কোরবানিতে সম্পদের এই ভয়ঙ্কর ব্যয় কি কমানো যায় না? আমি শুধু লাখ টাকার গরুর ক্রেতাদের কথা বলছি না, সব মুসলিম তাদের কোরবানির বাজেট কমিয়ে কিছু টাকা কি সরাসরি দরিদ্রদেরকে দিয়ে দিতে পারেন না? দিলে তো আজকের ও,এম,এস এর লাইন এত দীর্ঘ হোত না। কিন্তু না, এদেশের মুসলিমরা সেটা করে না, সম্ভবত করবেও না। অবশ্য আমার প্রত্যাশাটাও এক অর্থে হাস্যকর। যে দেশের বেশীরভাগ মুসলিম (জান্নাত পাবার আশা, আর জাহান্নামের আগুনের ভীতির পরও) ফরজ যাকাত দেয় না, যাদের বেশীরভাগের জীবনই অজস্র হারাম দিয়ে পরিপুর্ন, তাঁরা কমাবেন কুরবানীর বাজেট আর সেটা দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করবেন এটা আকাশ কুসুম কল্পনাই আসলে।

ব্যাক্তিগতভাবে আমি কয়েকজনকে এমন কথা বলার পর জবাব পেলাম কোরবানির প্রাণীর মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ তো দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হয়, দরিদ্রের তো সাহায্য হয়ই। আচ্ছা ধরা যাক ওই ১৭ লাখ টাকার গরুটার কথা। একজন দরিদ্র মানুষ ওই গরুটির মাংস পেলেন। তো ওই গরুটার মাংসের কি বিশষ গুরুত্ব আছে একজন দরিদ্রের কাছে? ১৭ লাখ টাকার গরুর মাংস কি তার ক্ষুধা নিবৃত্তি করে যাবে দিনের পর দিন? পরনের কাপর দেবে? দেবে চিকিৎসা, শিক্ষা? অথচ ১৭ লাখের তিন ভাগের এক ভাগ হল ৫,৬৬,৬৬৬ টাকা। হিসেব করে দেখুন ওই টাকা দিয়ে কী হতে পারতো।

প্রিয় ধনী মানুষেরা, ও,এম,এস এর লাইন লম্বা হচ্ছে ধীরে ধীরে। এখনো ওটা রাস্তায়ই আছে। তবে আর বেশী দিন বাঁকী নেই আর – লম্বা হতে হতে ওটা আপনাদের আলিশান বাড়িতে ঢুকে পড়বে সহসাই। ১৭ লাখ টাকার গরু আর ৭ লাখ টাকার উট খেয়ে যে চর্বি থলথলে শরীর বানিয়েছেন সেটা নিয়ে পালতেও পারবেন না। তখন আর ওদেরকে ভাগ্য, অদৃষ্ট আর ধর্মের দোহাই দিয়ে ঠেকিয়েও রাখতে পারবেন না। সাবধান।

***
ফিচার ছবি: ওয়ার্ল্ড বিজনেস ইকনমি, বাংলাদেশ ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) ফটোস, শনিবার, মার্চ ১৯, ২০১১