ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বুঝতে শেখার পর গত অনেকগুলো বছরের ডিসেম্বর মাসের কথা আমি স্পষ্টভাবে মনে করতে পারি। কী হতো আগে, এখন কী হয়? ডিসেম্বর শুরুর আগেও আমি চাইলেই চোখ বন্ধ করেই বলে দিতে পারতাম এবারের বিজয় দিবসে কী কী হতে যাচ্ছে। এটা শুধু আমি কেন যারা এই লিখা পড়ছেন তারও পারতেন। এবার আবার ‘ভীন্ন মাত্রা’ আছে বিজয় দিবস পালনের – এবার যে আবার বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তি। তাই কিছুটা ‘বেশী তাৎপর্য’ তো আছেই এবার, তাই একটু বেশী আনুষ্ঠনিকতা তো থাকবেই।

সরকার, পত্রিকা, বিটিভি তো ছিলোই আগে, গত কিছু বছর থেকে সাথে যুক্ত হয়েছে অনেকগুলো বেসরকারী টিভি চ্যানেল, আর একেবারে হালে বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান তো এসেছেই তাদের টাকার বস্তা নিয়ে। সবাই মিলে এখন দিয়ে যাচ্ছে দেশপ্রেম আর স্বাধীনতার সুড়সুড়ি আর এই সুড়সুড়িই নিশ্চিত করছে এগুলোর বিক্রিকে। হ্যাঁ, মার্চ আর ডিসেম্বরে আমি আমার চারপাশে এখন স্বাধীনতা আর দেশপ্রেম বিক্রি হতে দেখি। খুব আপত্তিকর লাগছে কথাটা? তার পরও তুলে নিচ্ছি না।

আমি গত বেশ কয়েক বছর থেকে খেয়াল করে দেখছি স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসকে সামনে রেখে আমাদের আনুষ্ঠানিকতা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। নানাভাবে আমাদেরকে দেশপ্রেমের কথা বলা হচ্ছে, শোনানো হচ্ছে স্বাধীনতার চেতনার কথাও। দারুন দেশপ্রেমিক হয়ে গেছি কি আমরা? স্বাধীনতার চেতনা কি উপচে পড়ছে আমাদের ভেতর থেকে? না, আমি আশা করি পাঠকরা প্রায় সবাই আমার সাথে একমত হবেন যে ওগুলো কমছে দিনে দিনে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা তো বাড়ছেই প্রতি বছর। তাহলে কি বলা যায় না যে দেশপ্রেম আর স্বাধীনতার চেতনা আনুষ্ঠানিকতার ব্যাস্তানুপাতিক (ইনভার্সলি প্রোপোরশনাল)?

আমরা তো এখন বুকে পতাকার ফুল নিয়ে, মাথায় পতাকা বেঁধে, নামী ফ্যাশন হাউজের বিজয় দিবস থিমের পোষাক পরে ঘুরে বেড়াই, আমাদের ফেসবুকে পতাকা, গাড়িতে ২/৩ দিন পতাকা ওড়াই পতপত করে (মন্ত্রীর মত)। আমরা এখন অলিগলি সাজাই পতাকা দিয়ে, আলোকসজ্জায় উদ্ভাসিত হয় সুরোম্য সরকারি-বেসরকারী ভবন, টিএসসিতে স্বাধীনতার গান শুনি, এবার তো আবার আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ‘লাইট এন্ড সাউন্ড শো’। মোবাইল কোম্পানী প্রতি বছর উপহার দিয়ে যায় রাশি রাশি ‘জাগরনের গান’, আর দেশপ্রেমের বিজ্ঞাপন। চ্যানেলগুলোর রাশি রাশি মুক্তিযুদ্ধের নাটক, টক শোতে দেশপ্রেম আর স্বাধীনতার অসীম নসিহত, পত্রিকার ক্রোড়পত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ঋণ স্বীকার, রাজাকার-আলবদর-পাকিস্তানীদের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি … চলছেই, বাড়ছেই দিনে দিনে।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা (একটা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, সব মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সম্পদের সুষম বন্টন, একটা গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, ন্যায়ভিত্তিক আইনের শাসন) দূর থেকে আমাদের উপহাস করে। আমাদের অবশ্য ওসব আর গায়ে লাগে না – ওসব গায়ে লাগার জন্য ন্যুনতম যতোটুকু মনুষ্যত্ব দরকার ততোটুকু মনুষ্যত্ব আমাদের মধ্যে আর অবশিষ্ট নেই।

যদি আমরা সত্যিসত্যি চাই স্বাধীনতার আসল সুফল এই রাষ্ট্রের সব মানুষ পাক, তাহলে আমি চাই এই সব আনুষ্ঠানিকতার বাড়াবাড়ি বন্ধ হোক। আমি ব্যক্তিগত পর্যায়ে কথা বলার সময় অনেককেই দেখেছি তারা এই আনুষ্ঠানিকতাগুলোকে খারাপ মনে করেন না, তারা বলতে চান যে এই আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশিই মানুষকে সত্যিকারের দেশপ্রেম আর স্বাধীনতার চেতনায় দীক্ষিত করা যায়। আমি কখনোই সেটা মনে করি না।

