ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

কাল কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা করা হল – সামনে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ন নির্বাচন। কেমন হবে সেই নির্বাচন? নিছক একটা আনুষ্ঠানিকতা? যে আনুষ্ঠানিকতায় একজন লুন্ঠনকারীকে জনগন খুশীমনে নির্বাচিত করে আসবেন, লাইসেন্স দেবেন পরবর্তী ৫ বছর নির্বিচারে লুন্ঠন করার। নাকি বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের হাওয়া লাগবে কুমিল্লায়ও – যেই হাওয়া কুমিল্লার জন্য তৈরী করবে একজন আইভী?

নির্বাচন, সেটা যেমনই হউক না কেন, সেটা নিয়ে আমাদের গনমাধ্যমের একটা মাতামাতি থাকেই সবসময়। ভেবেছিলাম নারায়ণগঞ্জ ঢাকার কাছে বলে পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলগুলো এত বেশী সরেজমিন রিপোর্ট করেছিল। কুমিল্লা যেহেতু তুলনামূলকভাবে দূরে, তাই এটা নিয়ে হয়তো এতোটা মাতামাতি হবে না। কিন্তু না, আমার অনুমানকে ভীষন ভুল প্রমান করে এর মধ্যেই প্রায় সব টিভি চ্যানেল কুমিল্লায় গিয়ে হাজির। এবং নানা রকম রিপোর্ট করে এর মধ্যেই দারুন ‘নির্বাচনী আমেজ’ তৈরি করে ফেলেছে।

এরকমই কয়েকটা রিপোর্ট দেখলাম। সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাথে কথা বলা হচ্ছে, কে নির্বাচিত হলে কী করবেন সেই প্রতিশ্রুতিতে ভাসিয়ে দেয়া শুরু হয়ে গেছে। জনগন কি চায়, কাকে চায়, কেন চায় সেসব জানাচ্ছে। এরকম একজন কুমিল্লাবাসীর প্রত্যাশা আমার ভীষন অবাক লেগেছে। ভদ্রলোক বেশ বৃদ্ধ, বয়স ৭৫ হবে। তিনি আশা প্রকাশ করলেন এবার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নির্বাচিত মেয়র এটা সেটা নানান কিছু করবেন। অবাক হলাম এই কারনে যে, এই দেশের জন্মের সময়ও তিনি বেশ পরিনত বয়সের মানুষই ছিলেন, তারপরও তিনি এই দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে প্রত্যাশা করেন! তিনি কি টিভি ক্যামেরা সামনে ছিল বলেই এভাবে বললেন? তারপরও কি তিনি বলতে পারলেননা যে তিনি সবাইকে দেখেছেন, সব দেখেছেন, কোন দলের কোন প্রার্থীকে দিয়ে কিছু হবে না।

রিপোর্টগুলোতে দুই প্রধান দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদেরকে নিয়েও রিপোর্ট দেখালো। জানলাম দুই বড় দলের দুই জন করে প্রার্থী আছে মনোনয়নের দৌড়ে, আর জাতীয় পার্টিরও একজন প্রার্থী আছে। আমার খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু আছে যারা বড় হয়েছে কুমিল্লায়, মাঝের কয়েকটা বছর ঢাকায় পড়শোনা করে এখন আবার কয়েক বছর থেকে কুমিল্লায়ই থাকে। ওদেরকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ধরেই জিজ্ঞেস করলাম তাঁরা মানুষ হিসাবে কেমন, তাঁদের অতীত কর্মকান্ডই বা কেমন।

আমার বন্ধুরা সম্ভাব্য সব প্রার্থীকেই চেনে, সবারই অতীত সব কর্মকান্ড জানে। প্রার্থীদের ব্যাপারে তাদের বক্তব্য হল, প্রত্যেক সম্ভাব্য প্রার্থীরই অতীত ভাল না – প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই আছে সন্ত্রাস আর দুর্নীতির অভিযোগ। এক জন বললো, প্রার্থীদের মধ্যে কে ভাল সেই আলোচনা না করে আলোচনা হওয়া উচিৎ কে কিছুটা কম খারাপ সেটা নিয়ে। তাদের কাছে এটাও জানতে চাইলাম এই দুই দলে বা অন্য কোন দলে কি পরিচ্ছন্ন ইমেজের কোন প্রার্থী নেই? জবাব পেলাম – আছে, কিন্তু তারা দলে এতটাই কোণঠাসা যে দলের সমর্থন চাওয়ার সাহসও নেই তাদের।

টিভি চ্যানেলগুলোর রিপোর্টে আরো অনেক কিছুই দেখানো হল, নির্বাচনে ইভিএম ব্যাবহার করা নিয়ে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা, না করা নিয়ে প্রার্থীদের এবং জনগনের মতামত, প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে কে কি হাতি-ঘোড়া জনগনকে দেবেন সেই সব বৃত্তান্ত। আবার জনগনও দারুন আশায় বুক বেঁধে এটা সেটা ‘আব্দার’ করছেন। ‘আব্দার’ শব্দটা ব্যাবহার করলাম এজন্য যে, যেসব জিনিসগুলো একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার, না পেয়ে পেয়ে সেগুলো চাওয়া দেখলে এখন ‘আব্দার’ই মনে হয়। আমাদের শিক্ষা হয়নি এখনো?

কিন্তু ভীষন অবাক হয়ে দেখলাম কোন রিপোর্টার এটা খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছেন না যে এই সব কুখ্যাত প্রার্থীর বাইরে তাদের নিজ নিজ দলে বা অন্য কোন দলে কোন সৎ, জনদরদী নেতা আছেন কিনা, থাকলে তাঁকে খুঁজে বের করা যায় কিনা। তাঁরা এই সব কোণঠাসা নেতাকে সামনে নিয়ে এসে কুমিল্লার এবং সারাদেশের মানুষের সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে পারতেন – নির্বাচন করতে যেন তারা উৎসাহ পায়।

কিছুদিন আগে হয়ে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল আমাদের দুই নেত্রীকে কোন শিক্ষা দেবে এটা আমি প্রত্যাশা করিনি। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম এটা জনগন এবং আমাদের মিডিয়ার চরিত্রে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনবে – রাতারাতি অনেক পরিবর্তন ঘটে যাবে এটা ভাবার মতো বোকা আমি নই। নারায়ণগঞ্জের মতো একজন আইভী কুমিল্লায় আসবে এতোটা ভাবার মতো বোকাও আমি নই, কিন্তু ভেবেছিলাম অসৎ, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার বিরুদ্ধে জনগন এবং মিডিয়া কিছুটা হলেও কথা বলবে। কিন্তু না, সামান্যতম পরিবর্তনও হোল না। এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে আগামী ৫ জানুয়ারীর কুসিক নির্বাচনে কুমিল্লাবাসী ‘উৎসবের আমেজে’ একজন লুণ্ঠনকারীকে নির্বাচিত করবেন আগামী ৫ বছর তাঁদের শহরকে লুন্ঠন করার জন্য।

নারায়ণগঞ্জের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে জনগনের শক্তিকে সাথে নিয়ে একজন আইভী সৎ রাজনীতিবিদের শক্তির প্রমান দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন। কিন্তু না, সেই ইতিহাস থেকে কেউ কিছু শিখলো না। অবশ্য বলাইতো হয় “ইতিহাসের সবচাইতে বড় শিক্ষা হল – ইতিহাস থেকে কেউ শেখে না”।