ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

(এই পোষ্টটি এদেশের ‘সুশীল সমাজ’ এর প্রতি উৎসর্গীকৃত)

গত পরশু “চার দশকে বাংলাদেশের অতীতের পর্যালোচনা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা” শীর্ষক একটা সন্মেলন শুরু হল। দেশে-বিদেশের অনেক ‘সুশীল’ এতে যোগদান করেছেন, আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন, এবং সম্ভবত ‘মতৈক্যে’ও পৌঁছবেন – কী কী কারনে এই জাতি আজ এতো দুর্দশাগ্রস্ত, কী কী করলে আমাদের এই দেশ, জাতি উন্নতির স্বর্নশিখরে আসীন হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিচারপতি হাবিবুর রহমান সন্মেলনটির উদ্বোধন করেছেন, এবং উদ্বোধনী বক্তৃতা করেছেন। বিচারপতি হাবিবুর রহমান একজন বিদ্বান, সজ্জন ব্যাক্তি। পদের কারনে একবার বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন; সেটা করেছেন অনেক সুনামের সাথেই। এই জন্য আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন তাঁর প্রাপ্য।

তাঁর বক্তৃতার বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক পত্রিকা অনেক শিরোনাম করেছে। প্রথম আলোর শিরোনাম “রাজনীতি এখন বিনিয়োগে পরিনত হয়েছে”। দীর্ঘ রিপোর্টটি পড়লাম। অনেক কথা বলেছেন তিনি, অনেক বিশ্লেষন। কিন্তু একটি কথাও দেখলাম না নতুন; তাঁর অনেক কলাম আমি পড়েছি – পরশুর ওই কথাগুলো সবই তাঁর পূর্বের বক্তব্যের চর্বিত চর্বন। শুধু তিনিই না, এই কথাগুলো বহু দিন থেকে বহু ‘সুশীল’ বলে আসছেন। আসলে কথাগুলো নিয়ে কিছু বলার নেই – কথাগুলো ভাল, খুব সঠিক কথা। কিন্তু আমার তীব্র ব্যাঙ্গ আছে তাঁদের কর্মকান্ড নিয়ে।

একটা সমাজে তাত্ত্বিক আলোচনার যায়গা থাকবে না, কথাটা ঠিক না। তাত্ত্বিক আলোচনা সমাজে নতুন, কিন্তু গুরুত্ত্বপূর্ন বিষয়গুলো আমাদেরকে ভালভাবে বুঝতে এবং সেই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তাই তাত্ত্বিক আলোচনা অবশ্যই সমাজের স্বাস্থ্যের লক্ষন। তবে তাত্ত্বিক আলোচনা দরকার সেই সব বিষয়ের জন্য যেগুলোর বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি বা মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু যেসব বিষয় সবার কাছে গৃহীত হয়ে গেছে, সবার মতৈক্য হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে আলোচনা কি ব্যাঙ্গের বিষয় না? গত চল্লিশ বছর কেন এই দেশ কাঙ্ক্ষিত পরিমানে এগোয়নি সেটা কে জানে না? কী করলেইবা সব সমস্যার সমাধান হবে সেসবও কে জানে না? এই ‘সুশীল’ রাই অজস্রবার টিভির টক শোতে বলে বলে, পত্রিকায় লিখে লিখে ‘পাবলিক’দেরকে সব মুখস্ত করিয়ে দিয়েছেন।

সব যেহেতু আমাদের জানা হয়ে গেছে, বোঝা হয়ে গেছে, তাই এখন সময় হোল সেগুলো নিয়ে কাজে নামার। কথাটা ঠিক হল না, কাজে নামার সময়টা এসেছিল অনেক আগেই। সেই সময়তো এই ‘সুশীল’রা কাজে নামেইনি, এখনো নামছে না। উপরন্তু এখনো তারা ফোটাচ্ছেন সেই পুরনো কথার ফুলঝুরি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বসে। মাঝে মাঝে যুক্ত হচ্ছে ভিনদেশী সুশীলরাও। যেমন হল গত পরশু।

