ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

হিজড়াদেরকে নিয়ে একটা অপ্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান হয়ে গেল গত পরশু জার্মান কালচারাল সেন্টারে। অপ্রয়োজনীয় কেন বলছি সে বিশ্লেষনে আসছি পরে। তবে শুরুটা করছি হিজড়াদেরকে নিয়ে আমার ছোট একটা ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে – বছর দুয়েক আগের কথা, দরজায় কলিং বেলের শব্দ। পিপহোল দিয়ে তাকিয়ে দেখি একজন শাড়ি পরা নারী উল্টো ঘুরে আছেন। আমি দরজা খুলতে খুলতেই জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার, আপনি উল্টো ঘুরে আছেন কেন? তিনি ঘুরতে ঘুরতেই বলেছিলেন “ভাই, আমি তো হিজড়া হেল্লাইগা”। আমার ভুল ভাংল – তিনি নারী নন। বাসায় একজন হিজড়া চলে এসেছে দেখে আগ্রহ হল তাঁর সাথে কথা বলতে, তাই তাঁকে ভেতরে নিয়ে বসালাম, এবং কথা বলতে শুরু করলাম।

শুরুতেই তাঁর নাম জিজ্ঞেস করতেই দেখি তিনি ভীষন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন, কারন তাঁর এই জীবনে খুব কম ‘স্বাভাবিক মানুষ’ই তাঁর নাম জানতে চেয়েছে। জানলাম তাঁর নাম ‘নূরী’। দীর্ঘ আলোচনা হলো তাঁদের জীবন নিয়ে, জীবনের ভয়ঙ্কর বঞ্চনা নিয়ে। আমরা অনেকেই রাস্তায় চলার সময় হিজড়াদের ‘ঠ্যাক’ দিয়ে টাকা আদায়ের ‘শিকার’ হয়ে বিব্রত হয়েছি, হয়তোবা বিরক্তও। কিন্তু আমরা কয়জন জানি এই মানুষগুলোর জীবন কী ভয়ঙ্কর বিভীষিকাময়!

এরপর সেই হিজড়া (নুরী) কোন প্রয়োজনে আসতো সাথে কখনো কখনো আরো ২/১ জন হিজড়া থাকত, ফিরোজা, তাহেরা। কিছুদিন না যেতেই আমি যে বাসায় ভাড়া থাকতাম সেই বিল্ডিং এর সব ভারাটিয়া বাড়িওয়ালার কাছে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করেছে এই বলে যে, আমার কারনে বিল্ডিং এ হিজড়াদের আনাগোনা, এটা বন্ধ করতেই হবে। নানাভাবে বুঝিয়েও পারিনি – অবশেষে আমার বাসায় নুরী, ফিরোজা, তাহেরা এবং অন্য হিজড়াদের আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এবার আসছি গত পরশু জার্মান কালচারাল সেন্টারে হিজড়াদেরকে নিয়ে হয়ে যাওয়া অনুষ্ঠানটার কথায় – হিজড়াদেরকে আমাদের সামনে একটু ভিন্নভাবে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু যেভাবে আনা হলো, এটাই কি আমরা চাই? ‘সুন্দরী’ প্রতিযোগীতা হলো, ফ্যাশন শো হলো হিজড়াদেরকে নিয়ে। এটার মানেই কি উন্নতি? প্রগতি? হাস্যকর। এখানেও পালিশ করা আর খোলস পালটানোর গল্প? এই করে করে কি আমাদের নারীদেরকেও অন্তঃসারশূন্য করে ফেলছিনা ক্রমাগত? বিবিসি বাংলা রেডিওতে আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান বললেন, তিনি চান হিজড়াদেরকে সুন্দরভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করতে। এতেই আসবে তাঁদের মুক্তি? হিজড়াদের জন্য এটা দরকার ছিল? না, দরকার ছিল তাঁদের পুর্ণ সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য চেষ্টা করা? তাঁদেরকে দক্ষ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা, যাতে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন?

আসলে আয়োজকদের হিজড়াদের জন্য ‘সুন্দরী প্রতিযোগীতা আর ফ্যাশন শো’র ভিডিওটা দরকার কিনা কে জানে, বিদেশী টাকা এনে লোপাট করার জন্য? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথায় ফিরি আবার – নুরী, আর ফিরোজাকে বলেছিলাম একদিন তাঁদের বসবাসের এলাকায় যাব। নুরী বলেছিলেন “ভাই আমগো অইখানে অহন আপনেগো মতো ভদ্রলোক দেখলে বেবাকে চেইত্যা যায়, মনে করে এনজিওর লোক। আগে বহুত এনজিওঅলা আইস্যা আমগো লাইগা বহুত কিছু করবো কইয়া ছবি তুলছে, ভিডিও করছে; কিন্তু কিছু হয় নাই। আপনে গেলেও আপনেরেও এনজিওঅলা মনে কইর্যাছ চেইত্যা যাইতে পারে”। এনজিওঅলারা কী ভাঙ্গিয়ে খাওয়া বাদ রেখেছে এদেশে!  হিজড়াদেরকে এই প্রসঙ্গে বলতে চাই, নিজেদের অধিকার নিজেরাই আদায় করে নিন লড়াই করে; আপনাদের জন্য সত্যিকার মমতা বোধ করা মানুষদেরকে আপনারা ধীরে ধীরে আপনাদের পাশে অবশ্যই পাবেন। এনজিওদের স্বার্থের ঘুঁটি হবেন না।

