ক্যাটেগরিঃ চারপাশে, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৪ বছর পূর্তি হল গত পরশু। সেদিনই বিষয়টা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম কিছু কথা। লিখিনি একটা কারনে – আমি একটু অপেক্ষা করে দেখতে চাইলাম বিষয়টা নিয়ে আমাদের বাঙালীদের মধ্যে কেউ কিছু ব্লগে লিখেন কিনা। এটা খুঁজে দেখার জন্য আমি কয়েকটা ব্লগে ঢুঁ মারল – না, আমি কোন লিখা দেখতে পাইনি। সুংখ্যালঘুদের দুঃখ নিয়ে ভাবার সময় কোথায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের?

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৪ বছর পূর্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা প্রচন্ড হতাশা নিয়ে একটা সংবাদ সন্মেলন করেছিলেন গত পরশু। তিনি সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত অভিযোগ করেছেন এই বলে যে পার্বত্য শান্তিচুক্তির ব্যাপারে বাংলাদেশের সরকার বিশ্বাসভঙ্গ করেছে।

আমি এই লিখায় বর্তমান সংবিধান স্বীকৃত শব্দ “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” ব্যাবহার করছি না – আমি “আদিবাসী” শব্দটি ব্যবহার করবো। এটা কি সংবিধানকে অসন্মান করা হয়ে গেল? হতে পারে – যে সংবিধান সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বাকে সঠিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না, জাতিসত্ত্বা ভিন্ন হবার পরও আদিবাসীদের ওপর ‘বাঙালী’ জাতীয়তা চাপিয়ে দেয়, যে সংবিধান সব ধর্মাবলম্বীর (হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সহ) বা ধর্মে অবিশ্বাসীর ওপর বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম চাপিয়ে দেয় সেই সংবিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরি হবে না কেন? যাই হোক সেটা ভিন্ন আলোচনা, থাকুক এখন।

পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাঙালী/আদিবাসী, কার জন্য কতটুকু ভাল হয়েছে বা কতদূর খারাপ হয়েছে – এই আলোচনায় আমি শান্তিচুক্তির এই টেকনিক্যাল দিকগুলো নিয়ে কোন আলোচনা করতে যাচ্ছি না। সেই তর্কে না গিয়ে অন্তত এটুকু বলা যায় যে এই রাষ্ট্র আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের অনেক দাবীর অনেকগুলো মেনে নিয়ে চুক্তি করে; আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের সশস্ত্র আন্দোলন শেষ হয় ‘শান্তিবাহিনী’ বিলুপ্তির মাধ্যমে। এরপর ১৪ বছর কেটে গেল উন্নতি কিছুই হয়নি আদতে। দুটো আওয়ামী লীগ, আর একটা বিএনপি সরকার ‘কেউ কথা রাখেনি’। আওয়ামী লীগ চুক্তিটি করেছিল বলে অনেকে এই ব্যর্থতার দায় শুধুমাত্র আওয়ামী লীগকেই দিতে চায়। কিন্তু অবশ্যই এই ব্যর্থতার দায় বিএনপিকেও নিতে হবে। এটা একটা রাষ্ট্রের করা চুক্তি, তাই এটা বাস্তবায়ন করা বিএনপিরও দায়িত্ব ছিল; আর তারা চুক্তিটি যেহেতু বাতিলও করেনি।

সরকারের বিরুদ্ধে শুধু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অভিযোগই না, এখন বরং আরো বড় অভিযোগ উঠেছে যে সরকার তার নানা সংস্থা দিয়ে চুক্তিটিকেই নস্যাৎ করে দিতে চাইছে। এই উদ্দেশ্যেই ইউপিডিএফ নামে আদিবাসীদেরই একটা সংগঠন তৈরি করা হয়েছে যারা শান্তিচুক্তির বিরোধী। এখন তাদের মধ্যেই বিভেদ তৈরি করে সেই পুরনো ঔপনিবেশিক কায়দায় “ডিভাইড এন্ড রুল” করতে চাইছে। পাহাড়ে এখন সংঘাত শুধু পাহাড়ি-বাঙালী তেই না পাহাড়ি-পাহাড়ি তেও – ইউপিডিফ গুলি করে মারছে জনসংহতি সমিতির লোকজনদেরকে। সমস্যার সমাধান দূরে থাকুক, সমস্যাটাকে আরো বাজে রকমভাবে জটিল করে তোলা হয়েছে।

নির্মম পরিহাসের বিষয় হল পাকিস্তান থাকার সময় এই আমরা, বাঙালীরাই ভাষাগত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকভাবে শোষনের শিকার হয়েছিলাম। সেই ভূক্তভোগী জাতি আজ নিজেই নিপীড়কের ভূমিকায়! সুযোগ পেলেই শক্তিমান শক্তিহীনকে আর সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘুদেরকে নিপীড়ন করবে এটাই কি নিয়ম? তাহলে আমরা যে এই ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানীদের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করবো, সেটা কোন অধিকারে?