সারা বিশ্বের অনেক দেশে ‘সিভিল সোসাইটি’ বা ‘নাগরিক সমাজ’ একত্র হয়ে একটা ‘প্রেশার গ্রুপ’ তৈরী করে সব সময় জনগনের পক্ষে সরকারের ওপর চাপ তৈরী করে যায়। সরকারকে চাপ দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নিতে পারে। ‘ওয়াচডগ’ হয়ে সরকারের বিপথে যাওয়া ঠেকায়। অনেকে ‘অ্যাক্টিভিষ্ট’ হয়ে সমাজে অনেক কল্যানকর কাজ করেন। আর আমাদের দেশে এদের মধ্যে কেউ তলে তলে রাজনৈতিক দলের চামচামি করে ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ পাওয়ার জন্য। আর কেউবা ওসব না করলেও এসি রুম ছেড়ে রোদ-বৃষ্টি-শীতের মধ্যে রাস্তায় নামার মত ‘পাগল’ তাঁরা নন। তাই যা করার তাই করেন – আমাদেরকে ক্রমাগত ‘নসিহত’। আর আমরাও কি আগ্রহ করেই না তাদের ‘কান পচানো’ কথা শুনেই যাই ক্রমাগত!

সেই কবে ছোট বেলায় শুনেছি, কবি চেয়েছেন এই দেশে এমন ছেলে হবে যে “কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”। একটি দেশের সাহিত্য সেই দেশের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি দেখায়। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে ‘লম্বা লম্বা’ কথা বলা, কিন্তু কাজ না করা মানুষ ছিল নিশ্চয়ই আবহমানকাল থেকেই। সেই উত্তরাধীকার বহন করছি আমরা সবাই, ‘সুশীল’ রাও। আমজনতার শুধু কথায় বড় হওয়া ঠিক না, তবে ‘সুশীল’দের জন্য এটা রীতিমত অপরাধ। সমাজে শিক্ষায়, উপার্জনে, সন্মানে উঁচু অবস্থানে বসে থাকা মানুষদের সমাজের কাছে দায়বদ্ধতাও বেশীই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যা তাঁরা সঠিক মনে করেন, যা তাঁরা করা উচিৎ বলে মনে করেন সেটা করে দেখাবেন। আবার যদি চান কিছু ব্যাপার অন্যদেরকে (রাজনীতিবিদ, ব্যাবসায়ী) দিয়ে করাতে; সেগুলো করাতে চাপ তৈরী করতে জনগণকে সাথে নিয়ে রাস্তায় নামবেন।

দুই একটা ব্যাতিক্রম ছাড়া এটাই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর নিয়ম যে পৃথিবীতে বেশীরভাগ মানুষই ‘অনুসরন করার’ দলে থাকবে। এই মানুষগুলোকেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে, পথ দেখিয়ে অনেক কিছু করে ফেলা সম্ভব। আমাদের দেশেই এর উদাহরন আছে। সরাসরি কোন রাজনৈতিক সাইনবোর্ড ছাড়াই শ্রদ্ধেয় আনু মুহাম্মদের নেতৃত্বে “তেল, গ্যাস, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি” এদেশের স্বার্থ রক্ষায় একটা বড় সংগঠন হিসাবে আজ আমাদের কাছে স্বীকৃত। কিন্তু সেই আন্দোলনটা তৈরি করতে তাঁদেরকে রাস্তায় নেমে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে, মানুষের কাছে যেতে হয়েছে – শুধু এসি রুমে বসে বসে নসিহত করে সেটা হয়নি।

আমাদের ‘সুশীল’ সমাজ আনু মুহাম্মদকে দেখে শিখবেন, এই প্রত্যাশা করা সম্ভবত অর্থহীন। রাস্তায় নেমে ভীষন শ্রমসাধ্য আন্দোলন করার চাইতে ঢের সহজ এসি রুমে বসে বসে ‘নসিহত’ করা, এসি অফিসে বসে এনজিও চালানো। তারপরও তাঁদের কাছে আহ্বান করি “পারলে রাস্তায় নেমে জনগনকে সাথে নিয়ে কিছু কাজ করুন; কথা তো অনেকই হোল। আর তা না পারলে অন্তত এই পুরনো, জানা কথাগুলো বলা বন্ধ করুন। এই একই কথাগুলো অজস্র মানুষের মুখ থেকে অজস্রবার শুনে আমরা, পাবলিকরা এখন ত্যাক্ত-বিরক্ত”।

পুনশ্চঃ আচ্ছা আমরা ব্লগাররাও ব্লগে লিখে লিখে ‘সুশীল’ হবার পথে হাঁটছি না তো? যদি লিখার সাথে সাথে ভবিষ্যতে আমি অন্তত রাস্তায় নেমে কাজ করতে শুরু না করি তবে আমার জন্য অগ্রিম ধিক্কার এবং ঘৃনা।