ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আর কয়েক ঘন্টা পরে আসছে থার্টি ফার্স্ট নাইট। রাত ১২টা বাজতে না বাজতে শুরু হয়ে যাবে উন্মাতাল আনন্দ – নতুন বছরকে বরন করা নিয়ে। এই আনন্দকে আরও সর্বজনীন করার নামে মানবতার জন্য ভয়ঙ্কর ক্যান্সার, ‘কমজিউমারিজম’কে উস্কে দেবার জন্য আছেই অনেক দেশি-বিদেশি কোম্পানি। সেই আলোচনা আজ না, শিরোনাম দেখেই বুঝতে পারছেন আশা করি আজকের আলোচনা ভিন্ন বিষয় নিয়ে।

একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করি। ফিরে যাই দেড় দশক আগে – আমি ঢাকায় এসেছি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট লেভেলে পড়াশোনা করার জন্য। আমাদের ক্লাশ শুরুর ৬ মাসের মাথায় পেলাম থার্টি ফার্ষ্ট নাইট। ব্যান্ডের কনসার্ট শুরু হল রাত ১০টার দিক থেকে। ১২টা ঘনিয়ে আসতেই দেখলাম চারদিক থেকে বেরোচ্ছে অনেক মদের বোতল – কিছু ফেনসিডিল আর গাঁজাও ছিল সাথে। কয়েক সেকেন্ড বাঁকী থাকতে কাউন্টডাউন শুরু হোল, এবং ১২টা বাজার সাথে সাথে অনেকেই ওইসব নেশার বস্তুতে ডুবে গিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছিল।

এই থার্টি ফার্স্ট নাইটের একটা লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার ছিল – আমাদের অনেক গোবেচারা বন্ধু, যারা শুধুমাত্র পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, তাদেরও অনেকেই সেদিন প্রথম নেশা করেছিল, এবং এদের মধ্যেই কয়েকজন পরবর্তীতেও নেশা চালিয়ে গিয়েছিলো। আমাদের অনেক বন্ধু অন্যান্য প্রতিষ্ঠনে পড়তো; তাদের সাথে কথা বলে দেখেছি সেখানেও অনেক ছেলে মেয়ে যারা কোনদিন কোন নেশার বস্তু গ্রহণ করেনি তারাও জীবনে প্রথম নেশা করেছিল ওই নিউ ইয়ারের রাতে। এবং তাদের অনেকেই পরবর্তী জীবনেও নেশা চালিয়ে গিয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এখনকার পরিস্থিতি আরো অনেক ভয়াবহ। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মাদক (মদ সহ, মদকে আমি জেনেশুনেই মাদক হিসাবে লিখেছি) এখন থার্টি ফার্ষ্ট নাইটের এক অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওসব ছাড়া নাকি নিউ ইয়ারের উদযাপন হয়ই না। এই হুজুগে পড়ে বহু ছেলে মেয়ের জীবনে “মাদকের হাতেখড়ি” কিন্তু হয় ওইদিনই। কেউ কেউ বলবেন “আরে বছরে ওই একদিন একটু আধটু হলে কীইবা হয়?” কিন্তু আমি এটাকে ভীষণ আশংকার ব্যাপার বলে মনে করি। কারণটা পরে ব্যাখ্যা করছি।

আমরা, আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকরা কি খেয়াল করছি যে আমাদের দেশের একটা প্রজন্ম মাদক সেবন করে প্রায় উচ্ছন্নে চলে যাচ্ছে? এই একটা ব্যাপারে ধনী-মধ্যবিত্ত-দরিদ্রের কি অসাধারণ সাম্য! বাদ নেই শিশুরাও – ‘ডান্ডি’ নামের এক নেশায় আক্রান্ত অজস্র পথশিশু। নেশা নিয়ে বিস্তারিতভাবে লিখবো আরেকদিন। কিন্তু এই পোষ্টের প্রয়োজনে একটু জেনে নেই নেশার কারন কী।