আসলে পৃথিবীতে জন্মানো কমপক্ষে ০.১% শিশু জন্মগতভাবে কোন না কোন ধরনের লৈঙ্গিক অস্বাভাবিকতা নিয়ে জন্মে। সবার জটিলতার ধরন এবং মাত্রা একই রকম না, ভিন্নতা আছে। তবে এদের বেশীরভাগেরই লিঙ্গ পুরুষ/নারী হিসাবে স্পষ্টভাবে নির্ধারন করা যায় না। তাই ইউরোপ/আমেরিকাতে আজ এদেরকে নারী/পুরুষ পরিচয়ের বাইরে ‘থার্ড সেক্স’ বা ‘থার্ড জেন্ডার’ হিসাবে পরিচিত করা হয়। ওই সব অনেক দেশেই বিভিন্ন ফর্মের জেন্ডারের ঘরে ৩টি অপশন থাকে – মেল/ফিমেল/থার্ড জেন্ডার। কিন্তু আমাদের মনে কি কখনো এই প্রশ্ন এসেছে যে আমাদের দেশে নারী আর পুরুষের সাথে হিজড়া অপশন নেই কেন? তবে কি আমরা এদের লিঙ্গের স্বীকৃতি দেই না? যে রাষ্ট্র কিছু মানুষের লিঙ্গের স্বীকৃতিই দেয় না, সে রাষ্ট্র সেই মানুষগুলোর সব অধিকার নিশ্চত করবে এটাতো কল্পনা করাও হাস্যকর।

এইতো গেল রাষ্ট্রের কথা, হিজড়াদের প্রতি আমজনতার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? আচ্ছা চোখ বন্ধ করে একটু ভাবুনতো, হিজড়া শব্দটা আপনার মনের মধ্যে কেমন অনুভূতি তৈরি করে? আমি ব্যাক্তিগতভাবে আমার পরিচিতদের মধ্যে হিজড়াদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি কেমন সেটা দেখার চেষ্টা আমি করেছি। আমি দেখলাম প্রায় সবার কাছে হিজড়া অত্যন্ত ভীতিকর, বিরক্তিকর একটা শব্দ। কেউ ওদের ‘পাল্লায়’ পড়েছেন, কেউ অন্যদেরকে ওদের ‘পাল্লায়’ পড়তে দেখেছেন, আর কেউবা অন্যদের কাছে শুনেছেন ওদের ‘ভয়ঙ্কর’ এবং ‘নোংরা’ আচরনের কথা।

অথচ আমরা কয়জন একটু ভেবে দেখেছি যে এই মানুষগুলো কতোটা দুঃখী। সম্ভবত আমাদের দেশের সবচাইতে দুর্ভাগা মানুষ এরা। এই দেশের এই সমাজে একজন শারীরিক/মানসিক প্রতিবন্ধী, সিজোফ্রেনিক মানুষের অবস্থাও ভাল নয়, তবে তাদেরও একটা অবস্থান আছে; কিন্তু ন্যুনতম কোন সামাজিক অবস্থান নেই হিজড়াদের।

শেষে আসছি ইউফেমিজমের কথায়। অনেকেই হয়তো ভাবছেন আমি এই পুরো লিখাটায় অজস্রবার হিজড়া শব্দটা লিখেছি; কেন ‘বৃহন্নলা’ লিখলাম না? অনেক ‘সুশীল’ বেশ কিছুদিন থেকেই বলছেন যেহেতু হিজড়া শব্দটার ‘ডেরোগেশন’ হয়ে গেছে, তাই এর ‘ইউফেমিস্টিক’ শব্দ ‘বৃহন্নলা’ ব্যাবহার করা উচিৎ। আবার সেই খোলস পাল্টানোর কথা। মনে পড়ে পুলিশের খোলস পাল্টানোর কথা। কয়েক বছর আগে ঘটা করে পুলিশের সংস্কার শুরু হয়। তো তার মধ্যে এটাও বলা হোল, যেহেতু পুলিশের প্রতি মানুষের একটা নেতিবাচক ধারনা হয়েই গেছে, সব সংস্কারের আগে তাদের পোশাকটা পালটে দেয়া উচিৎ। অনেক খরচ করে সেটা করা হোল; কিন্তু চরিত্রগতভাবে পুলিশ রয়ে গেল যা ছিল তাই। মুখোশ আর খোলস নিয়েই মাতামাতির যুগ এটা, শরীরের আর স্ব্যাস্থ্যের নয়।

ব্যাক্তিগতভাবে আমি এসব রঙ চড়ানো, খোলস পাল্টানোর চেষ্টাকে সবসময় সন্দেহের চোখে দেখি। কারন এটা মূল বিষয় থেকে ফোকাস গৌন বিষয়ের দিকে সরিয়ে নিয়ে প্রকৃত উদ্দেশ্যকে সফল হতে দেয় না। হিজড়াদেরকে নিয়ে সুন্দরী প্রতিযোগীতা, ফ্যাশন শো, আর বৃহন্নলা ডাকার প্রচারনা দেখে এই ভয়টাই আমি পাচ্ছি। অথচ আমাদের উচিৎ ছিল এই মানুষগুলোকে যথাযথ প্রশিক্ষন দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা, এদের রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক স্বীকৃতির পাওয়া, এদেরকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে যে কোন পরিবারে একটা হিজড়া শিশু জন্মানোর পরে যেন তার নিজের পরিবারে আর সব শিশুর মত মমতায় বেড়ে উঠতে পারে সেই পরিবেশ তৈরির পেছনে সর্বশক্তি নিয়োগ করা।

সবশেষে কামনা করছি, এই দেশের এই সমাজের সবচাইতে দুঃখী মানুষগুলো ফিরে আসুন সমাজের মূলধারায়, আমাদের মাঝে, সব অধিকার অর্জন করে; আর আমরা যেন তাঁদেরকে বরন করে নেই উষ্ণ আন্তরিকতায়, দ্বিধাহীন চিত্তে।