ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

কিছুদিন আগে ভারতের মহৎ মাওবাদী নেতা কিষেনজীকে পুলিশ নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করলো। ভারতীয়, এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এবং অসংখ্য ‘অমানবিক মানুষ’ দের চোখে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী; আর অনেকের কাছেই (আমার কাছেও) তিনি ছিলেন সমাজের সবচাইতে বঞ্চিত, অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের মহান সংগ্রামী। কিষেনজীর মৃত্যুর পরে তাঁর অবদান, কীর্তি, মহত্ত্ব নিয়ে একটা পোষ্ট লিখতে চেয়েছিলাম; নানা ব্যস্ততায় আর অন্য পোষ্ট লিখতে গিয়ে সেটা আর লিখা হোল না। ব্যাপারটা নিয়ে ভীষন লজ্জাবোধ করছি এখন।

আজকের পোষ্টে কিষেনজীর কথাটা আসলো ভীন্ন একটা প্রসঙ্গে। কিষেনজীর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে কলকাতার কবি, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী, আর লোকসভার সদস্য কবীর সুমন অসাধারন একটা গান লিখেছেন (যদিও সে গানে তিনি কিষেনজীর নাম উল্লেখ করেননি)। সেখানে তিনি কিষেনজীর অনেক প্রশংসা করেছেন, তাঁর অবদানের, মহত্বের কথা স্মরন করেছেন। এর আগে তিনি পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের পুলিশি সন্ত্রাসবিরোধী জনগনের কমিটির নেতা ছত্রধর মাহাতকে (এই মানুষটাও রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী) গ্রেফতারের পরও গান লিখেছিলেন তাঁকে নিয়ে।

আমরা অনেকেই হয়তো জানি সুমন আর অরুন্ধতি রায় কীভাবে মাওবাদীদের ন্যায্য দাবীর প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। আর তাঁদের বঞ্চনার প্রতি, ন্যায্য দাবীর প্রতি তাঁরা দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন ভারতবাসীর, সাথে বিশ্ববাসীরও। এমনকি মাওবাদীরা তাঁদের পক্ষে আলোচনার জন্য সুমন এবং অরুন্ধতি রায়ের নাম প্রস্তাবও করেছিলেন সরকারের কাছে। যাক এই আলোচনা থাক এখন।

ফিরে আসি কিষেনজীকে নিয়ে সুমনের গানের প্রসঙ্গে। মাওবাদীদের প্রতি সুমনের এই সহানুভূতি, সমর্থন কিন্তু তাঁর দল (যে দলের টিকিটে তিনি লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন) তৃণমূল কংগ্রেসের মাওবাদীদের ব্যাপারে বর্তমান অবস্থানের সম্পূর্ন বিপরীত। তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মাওবাদীদেরকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তাদের দাবীদাওয়া নিয়ে আলোচনা করবে। কিন্তু না, কিছুদিন আগে মমতার মধ্যে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মতো চরিত্র দেখা গেল – তিনি সব ভুলে গিয়ে ঘোষনা করলেন মাওবাদীদের সাথে আলোচনা নয়, তাদের দমন করা হবে সামরিকভাবে।

তাই মাওবাদীদের নেতা কিষেনজীকে নিয়ে সুমনের গানটি মমতাকে ভীষণ ক্ষিপ্ত করে তোলে। তিনি প্রকাশ্যেই বলে ফেলেন তিনি সুমনকে দলে নিয়ে ভুল করেছেন। তবে খুব গুরুত্বপূর্ন ব্যাপারটা ঘটেছিল তখন যখন মমতা সুমনকে ফোন করে দলের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের কারন জানতে চান। সুমনের জবাবের মধ্যে ছিল এই কথাটিও – “আমি সবার আগে সুমন”। অর্থাৎ তিনি মমতাকে এটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে দলীয় পরিচয়কে বড় করে তুলতে গিয়ে তিনি নিজের নীতি আদর্শকে পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে দেবেন না। বলা বাহুল্য তৃণমূলের সাথে সুমন এখন এক রকম সম্পর্কহীন। মমতার সাথে এই সমস্যা নিয়ে তাঁর বক্তব্য সুমন তাঁর ব্যাক্তিগত ওয়েবসাইটে একটা লিখায় (লিঙ্ক – http://www.kabirsumanonline.com/home/2011/11/23/uttoro-to-jana-othoba-tar-por-ki-hoilo-jane-shyamlal/) বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। লিখাটা অসাধারন – আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।

