ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

নরসিংদীর মেয়র লোকমান হোসেন নৃশংসভাবে খুন হলেন কিছুদিন আগেই। পত্রিকায়, টিভিতে, ব্লগে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক আলোচনা, বিশ্লেষন হয়েছে, এখনো হচ্ছে। কিন্তু তেমন কোন আলোচনা দেখলাম না যেখানে এই মৃত্যুকে সার্বিকভাবে বিশ্লেষন করার চেষ্টা করা হয়েছে। বেশীরভাগ আলোচনার মূল সুরই হোল, একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদের মৃত্যু হয়েছে, এর বেশী কিছু না। কিন্তু আমি মনে করি এই মৃত্যুর গভীর তাৎপর্য আছে জাতীয় রাজনীতিতে, জীবন। আসুন এই মৃত্যুর তাৎপর্য বিশ্লেষন করে দেখা যাক।

আচ্ছা লোকমান কি শুধু একজন সৎ, জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন? এর চেয়ে বেশী কিছু নন? আমি কিন্তু সেটা মনে করি না, আমি তাঁকে মনে করি সৎ, সুস্থ, জনকল্যাণমুখী রাজনীতির প্রতীক হিসাবে – যেমন নারায়ণগঞ্জের আইভী। রাজনীতিকে গুণ্ডামি, মাস্তানী, চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজির বৃত্ত থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্য যে হাতে গোনা কিছু তরুন রাজনীতিবিদ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তিনি তাঁদেরও প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁকে মেরে ফেলা নিয়ে পত্রিকাগুলো যা লিখেছে সেটা একটু জেনে নেই আগে, তাহলে জাতীয় জীবনে এই মৃত্যুর গুরুত্ব বোঝাটা সহজ হবে।

লোকমানের পরিবার টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর ছোট ভাইকে মূল আসামী করে মামলা করেছেন, যার মধ্যে দুই জন বাদে সবাই তাঁরই নিজ দল আওয়ামী লীগের। অনেকগুলো পত্রিকাতেই একটা কারন উল্লেখ করা আছে, সেটা হল লোকমানের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এলাকায় টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর, আর তাঁর ভাইয়ের কর্তৃত্বের প্রতি হুমকি হয়ে উঠেছিল। নানাভাবে মন্ত্রী লোকমানের কাজে বাধা তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি, কারন এলাকার হাজার হাজার মানুষ ছিল তাদের প্রিয় নেতা লোকমানের পক্ষে। এদিকে লোকমান আবার ঘোষনা দিয়েছিলেন আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন – অর্থাৎ ওই এলাকায় টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর, এবং তাঁর ভাইয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিরাট হুমকির মুখে পড়েছিল। তাই ………!

এবার যদি প্রশ্ন করা হয় এই মুহুর্তে এই দেশের সবচাইতে লোভনীয় পেশা কী? কী উত্তর হবে আপনার? আমার উত্তর ‘রাজনীতি’। আমাদের চারপাশের রাজনীতিবিদদেরকে দেখুন, আমি শুধু জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের কথা বলছি না, আশপাশের চুনোপুঁটিরাও রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজি করে কী পরিমান অর্থ-বিত্ত করেছে! আমি ব্যাক্তিগতভাবেও অনেক মানুষ দেখেছি যারা প্রায় কপর্দকহীন অবস্থা থেকে তথাকথিত রাজনীতি করে এলাকায় সবচাইতে ধনী মানুষ হয়ে গেছে। ছাত্রাবস্থায় দেখেছি যারা ছাত্ররাজনীতি করতো তাদেরও টাকার গরম কতোটা। আর টাকার সাথে ক্ষমতার দাপট তো আছেই। তাই, নিজের শিক্ষা, যোগ্যতা দিয়ে বাজারে যাদের ভাল উপার্জন করে চলার ক্ষমতা নেই তাদের জন্য রাজনীতিতো স্বর্গীয় আশীর্বাদ স্বরূপ। এর চাইতে ভাল পেশা আর কোথায় পাওয়া যাবে? অথচ রাজনীতি কি পেশা হওয়ার কথা ছিল? রাজনীতি আসলে কেমন হবার কথা ছিল সেই আলোচনা আজ নয়, অন্য কোনদিন করা যাবে।

