ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

কিন্তু না, যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও শাপলা চত্ত্বর তাহরির স্কোয়ার হওয়া দূরে থাকুক তার আশপাশ দিয়েও গেল না। কিন্তু কেন? জীবনের সর্বস্ব হারিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ পথে বসলো; ক্ষোভে, রাগে, দুঃখে, হতাশায় মানুষগুলো মাঝে মাঝেই রাস্তায় নামে, যা শেষ পর্যন্ত থেকে যায় একরকম অর্থহীন চ্যাঁচামেচিতেই। লক্ষ লক্ষ মানুষের এই ভয়ঙ্কর ক্ষোভ, ক্রোধ কেন ক্রমাগত দানা বেঁধে প্রচন্ড আকার ধারন করলো না? কারন “সব শেয়ালেরই একই রা”। কেন বললাম কথাটা, সেই ব্যাখ্যায় আসছি পরে।

এই শেয়ার মার্কেটে কী হয়েছিল সেটা কম বেশী আমরা সবাই জানি। অনেকে অনেক রাখ-ঢাক করে নানাভাবে নানা কথা বলেছেন। আমি কোন রাখ-ঢাক করছি না – সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগসাজসে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ঢাকা ষ্টক এক্সচেঞ্জ, অর্থ মন্ত্রনালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বেসরকারী ব্যাংক, ব্রোকার হাউজ একাট্টা হয়ে (ইচ্ছে করে বা চাপে পড়ে) মানুষকে পথে বসিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে হাতে গোনা কিছু মানুষ। আমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থনীতির ছাত্র নই, তবে এটা আমার ভীষন আগ্রহের বিষয় – আমার এই বক্তব্য প্রমান করার মতো যথেষ্ট অর্থনীতির জ্ঞান আমার আছে, কিন্তু আজ আমি সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। আমি এই ঘটনায় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর একটা বিষয় আবার নতুনভাবে প্রমানিত হয়েছে। আমি সবার দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাই সেই বিষয়েই।

এদেশের কোন রাজনৈতিক দল মানুষের কল্যানের জন্য কাজ করে – এটা ভাবার মত বোকা মানুষ আমাদের দেশে এখন একজনও আছে কিনা সন্দেহ। তাদের প্রধান কাজ হোল কীভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যায়, আর গিয়ে এই দেশটাকে ইচ্ছেমত লুটপাট করা যায়। কেউ কেউ বলেন ‘বাপের তালুক’ এর মত। আমি মনে করি, কোন ক্ষমতাসীন দল এই দেশকে ‘বাপের তালুক’ ও মনে করে না। ‘বাপের তালুক’ও মানুষ রয়ে-সয়ে খায়, যাতে আজীবন খেতে পারে, কিন্তু এরা চায় পাঁচ বছরের মধ্যেই সব রস শুষে নিয়ে দেশটাকে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলে যাবে।

বিরোধী দলের রাজনীতির উদ্দেশ্যও মানুষের অধিকার, কষ্ট নিয়ে কথা বলা না; কীভাবে সরকারকে বিপদে ফেলা যায়, পারলে গদি থেকেই যদি টেনে নামানো যায় সেটাই থাকে তাদের চিন্তা। তারপর ক্ষমতায় গিয়ে ইচ্ছেমত লুটপাট। এর পরেও কখনো কখনো বিরোধী দলকে দেখা যায় মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে কথা বলে, আন্দোলন করে। অবশ্যই এটা তারা মানুষের প্রতি মমতা থেকে করে না, করে রাজনৈতিক ইস্যু তৈরী করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য।

শেয়ার বাজারের এই ভয়ঙ্কর লুটপাট কি একটা বিরাট রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারতো না? ৩৫ লক্ষ বিও একাউন্টের মধ্যে অন্তত ২৫ লক্ষ বিও একাউন্ট সচল। প্রত্যেক শেয়ার ব্যাবসায়ীর পরিবারের গড়ে আরো ২ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধরলে এই আন্দোলনে সরাসরি ভুক্তভোগী অন্তত ৭৫ লক্ষ আন্দোলনকারী পাওয়া যেত। এর ১০-১৫% মানুষকেও যদি সংগঠিত করা যেত তবে শাপলা চত্বর কি তাহরির স্কোয়ার হোত না?