চুক্তি করে যেহেতু গত ১৪ বছরেও তেমন কিছুই করা হয়নি সেটা রক্ষা করার জন্য, তাহলে কি এই চুক্তিকে প্রতারনা বলার সময় এখনো আসেনি? মাঝে মাঝে ভাবি তাহলে এতো ঢাক-ঢোল পিটিয়ে চুক্তিটা করা হল কেন? এটা কি একটা রাজনৈতিক ষ্টান্টবাজী? নাকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এটাকে দেখিয়ে শান্তিতে নোবেল পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাই? (কিছুদিন আগে দেখলাম আওয়ামী লীগেরই এক নেতা বলছেন যে পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে শান্তিতে নোবেল দেওয়া উচিৎ)। নাকি প্রতারনার মাধ্যমে আদিবাসীদের হাত থেকে অস্ত্র নিয়ে নেয়াই ছিল উদ্দেশ্য?

জাতি হিসাবে আমাদের একটা ভয়ঙ্কর চরিত্র দেখতে পাচ্ছি আমি – মানুষের অধিকারের প্রতি, ন্যায্য দাবীর প্রতি আমাদের সংবেদনশীলতা ভীষন রকম কমে গেছে। কেউ কোন ন্যায্য দাবী নিয়ে সহিংসতার পথে না গেলে শাসকরা সেটা শোনে না। বহু দিন ধরে গার্মেন্টস কর্মীরা তাদের বেতন বৃদ্ধির কথা বললেও কিছুদিন আগে রাস্তায় নেমে গাড়ি আর কারখানা ভাংচুর করার আগ পর্যন্ত তাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। একই ব্যাপার দেখছি এখানেও – যতদিন তাদের হাতে অস্ত্র ছিল আমাদের সরকার ততদিন তাদের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েছিলো, এখন যেহেতু তাদের হাতে অস্ত্র নেই তাই এখন তাদের সমস্যা আর গুরুত্ব পায় না। এটা দিয়ে আমরা তাদের কী বার্তা দিচ্ছি?

গত পরশুর সংবাদ সন্মেলনে সন্তু লারমা নতুন করে আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষনা করেছেন। আমি আশা করি তাঁদের আন্দোলন অহিংস থাকবে। কিন্তু আমি আমার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এটাও জানি যে অহিংস আন্দোলন আমাদের শাসকগোষ্ঠীর কাছে বার্তা পৌঁছায় না। তাহলে? অচিরেই কি শুরু হয়ে যাবে আরেকটা সশস্ত্র আন্দোলন? যদি সেটা হয় তবে কি আমরা আদিবাসীদের দায়ী করতে পারবো বিন্দুমাত্রও? আমরাই কি তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছি না ওই পথে?

আরেকটা কথা, আদিবাসীদের অধিকারের আন্দোলন কি শুধু তাঁরাই করবেন? আমরা, বাঙালীরা কি আমাদের আদিবাসী ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়াবো না? নাকি অন্যায় সুবিধাভোগী বলে আমরা চাইবো এই ‘রাষ্ট্রীয় প্রতারনা’ চলতেই থাকুক? এদেশের সব মানুষের উচিৎ জাতি, ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানিয়ে সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করা যেন সরকার আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সবকিছু করতে বাধ্য হয়।

ডিসেম্বর আসতে না আসতে বিজয় দিবস নিয়ে সেই চিরাচরিত মাতামাতি শুরু করে দিয়েছে সবাই (ব্লগেও) – কোথায় আমাদের এটা ভাবার সময় যে এই দেশের কিছু মানুষ (আদিবাসী) স্বাধীনতার সুফল আদৌ কতটুকু পেয়েছে? আজো কেন তারা কার্যত সামরিক শাসনের অধীনে একরকম বন্দী জীবনযাপন করছে? স্বাধীনতার ৪০ বছর পার হবার পরও কি আমরা তাঁদের জাতিগত স্বীকৃতি, অধিকার, আর স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ দেবো না? স্বাধীনতা মানে শুধু বাঙালীর স্বাধীনতা হবার কথা ছিল না; স্বাধীনতা হবার কথা ছিল এই ভূখন্ডে বসবাসকারী সব জাতিগোষ্ঠীর।

পূনশ্চঃ পাহাড়ের আদিবাসীদেরকে নিয়ে কথা বলতে বলতে আমরা যেন ভুলে না যাই আমাদের সমতলেও বেশ কিছু আদিবাসী আছে, এবং তাঁরাও ভীষণভাবে অধিকার বঞ্চিত, নিপীড়িত। এই ভীষন প্রান্তিক মানুষগুলোর পাশেও যেন আমরা থাকি আমাদের সব শক্তি নিয়ে।

***
ফিচার ছবি: banglaexpress.com.bd থেকে সংগৃহিত