রাজনীতির মত এতো চমৎকার একটা ‘ব্যবসা’ বাদ দিয়ে কাউকে রাজনীতির যায়গা ছেড়ে দেয়াটা যে কোন ‘টাউট’ রাজনীতিবিদের জন্য এক কথায় অসম্ভব। লোকমানের মৃত্যুর মূল কারনও এটাই।

এই সব ‘টাউট’ রাজনিতিবিদদের নোংরা রাজনীতিতে মানুষ আজ ক্লান্ত, বিরক্ত, বিক্ষুব্ধ। সুযোগ পেলেই মানুষ এই ‘টাউট’ রাজনিতিবিদদের শিক্ষা দিয়ে দিচ্ছে। এইতো কিছুদিন আগে চরম শিক্ষা দিল নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানকে। আর এই বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে সারা দেশের মানুষের কাছে। ধীরে ধীরে মানুষ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে সৎ আর ভাল রাজনীতিবিদদের পাশে। এটাই সারা দেশের সব মাস্তান, সন্ত্রাসী রাজনীতিবিদদের আতঙ্কিত করে তুলছে। রাজনীতির নামে তাদের ব্যাবসা লাটে ওঠার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবে তারা আহত বাঘের মতোই আচরন করছে, করবে ভবিষ্যতেও।

মাস্তানীর রাজনীতি থেকে সুস্থ রাজনীতির দিকে এই পরিবর্তনের সময়টা রাজনীতি এবং দেশের জন্য একটা ক্রান্তিলগ্ন হবে অনিবার্যভাবে। এবং সেই ক্রান্তিলগ্নটা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। আগের সেই ‘টাউট’ রাজনীতিবিদদের সামনে এখন দুইটা পথ খোলা – জনগনের মনের চাওয়া পড়ে, বুঝে নিজেদেরকে সেভাবে শুধরে নেয়া; অথবা যেভাবেই হউক রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় আসতে না দেয়া। আমি যেমন জানি, আপনারাও তেমনি জানেন যে ওই ‘পচে যাওয়া’ লোকগুলো নিজেদেরকে শুধরে, বদলে নেবে না কোনদিনও। তাই তারা যাবে দ্বিতীয় পথটাতেই – যেভাবেই হোক তারা রাজনীতিতে ভাল মানুষদের আসার পথ বন্ধ করবে। তার জন্য ফেলবে লাশ, যত প্রয়োজন ততো। যাতে সৎ, ভাল মানুষরা প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে রাজনীতিতে না আসে। লোকমানের লাশ দিয়ে সেটা সবেমাত্র শুরু হল।

আমার বিশ্লেষন যদি সঠিক হয়, (আমি মনে করি আমার বিশ্লেষন অভ্রান্ত) তবে এই ধারাবাহিকতায় আগামীতে আরো অনেক লোকমানের লাশ পড়বে। তাই লোকমানের হত্যাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখাটা একদম বোকামি হবে বলেই আমার বিশ্বাস।

লিখার শেষ অংশে এসে লোকমানের স্ত্রী আর শিশুকন্যাটির মুখ মনে পড়ছে। তাদের অনেক অভিমান ছিল এজন্য যে রাজনীতি করতে গিয়ে লোকমান পরিবারকে সময় দিতে পারত না। আর এখনতো শেষ হয়ে গেল বেচারার জীবনটাই। তাঁর শিশু পুত্র আর কন্যাটি জীবন যাপন করবে বাবাকে ছাড়া, কারন তাদের বাবা দৃষ্টান্ত হতে গিয়েছিল – গিয়েছিল নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অনেক মানুষের কল্যান করতে।

লোকমানের জানাজায় অসংখ্য মানুষ গিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে লোকমান কে ছিল, কেমন মানুষ, রাজনীতিবিদ ছিল। কিন্তু আমরা, সারা দেশের মানুষ কি শুধু জানাজায় গিয়ে লোকমানদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেই আমাদের কর্তব্য শেষ করবো? লোকমানদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমরা কি কিছুই করবো না? খুন হয়ে যেতে দেবো আরো অনেক লোকমানকে?