আগেই বলেছি বিরোধী দলের জনকল্যানের কোন ইচ্ছে আছে বলে আমি মনে করি না; কিন্তু শেয়ার বাজারে যা হোল সেটাকে তো বিরাট ইস্যু করে দারুন রাজনৈতিক ফায়দা তো লোটাই যেত। এই বিক্ষুব্ধ মানুষগুলোকে আরও উস্কে দিয়ে, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এমনকি সরকার পতনের মতো আন্দোলনও তো তৈরি করাই যেতো। কিন্তু তারা সেটা করল না। তারা শুধুমাত্র ২/৩ বার দায়সারা গোছের বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। কেন?

শেয়ার বাজারের খেলোয়াড়দের নামগুলোতে একটু চোখ বোলালেই এটা বোঝা যাবে। একটা টক শোতে আওয়ামী ঘরানার সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবুকে এটা বলতে আমি নিজে শুনেছি যে – মূল খেলোয়াড় হিসাবে তিনি সালমান এফ রহমানের নাম বলেছেন, এটা আমরা প্রায় সবাই জানি। তিনি সাথে এটাও বলেছিলেন যে এবার খেলার মতো এতো টাকা সালমান এফ রহমান সাহেবের কাছে ছিল না, খেলার টাকার মূল যোগানদাতা ছিলেন জনাব মোসাদ্দেক আলী ফালু। ব্রোকার হাউজগুলোর বেশীরভাগেরই মালিক বিএনপির লোকজন। অন্যতম খেলোয়াড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশের মালিক বিএনপিওয়ালারা। এতো গেল প্রকাশ্য কথা। অপ্রকাশ্য কথা হোল যে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হোল তার খুব সামান্য অংশও (হাজার হাজার কোটি টাকার খুব সামান্য অংশও কিন্তু বহু কোটি টাকা) কি দেয়া হয়নি আরও বেশ কিছু নেতাকে? তাহলে আন্দোলন গড়ে উঠবে কীভাবে? গড়ে তুলবে কে?

আগেওকি আমরা দেখিনি যখনই সাংসদদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর কথা হয় তখন দুই শত্রু দলই একমত, যখন শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানী বন্ধের কথা হয় তখনোতো দুই দলই একজোট হয়ে বিরোধীতা করে, দুই দলেরই সময়েই তাদেরি যোগসাজসে দেশের তেল গ্যাস লুট হয়ে যায় বিদেশি কোম্পানী দ্বারা এখানেও একমত দুই দল। আর শেয়ার মার্কেটের ঘটনায় এখন এটা আবার কি দারুনভাবেই না প্রমান হোল। এজন্যই শুরুতেই বলেছিলাম “সব শেয়ালেরই একই রা”।

শেয়ার বাজারে সর্বস্ব খোয়ানো মানুষগুলোকে এখন প্রায়ই দেখা যায় টিভিতে। কখনো রাস্তা বন্ধ করে, কখনোবা এটা সেটা পুড়িয়ে প্রতিবাদের চেষ্টা করে। তার পর শোনে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর অর্থমন্ত্রীর হুঙ্কার; কপালে জোটে ‘সন্ত্রাসী’ উপাধী আর পুলিশের লাঠিপেটা। লুটপাটকারীরা ঘুরে বেড়ায় দেশ বিদেশ; মাস্তি করে। আবার সব হারানো মানুষদের নাকের ডগা দিয়ে হেঁটে যায় – শেয়ার মার্কেট উদ্ধার করবে বলে। হাহ!

আসল পরিহাসটা অন্য জায়গায়। ২০১৪ সালের কথা ভাবুন। সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর চোখের জল শুকিয়ে গেছে অনেকটা আগেই। ভাঙ্গা কোমরটা নিয়ে তারা আবার দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। আরেকটা জাতীয় নির্বাচন এলো। ‘উৎসবের আমেজে’ ভোট হচ্ছে। শেয়ার মার্কেটের সামনে কান্নাকাটি করা মানুষগুলোই ওই দিন সেজেগুজে যাবে ভোটকেন্দ্রে – ‘উৎসবের আমেজে’ ভোট দিয়ে আসবে ‘নৌকা’ বা ‘ধানের শীষে’। এজন্যই এদেশের শাপলা চত্বর হয়ে ওঠে না তাহরির স্কোয়ার, হবেওনা হয়তো কোনদিনও।

***
ফিচার ছবি: ব্লগার রণদীপস বসু’র ব্যক্তিগত ওয়েব সাইট থেকে সংগৃহিত