ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

রাতে আমাদের প্রিয় ব্লগে ঢুঁ মারতে গিয়ে দেখি আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষের ছবি – চমৎকার সবুজের পাশে অসাধারন মানুষটির ছবি কি অসাধারণই না লাগছে! হ্যাঁ আমি আমাদের সহ ব্লগার বিভূতি ভূষন মিত্রের আজকের পোষ্ট “জাফর স্যার, আপনি এ দেশ থেকে চলে যান, আমার ভয় লাগছে” এর কথা বলছি। আগ্রহ নিয়ে পোষ্টটি এবং মন্তব্যগুলো পড়লাম। নিজে মন্তব্য লিখতে গিয়ে দেখলাম মন্তব্যটি দীর্ঘ হবে, তাই ভাবলাম এতো দীর্ঘ মন্তব্য না লিখে একটা স্বতন্ত্র পোস্টই লিখা যাক না আলোচিত পোষ্টটি নিয়ে।

আমেরিকার অত্যন্ত লোভনীয় চাকুরী আর বিলাসী জীবন পেছনে ফেলে জাফর ইকবাল কেন দেশে ফিরে এসেছেন সেটা পরবর্তিতে আমরা তাঁর কর্মকান্ডে দেখেছি। অনেক বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন, করছেন। এর মধ্যে আছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও। জাফর ইকবাল কি জানতেন না যে এর পরিনতি কত ভয়ঙ্কর হতে পারে? তিনি কি জানতেন না যে এটা এমনকি তাঁর মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে? তিনি জানতেন, তার পরও তিনি সেটা করে গেছেন। জনাব মিত্র তাঁর পোষ্টে তাঁর প্রিয় আরেক মানুষ হুমায়ূন আজাদের (তিনি আমারও অনেক প্রিয় মানুষ) উদাহরন টেনেছেন। একই প্রশ্ন করছি এই ক্ষেত্রেও – হুমায়ূন আজাদ যখন নারী, ধর্ম বিরোধীতা, আর রাজাকার বিরোধিতা করেছেন তখন কি জানতেন না এটা তাঁর মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে? তিনিও অবশ্যই জানতেন, এবং জেনেশুনেই তিনি সেটা করে গেছেন। এবং শেষে তাঁর জীবনে কী হয়েছিল সেটা আমরা সবাই জানি।

জাফর ইকবালকে এই দেশ ছেড়ে পালানোর জন্য ব্লগার বিভূতি ভূষন মিত্রের আহ্বান আবেগ আছে, কিন্তু ওই মানুষটাকে যথার্থ মুল্যায়ন নেই – তিনি কি জানেন না যে জাফর ইকবালরা পালায় না?(সহব্লগার বাসন্ত বিষুবও লিখেছেন কথাটা)। আপনি তাঁকে সাহস দেননি, বলেননি যে আমরা আছি তাঁর পাশে, আপনি সরকারকে চাপ দেননি যে তাঁর মত মানুষদেরকে নিরাপদে রাখতে সরকার যেন সম্ভব সব কিছু করে।

আসলে জনাব মিত্রের এই আহ্বানকে নিয়ে লিখতে আমি আগ্রহী হয়েছি এজন্য যে তাঁর এই আহ্বান আমার কাছে কোন বিচ্ছিন্ন বিষয় নয় – আমার বিবেচনায় এটা আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষদের সার্বিক পলায়নবাদী মানসিকতারই পরিচায়ক। আমাদের সমাজের, রাষ্ট্রের আজকের এই অবস্থা কেন? কারন ওই একই, পলায়নবাদীতা। নিজ গায়ে কোন রকম আঁচড় লাগার সম্ভাবনা দেখলে আমরা প্রায় সবাইই পালাই সব সমস্যা থেকে। সমস্যার মধ্যে থেকে সেটাকে সমাধান করতে চেষ্টা করি না। নিজে না করি, যে করছে তাঁকে সাহায্য না করি, অন্তত সাহসও যোগাই না। বরং পরামর্শ দেই পালিয়ে যেতে!!

ভীষনভাবে ‘পচে যাওয়া’ অমানবিক একটা সমাজকে ধীরে ধীরে মানবিক করে তুলতে হলে আরো অনেক জাফর ইকবাল আর হুমায়ূন আজাদ লাগবে। এদের অনেকে নোংরা সমালোচনায় পড়বেন, ব্যাক্তিগত কটাক্ষের শিকার হবেন, শারীরিকভাবে আক্রান্ত হবেন, এমনকি কেউ কেউ মারাও যেতে পারেন। জাফর ইকবাল আর হুমায়ূন আজাদরা যে পথে হেঁটেছেন, হাঁটছেন সেই পথটা এরকমই। সেই পথে তাঁদের পেছনে, পাশে থেকে সাহস যোগাতে হবে, তাঁদেরকে রক্ষা করতে হবে।

বামদেরকে নিয়ে জনাব মিত্র যা যা বলেছেন তা আংশিক সত্য। কিন্তু তিনি যেভাবে ব্যাপারটাকে অতি সরলীকরন করলেন সেটা ঠিক হয়নি। এই বিশ্লেষন আজ না। তবে আমি ভীষন অবাক হয়েছি এটা দেখে যে, তিনি এনজিওর যে চিত্র এঁকেছেন সেটা দেখে। যে মুখোশটি দেখিয়ে এনজিওরা পশ্চিমের বাহবা কুড়ায়, আর টাকা আনে সেই মুখোশটিই তিনি আমাদেরও দেখালেন। তাঁকে আর দোষ দেই কেন, এই যুগটাইতো মুখোশের, মুখের নয়। এনজিওর কিছু দোষের স্বীকৃতি দেবার পরও তিনি বলেছেন যেহেতু এনজিওর বিকল্প নেই, তাই এনজিও লাগবে। এটা কিন্তু তিনি ভাবলেন না যে, এই এনজিওগুলো আজকের দানব হয়ে ওঠা দারিদ্র্য দূরীকরন আর মানব সম্পদ উন্নয়নের আর কোন ভাল পন্থা ভবিষ্যতে তৈরি হবার, এবং সেটা কার্যকর হবার পথ বন্ধ করে দিল, সম্ভবত চিরকালের জন্যই। আসলে এনজিও নিয়ে পুর্নাঙ্গ আলোচনা অনেক দীর্ঘ হবে, সে আলোচনা অন্য আরেকদিন করা যাবে।

সব শেষে জাফর ইকবাল স্যারকে বলছি, স্যার আমি জানি শত সমস্যায়, হুমকিতে, এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও আপনি ভয় পাবেন না, জানি আপনার সাথে কেউ না থাকলেও আপনি আপনার পথ থেকে বিচ্যুত হবেন না, নীতি থেকে টলবেন না, আপনার যাত্রা থামিয়ে দেবেন না, তার পরও বলছি “স্যার, আমি আছি আপনার সাথে”, যেমন আছে এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ।