ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে একটা মোটামুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে তিন দিন আগে। ঘটনাটা শেষ পর্যন্ত কতোটা গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠবে সেটা বলার মতো সময় এখনো আসেনি নিশ্চয়ই, তার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে। হ্যাঁ আমি নতুন গঠিত সংগঠন ‘গনতন্ত্র এবং মানবাধিকারের জন্য নাগরিক আন্দোলন’ এর কথা বলছি।

প্রাথমিকভাবে ২২ সদস্যের একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে। নামগুলো নানাভাবে, নানাদিক থেকে আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিচিত। জানি না আমি বোকামী করছি কিনা, তারপরও বলছি নামগুলো দেখেই এই সংগঠনটি আমার মধ্যে কিছুটা হলেও আশার আলো তৈরি হয়েছে। তবে বেশ কিছুটা সময় এদের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষন করে তারপর আসলে এদের সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের সময় নিয়ে পর্যবেক্ষন করতে হবে যে ‘গনতন্ত্র এবং মানবাধিকারের জন্য নাগরিক আন্দোলন’ সত্যিকারের ‘প্রেশার গ্রুপ’ হয়ে উঠছে কি না।

গত পরশু রাতে এই সংগঠনের সদস্যসচিব জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না এবং একজন কেন্দ্রীয় সদস্য জনাব নুরুল কবীরকে (নিউ এজ সম্পাদক) দেখলাম একটা বেসরকারি টিভি চ্যানেলে তাঁদের নবগঠিত সংগঠন নিয়ে কিছু প্রাথমিক ধারনা দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে জনাব নুরুল কবীরের কয়েকটা মন্তব্য আমার কাছে ভাল লেগেছে যা উল্লেখ করতে চাই।

তিনি বলেছেন তাঁদের সংগঠনটি অবশ্যই একটি ‘রাজনৈতিক সংগঠন’ তবে ‘রাজনৈতিক দল’ নয়। তিনি বলেছেন তাঁরা ‘নিরপেক্ষ’ নন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে তাঁদের সুষ্পষ্ট অবস্থান থাকবে এবং সেটার জন্য জনমত তৈরিতে তাঁরা নানা পদক্ষেপ নেবেন যার মধ্যে রাস্তায় আন্দলন, সভা সমাবেশও থাকবে। তবে আমার দৃষ্টিতে তাঁর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ন মন্তব্য হোল যেটা তিনি তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই বলেছেন, ঠিক তাঁর উক্তিটাই উল্লেখ করছি “আমরা সুশীল সমাজ নই”। ভীষন ভাল লাগলো এটা দেখে যে তিনি ‘সুশীল’ শব্দটার তীব্র বিরোধীতা করলেন, এই শব্দটার মধ্যে যে ‘এলিটিষ্ট’ মানসিকতা আছে তার প্রতি ঘৃনা জানালেন।

গত সোমবার আমি ‘সুশীল’দের কর্মকান্ডের বিরোধিতা করে একটা লিখা লিখেছিলাম। সেদিনই এই সংগঠনটি তৈরি হওয়ার খবর প্রাথমিকভাবে পেয়ে নিজের মনেই ব্যাঙ্গ করে উড়িয়ে দিয়েছিলাম ‘আরেকটা সুশীল সংগঠন’ বলে। কিন্তু ওইদিন রাতেই জনাব নুরুল কবীরের মুখে “আমরা সুশীল সমাজ নই” মন্তব্যটা শুনে আমার ব্যাঙ্গটা আপাতত তুলে নিলাম। তাঁদের অবস্থানের প্রতি জনসমর্থন বাড়ানোর জন্য সেমিনারের সাথে সাথে তাঁরা রাস্তায়ও নামবেন এটা শুনে মনে হল তাঁরা সম্ভবত ‘সুশীল’দের মতো নিজেদের কর্মকান্ড শুধুমাত্র ‘এসি রুমে নসিহত’ এর মধ্যে আবদ্ধ রাখবেন না।

প্রাথমিকভাবে যেসব নাম দেখলাম, সেগুলোর মধ্যে কাউকে কাউকে নিয়ে যে বিতর্ক নেই তা নয়। তবে প্রাথমিক নামগুলোর মধ্যে অনেকগুলো মানুষ আছেন যারা এর মধ্যেই “কোদালকে কোদাল বলা” মানুষ হিসাবে পরিচিত। এমনকি সামরিক বাহিনী সমর্থিত গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যখন কেউ কোন কথা বলছিল না, তখনো এদের মধ্যে কয়েকজন সব হুমকির মধ্যেও কাজ করেছেন, কথা বলেছেন। তাই এদেরকে দিয়ে কিছু হতে পারে এমন আশা হয়তো সতর্কভাবে করাই যায়।

আমি আশা করি ধীরে ধীরে এই সংগঠনটির সদস্য বাড়ুক, এবং সংগঠনটি ধীরে ধীরে একটি সত্যিকারের ‘প্রেশার গ্রুপ’ হয়ে উঠুক। আশা করি তাঁরা এদেশের লুটেরা রাজনীতিবিদ, ব্যাবসায়ী, আমলাদেরকে ক্রমাগত চাপের মধ্যে রেখে রেখে যতোটা সম্ভব জনগনের পক্ষে রাখবেন। তবে তাঁদের কাছে এটা আমার প্রধান প্রত্যাশা নয়। আমার ভীন্ন একটা প্রত্যাশা আছে (এটা অবশ্যই উদ্যোক্তারা সরাসরি বলেননি, তবে সেদিনের টক শোতে জনাব মান্না কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন)। সেটা হোল, ধীরে ধীরে যদি নানা শ্রেনী-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হয়, তবে কোন দিন কি এটা একটা ‘রাজনৈতিক সংগঠন’ এর পর্যায় থেকে একটা ‘রাজনৈতিক দল’ হয়ে উঠবে না? যে দলটি হয়ে উঠবে সেই দল যার জন্য এদেশের কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষা করে আছে, যে দলটি হবে জনগনের আশা আকাঙ্ক্ষার সত্যিকারের মুখোপাত্র, জনগনের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সোচ্চার।

এটা অবশ্যই ঠিক ‘নাগরিক আন্দোলন’ রাজনীতির তৃতীয় শক্তি হয়ে উঠবে এই আলোচনা করার সময় এখন একেবারেই না। তবে এই সংগঠনটি যদি সফল হয় তবে এটাই বা অন্য কোন নতুন দল সাহসী হবে যে আমাদের বর্তমান দুই দলের বাইরে কোন রাজনৈতিক শক্তি সফল হতে পারে। সেই পথ ধরে হয়তো কোনদিন আমরা পেয়ে যাবো আমাদের প্রত্যাশিত রাজনীতির তৃতীয় শক্তিকে। আর কিছু না হোক এটা তো সত্যি যে এই দুই দলের পর্যায়ক্রমিক শোষনে এদেশের মানুষের নাভীশ্বাস উঠে গেছে – একটা নতুন রাজনোইতিক শক্তি আসার সব রকম পরিস্থিতি এই দেশে বহু বছর থেকেই আছে।

শেষে এসে মনে হচ্ছে আমি কি হাস্যকর রকম অবাস্তববাদী আশার কথা বলে ফেললাম? শুনেছি একটা ডুবন্ত মানুষ একটা খড়কুটোও আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। নানা সমস্যায় জর্জরিত একটা ডুবন্ত জাতির একজন হয়ে আমিও কি মনে করছি যে এই জাতি খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচবে? আসলেই জানি না। তার পরও ইচ্ছে হয় ‘নাগরিক আন্দোলন’ এর সাথে যুক্ত হই, অন্যদেরকে যুক্ত হতে বলি। রাজনীতির তৃতীয় শক্তি না হোক একটা শক্তিশালী ‘প্রেশার গ্রুপ’ তো এটা হয়ে উঠতেই পারে, তাতেওতো এই দেশের অভাগা মানুষের অনেক কল্যান হবে।

***
পুনশ্চঃ আমার প্রোফাইলের ছবিটা পাল্টেছে। আমার আগের ছবিটা বেশ কিছুদিন আগে তোলা, তাই নতুন ছবিটার সাথে সেটার বেশ পার্থক্য আছে – এটা সম্ভবত কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি করছে। আমি আশা করি সবাই আমার এখনকার ‘লুক’ এর সাথে দ্রুতই অভ্যস্ত হয়ে যাবেন।