কারন হিসাবে আমাদের দেশে নানাভাবে অনেক কথা বলা হয়েছিল একসময় – হতাশা, দুঃখ ভোলার চেষ্টা, ব্যার্থতা, অসৎ সঙ্গ ইত্যাদি। কিন্তু না, এগুলো কোনটাই নেশা শুরু করার প্রধান কারন না। সারা পৃথিবীতে এটা নিয়ে গবেষণা হয়েছে; হয়েছে আমাদের দেশেও। এতে প্রধান যে কারনটি বেরিয়ে এসেছে প্রধান হিসাবে সেটা হোল – কৌতুহল। আর একবার কৌতুহল বশে কেউ নেশা করলে এবং নেশার আনন্দ পেয়ে গেলে সেটা পেতে অবশ্যই আবার ইচ্ছে করবে, এবং এভাবে ক্রমাগত হতে হতে সেটা পুরোপুরি আসক্তিতে রূপ নেয়।

কোন সন্দেহ নেই নেশার বস্তুগুলো মানুষের মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব তৈরি করে একটা কৃত্রিম সুখানুভূতি দেয় যেটা স্বাভাবিক অবস্থায় পাওয়া যায় না। আর এজন্যই এই বস্তুগুলো এতোটা ভয়ঙ্কর। আজকের বিজ্ঞান বলে নেশা থেকে দূরে থাকার সবচাইতে ভাল উপায় হল ওটার মধ্যে একবারও না যাওয়া। কারন নেশার সুখ একবার পাওয়া বার বার সেই সুখ পেতে প্রলুব্ধ করে, এবং এভাবে একসময় সেটা রূপ নেয় পূর্নাঙ্গ আসক্তিতে।

ফিরে আসি থার্টি ফার্স্ট নাইটের কথায়, এই রাত এখন আমাদের দেশের সংস্কৃতির সাথে প্রায় মিশে গেছে। আর সব ধর্মীয় এবং সামাজিক রীতির মতোই এর কতগুলো অনুষঙ্গ তৈরি হয়েছে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল মাদক এই থার্টি ফার্স্ট নাইটের একটা অনুষঙ্গ হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে। কোন খারাপ বিষয়/বস্তু কোন রীতির অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে যাওয়ার সবচাইতে ভয়ের দিক হচ্ছে এটা পালন করার জন্য সবার মধ্যে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। কিশোর-টিন এজারদের পক্ষে এই চাপ উপেক্ষা করা বেশ কঠিন। আমার মনে আছে ঢাকায় আমার প্রথম থার্টি ফার্ষ্ট নাইটে আমি এবং আর যে কয়েকজন ড্রিঙ্ক করিনি তাদেরকে অন্যরা গেঁয়ো, ক্ষেত ইত্যাদি শব্দ দিয়ে বিদ্রুপ করেছিলো।

ভয়ঙ্কর আশঙ্কার কথা হল প্রতি বছর থার্টি ফার্ষ্ট নাইটের নামে নেশা আর উশৃঙ্খলতা বাড়ছেই – বাড়ছে পরিমানে, বাড়ছে ব্যাপ্তিতে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি গ্রামেও এই একই চিত্র। আমি ভীষন মন খারাপ করে খেয়াল করছি এই দিনে মাদকের যে হাতেখড়ি হয়, সেটা আমাদের সমাজে মাদকের এই ভয়ঙ্কর বিস্তারের পেছনে বেশ বড় একটা কারন (অবশ্যই একমাত্র কারন নয়)।

নতুন বছরকে সামনে রেখে সবাই পুরনো বছরের অপ্রাপ্তি, কষ্ট সব ভুলে সামনের দিনগুলো ভালো যাবার প্রত্যাশায় নানা সুন্দর কথা বলবেন – পত্রিকায়, টিভিতে, ব্লগে। প্রতি বছর তাই হয় – দেখছি বছরের পর বছর। কিন্তু এই আহ্বানের কারনে কোন পরিবর্তন হতে দেখিনি কোনদিন – এগুলোকে এখন তাই ‘বলার জন্য বলা’ই মনে হয়। যা দেখি সাধা চোখে সেটা হল এই দিনকে কেন্দ্র করে ‘কনজিউমারিজম’কে ভয়ঙ্করভাবে উস্কে দেবার চেষ্টা আর অনেক কিশোর-তরুনের মাদকের হাতেখড়ি করানো। এটাও জানি এই স্যাটেলাইট টিভি আর ইন্টারনেটের যুগে এই ব্যাধি কমার কোন সম্ভাবনা আমি তো দেখিই না, বরং এটা জানি যে এটা দিনে দিনে আরো সর্বগ্রাসী হয়ে উঠবে।

তাই নতুন বছরে সবার সাথে স্রোতে গা ভাসাচ্ছি না – না, আমার কোন প্রত্যাশা নেই, কোন প্রতীক্ষা নেই।