এবার আসি আমাদের পা-চাটা রাজনীতিবিদদের কথায়। জানি না “পা-চাটা” শব্দটা কারো কাছে আপত্তিকর মনে হয় কিনা; কিন্তু আমি দুঃখিত, এক্ষেত্রে এর চাইতে ‘কম খারাপ’ কোন শব্দ আমি লিখতে পারলাম না। সুমনের দীর্ঘ বক্তব্যটা পড়তে পড়তে ভীষন মন খারাপ হোল একটা ব্যাপার ভেবে যে শুধু কিছু ব্যক্তিগত বৈষয়িক লাভের জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় সব নেতা দলীয় প্রধানের পা-চাটে। ছোট বেলায় নজরুলের লিখা ‘মোসাহেব’ কবিতাটার কথা মনে পড়লে আমার চোখের সামনে আমারদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের মুখ ভেসে ওঠে।

দুই নেত্রী যা বলবেন, যেভাবে বলবেন সেভাবেই সব কিছু করেন তারা। শতভাগ মেরুদন্ডহীনতার অসাধারন উদাহরন তারা। এসব মানুষের এমন মানসিকতার হবার পেছনে দলীয় প্রধানদের বিরাট দায় আছে – সেই প্রসঙ্গ আজকের আলোচনার বিষয় না। কিন্তু দলীয় প্রধানদের এই ভীষন স্বৈরাচারী মানসিকতার মধ্যেও আমরা একটু আশার আলো পেতাম যদি দেখতাম প্রতিটি দলের মধ্যে সবাই না হলেও কিছু নেতা অন্তত সব অবস্থায় ন্যায্য কথা বলেন, জনগনের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেন – মন্ত্রী থাকলেও বলেন, মন্ত্রী না থাকলেও বলেন (ইদানিং দেখা যাচ্ছে মন্ত্রীত্ব/ভাল পদ না পেয়ে কেউ কেউ নিজ দলের সমালোচনা করছে; এটা আমার কাছে ভীষন হাস্যকর লাগে)। দলীয় প্রধানের ভয়ঙ্কর স্বৈরাচারী মানসিকতা আর অন্য নেতাদের তার প্রতি ‘জ্বী হুজুর’ মার্কা আচরন – এই দুইয়ে মিলে আজ এই দেশের রাজনীতি এতোটা পচে গেছে।

আমাদের দেশে যে ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বহাল আছে, সেই রাজনীতির কিছু ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের কিছুটা কৌশলগত আপোষের দরকার হয়তো আছে। কিন্তু তার মানে কি মেরুদণ্ডহীনতা আর পদলেহন? এটাই কি চলতে থাকবে অনন্তকাল? কবীর সুমনকে দেখেওকি কেউ একটুও লজ্জা পাবেন না? কেউ কিছু শিখবেন না? একটু শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন না? না, আমি জানি, তারা তা করবে না – তাই তাদের প্রতি জানাই তীব্র ঘৃনা (আমি আশীর্বাদ/অভিশাপে বিশ্বাসী নই – হলে তাদের দিতাম ভয়ঙ্করতম অভিশাপ)।

তো এই লিখাটা কি শুধু মনের ক্ষোভ ঝাড়ার জন্যই লিখলাম? না, আমি চাই আমরা এই নোংরা লোকগুলোকে দিয়ে শাসিত হয়ে, তাদের যাচ্ছেতাই সব কিছু মেনে নিয়ে, কোন কিছুর শক্ত প্রতিবাদ না করে নিজেদেরকেই যেন ঘৃনা করতে শিখি। তারপর একদিন সৎ চিন্তার, মেরুদন্ডসম্পন্ন মানুষরা যেন লড়াইয়ে নামি ওই নোংরা লোকগুলোর জায়গাটা নিয়ে নেয়ার জন্য। ভবিষ্যতের সেই ‘শুদ্ধ রাজনীতিবিদ’দের প্রতি আগাম শুভকামনা জানিয়ে শেষ করছি কবীর সুমনের ওই লিখার একটা বাক্য দিয়ে; মমতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন – “আমি কারুর বংশবদ নই, হতে পারি না”