ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

বেতন বৈষম্য দূর করার দাবীতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের মধ্যেই গত ২১শে ডিসেম্বর থেকে আমাদের সবার প্রথম শিক্ষাগুরু, ‘প্রাথমিক শিক্ষক’রা (বেসরকারী) শহীদ মিনারে অনশন করছেন। কারো গায়ে লাগেনি কিছুই, কারো কানে ঢোকেনি কিছু। তাই আজ গায়ে কেরোসিন ঢেলে তাঁরা আত্মহুতি দেবেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল ঘোষনার অনুষ্ঠানে এই ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে প্রাথমিক ও গনশিক্ষা মন্ত্রী তাঁদের এই আন্দোলনকে এক কথায় ‘অযৌক্তিক’ বলে দিয়েছেন।

আমার স্পষ্টভাবে মনে পড়ে আমার চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ার সময় আমাদের এক বন্ধুর বাবা কোন এক কারনে আমাদের এক শিক্ষকের ওপর ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলেন “সামান্য এক প্রাইমারী স্কুল মাস্টারের এত্তো বড় সাহস ………”। শহীদ মিনারে অনশন করে যাওয়া ওই মানুষগুলোকে দেখে আজ অনেকদিন পর আমার বন্ধুর বাবার ওই মন্তব্যটা কানে খুব বাজছে।

ফিরে আসি অন্দোলনকারীদের কথায়, আমি জেনে ভীষণ অবাক হলাম যে সরকারী রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক বেতন পান সর্বসাকুল্যে ৪৯০০ টাকা – সাধারণ শিক্ষকদের তথ্যটা পাইনি। তথ্যটা জেনে ভীষন লজ্জাও বোধ করলাম – কী ভয়ঙ্কর সমাজবিচ্যুত মানুষ আমি, আমাদের সমাজের অনেক বঞ্চনার ইতিবৃত্ত আমি এখনো জানিই না।

তাঁরা অনশন করছেন দাবী আদায়ের লক্ষ্যে। হঠাৎ মনে হল এই মানুষগুলো নতুন করে আর অনশন করার দরকার কি, তাদের প্রতিটা দিনইতো অর্ধ-অনশনের হবার কথা। আচ্ছা এজন্যই কি আমাদের সরকার বাহাদুরের টনক নড়ছে না? তাঁরা ভাবছেন নাতো যে “আরে ওদের না খেয়ে থাকার অভ্যেস আছে, এতে ওরা মরবে না”। তাই তাঁরা মরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – আত্মহুতি দেবেন গায়ে আগুন দিয়ে।

অনুমান করি সরকারের পক্ষ থেকে আজ কেউ গিয়ে তাঁদেরকে সত্য/মিথ্যা কিছু আশ্বাস দিয়ে এটা থেকে নিবৃত্ত করবেন, অথবা পুলিশ দিয়ে তাঁদেরকে উচ্ছেদ করা হবে। প্রশ্নটা এটা নয় যে তাঁদের সমস্যার সমাধান হবে কি হবে না; প্রশ্নটা অন্যখানে – এই তীব্র শীতের মধ্যে এতোগুলো দিন খোলা আকাশের নীচে থেকেও কেন সরকারের কোন সংবেদনশীলতা আকর্ষন করতে পারল না?

আসলে ‘প্রাথমিক শিক্ষক’ পেশাটা আমাদের এই সমাজে সবচাইতে অবহেলিত পেশাগুলোর একটি। আমার আজ মনে পড়ছে আমরা যখন স্কুলের উঁচু শ্রেনীগুলোতে পড়ছিলাম, তখন আমাদের হাই স্কুলের অনেক শিক্ষক প্রাইমারী শিক্ষকদের তাচ্ছিল্য করে মন্তব্য করতেন। সেটা সংক্রমিত হয়েছিল ছাত্রদের মধ্যেও – অনেককেই দেখতাম প্রাইমারী শিক্ষকদের খুব একটা পাত্তা না দিতে চাইতে। যেহেতু এই মানুষগুলো ‘অন্য কোথাও কিছু না করতে পারা মানুষ’, সেহেতু তাঁদের জন্য সন্মান প্রত্যাশা করা হয়তো বাতুলতাই।

অথচ এই মানুষগুলোই আমাদের প্রথম শিক্ষাগুরু। আমরা যে যাই হয়ে উঠেছি না কেন তার ভিত তৈরি হয়েছিলো এই আধপেটা খাওয়া মানুষগুলোর হাতেই। একটা জাতির জন্য কী ভীষন গুরুত্ত্বপূর্নই না মানুষগুলো! এজন্যই সচেতন দেশগুলো এই মানুষগুলোকে অনেক কদর করে, যত্ন নেয়। আমাদের এই মানুষগুলো এতো আদর-যত্নও চায়নি, চেয়েছিলেন ন্যুনতম খেয়ে-পরে জীবনধারন করতে।

সরকার কী বলবে তাও জানি – বাজাবে ভাঙ্গা রেকর্ড, বলবে ‘সম্পদের সীমাবদ্ধতা’র কথা। অস্বীকার করি না পুরোপুরি। কিন্তু না, এই ভাঙ্গা রেকর্ড বাজে না ক্রিকেট বিশ্বকাপের মতো আরো বহু ক্ষেত্রে। তখন এই গরীব দেশের গরীব সরকার শত শত কোটি টাকা খরচ করে জাঁকজমকে আর শানশওকতে তাক লাগিয়ে দেয় সারা দুনিয়াকে।

কাল রাতে আমি প্রায় সবকটা চ্যানেলের খবর দেখেছি একটা পরীক্ষা করার জন্য। আমি দেখতে চেয়েছিলাম আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো এদের আত্মহুতি দেবার ঘোষনা কতোটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। প্রায় সব চ্যানেল এটাকে একদম গুরুত্ব দেয়নি। ২ টা চ্যানেলে আমি এই খবর দেখিইনি, আর মাত্র ২ টা চ্যানেলকে দেখলাম শহীদ মিনারে গিয়ে সরেজমিনে রিপোর্ট করেছে। আমি অবশ্য এতে অবাক হইনি মোটেও, কারন মিডিয়া এটা নিশ্চয়ই জানে যে পাবলিক কোন খবরটা ‘খায়’ আর কোনটা ‘খায় না’। মিডিয়া ভালভাবেই জানে যে এদের আত্মহুতি দেবার সিদ্ধান্তের খবর পাবলিক খাবে না।

কাল প্রাইমারী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফল বেরোল, টিভির পর্দায় শিশুগুলোর আনন্দের হৈ-হুল্লোড় আর নাচানাচি দেখতে কী ভীষন ভাল লাগছিল! কিন্তু পাশাপাশি বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল শহীদ মিনারের সামনে অবস্থানকারী ওই মানুষগুলোর কথা যারা খেয়ে না খেয়ে এই শিশুগুলোকে পড়িয়ে এই আনন্দের উপলক্ষ্য তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁদের কথা ভাবার সময়, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছে আমাদের সরকারের নেই, বিরোধী দলের নেই, ‘সুশীল’ সমাজের নেই – আমাদের কারো নেই, কারন “ওরা তো সামান্য প্রাইমারী স্কুল মাষ্টার”।