শিল্পী কবীর সুমনের ‘বাঁশুরিয়া’ গানটির একটা লাইন এরকম – “প্রাণে গান নাই মিছে তাই রবি ঠাকুর মূর্তি গড়া”। হ্যাঁ, আমাদের প্রাণে দেশপ্রেম আর স্বাধীনতার চেতনা নেই বলেই ডিসেম্বরে আমাদের চারপাশে এতো পতাকা, আর এতো আনুষ্ঠানিকতার ছড়াছড়ি। এটা আমার কথা নয়, এটা নিয়ে অনেক গবেষনা আছে যে, উৎসব আর আয়োজনের এই বাড়াবাড়ি সব সময় মানুষের মনোযোগ মূল বিষয় থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। মানুষকে করে তোলে ‘রিচুয়ালিষ্টিক’। তখন মানুষ মূল বিষয় ছেড়েছুড়ে মেতে ওঠে উদযাপন আর ধূমধাম নিয়েই। আর এই মেতে ওঠার আগুনে ঘি ঢালার জন্য ‘পুঁজি’ তো সবসময়ই প্রস্তুত থাকেই। পুঁজির কোন ‘চেতনা’র দরকার নেই, দরকার মুনাফা, এবং সেটা ভালভাবে সম্ভব হয় যাবতীয় সব মানবিক মুল্যবোধ, চেতনা ধ্বংস করে দিয়ে।

আমাদের দেশের রমজানের দিকে তাকালেই দেখা যাবে ধর্মীয় দৃষ্টিতে সংযমের মাস আজ হয়ে উঠেছে ভোজের উৎসবে। অন্য যে কোন মাসের চাইতে অন্তত দেড়গুন ভোগ্যপন্য আমদানী হয় এই মাসে – এটা ভোগ্য পন্য আমদানীকারকদেরই তথ্য। আর সাথে চকবাজার, বেইলী রোড, আর গুলশানের মহামূল্য ইফতারের লোভ তো আছেই। আর উৎসর্গের তাৎপর্যের কথা বলা কুরবানী হয়ে উঠেছে লক্ষ লক্ষ টাকার গরু আর উট খাওয়া আর লোক দেখানোর উৎসবে। আসলে ‘পুঁজি’ সংযম আর উৎসর্গ চায় না, ‘পুঁজি’ চায় শুধুই ভোগ – কারন ভোগেই মুনাফা। আরো অজস্র উদাহরন দিয়ে স্পষ্টভাবে দেখানো যায় যে দিনে দিনে মানুষ সব ক্ষেত্রেই ‘রিচুয়ালিষ্টিক’ হয়ে উঠেছে, উঠছে আরো বেশী করে। বাদ যাচ্ছে না ধর্মীয়, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কোন উপলক্ষ্যই।

মুক্তিযুদ্ধের যে কয়েকটা সত্যিকার ফুটেজ দেখেছি তাতে দেখেছি সমাজের সবচাইতে বঞ্চিত মানুষগুলো লুঙ্গি পড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে; গবেষকদের লিখাতেও দেখেছি মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এরাই ছিল প্রধান অংশ। স্বাধীনতার সুফল অন্তত অর্থনৈতিকভাবে সমাজের মধ্যবিত্ত থেকে ধনী মানুষগুলো বেশ খানিকটা পেলেও মুলত পেয়েছে এই দেশের শতকরা ১ ভাগ মানুষ। কিন্তু ওই লুঙ্গি-নেংটি পরা লোকগুলো আছে একই রকম – ওদের কাছে স্বাধীনতার সুফল হল ধনীদের কাছ থেকে ছিটেফোঁটা কিছু খেয়ে কোনরকমভাবে জীবনযাপন করতে পারা। ধীরে ধীরে হয়তো চরম দরিদ্র মানুষগুলো অনেকটা ভাল অবস্থায় পৌঁছে যাবে, কিন্তু লাভের আসল গুড় খেতে থাকবে ওই ১ ভাগ মানুষই। তারপর একদিন ৯৯ ভাগ ঝাঁপিয়ে পড়বে ‘অকুপাই ওয়াল ষ্টীটের’ মতো কোন আন্দোলনে।

আসলে স্বাধীনতা আর বিজয় নিয়ে যা হচ্ছে বিদ্যমান অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সেটাইতো হবার কথা। এই ব্যবস্থার মধ্যে থেকে স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল সব মানুষ কোনভাবেই পেতে পারে না – কেন পারে না বা কোন ব্যবস্থায় সেটা সম্ভব, সেটা আরেক দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে আরেকদিন।